শততম টেস্ট এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়ই বড় প্রাপ্তি

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১১:১৮ এএম, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭

ওয়ানডে ফরম্যাটটা বেশ ভালই রপ্ত করেছে বাংলাদেশ। বেশ কয়েক বছর ধরে বড় দলগুলোকে প্রায় নিয়মিত হারাচ্ছে। ৫০ ওভারের সীমিত ওভারের ম্যাচে তাই বাংলাদেশের গায়ে এখন ‘ভালো’ দলের তকমা; কিন্তু টেস্টে সেই বাংলাদেশের জীর্ণ দশা।

দীর্ঘ পরিসরের ফরম্যাটে টাইগাররা পিছিয়ে। ক্রিকেটের কুলীন ভুবনে তাই বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়া নিচের সারির দল। দেশের বাইরে একদমই নয়, ঘরের মাঠেও টেস্টে কোন প্রতিষ্ঠিত দলকে হারানোর ক্ষমতা নেই।’

শুধু সমালোচকদের তীর্যক সমালোচনা নয়। বেশ কিছুদিন ধরে ওপরের কথাগুলো একরকম চাউর হয়ে গিয়েছিল। সেটা যে একদমই ভিত্তিহীন- তাও বলার অবকাশ ছিল না। ইতিহাস-পরিসংখ্যান সে কথাই বলছিল। জিম্বাবুয়ে ছাড়া সে অর্থে টেস্টে কোন বড় দলের সাথে জয়ের রেকর্ড ছিল না বাংলাদেশের।

jagonews24

এর বাইরে ক্রিকেটের এক সময়ের সেরা শক্তি ও ঐতিহ্যের ধারক এবং বাহক ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথেও টেস্ট বিজয়ের কৃতিত্ব ছিল। তবে বোদ্ধা, বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা সেভাবে আমলে আনতে চান না। কারণ, ২০০৯ সালে ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ’ নামধারি যে দলটির বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ, তা ছিল তারকাশূন্য একটি দল। জাতীয় দলের মোড়কে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’ দল।

মোট কথা, ২০০০ সালে টেস্ট খেলতে শুরু করা বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ওই দুই দল ছাড়া আর কাউকে হারাতেও পারেনি। তাই টেস্টে বাংলাদেশের শক্তি, সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন ছিলই। তবে যারা টাইগারদের টেস্ট খেলার সামর্থ্য নিয়ে একটু বেশি প্রশ্ন তুলতেন বা তুলে আসছিলেন, তারা প্রথম ধাক্কা খেলেন ২০১৬ সালে এসে।

ওই বছর বাংলাদেশ ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে দেশের মাটিতে টেস্টের অন্যতম পরাশক্তি ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বসে। বলা যায়, সেটাই টেস্ট আঙ্গিনায় টার্নিং পয়েন্ট বাংলাদেশের। তামিম, মুশফিক, সাকিব, মিরাজরাও যে পাঁচদিনের ক্রিকেট খেলতে পারেন, তাদেরও যে সামর্থ্য আছে পরাশক্তিগুলোকে হারানোর- ক্রিকেট বিশ্ব তা প্রথম জানে ২০১৬ সালের অক্টোবরে।

jagonews24

দেশের মাটিতে ইংলিশদের বিপক্ষে ১০৮ রানে বাংলাদেশের টেস্ট জয় সবাইকে চমকে দিয়েছিল। প্রায় ১৯ ছুঁই ছুঁই তরুণ অফ স্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজের অবিস্মরণীয় বোলিংয়ে ইংলিশদের ১০৮ রানে হারায় বাংলাদেশ।

সেটা যে কোনো ‘ফ্লুক’ ছিল না, টাইগাররা যে সত্যিই টেস্ট খেলতে পাওে, কাগুজে নয় সত্যি সত্যি দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটেও মুশফিক, তামিম ও সাকিবরা ধীরে ধীরে উঠে আসছে- এ সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০১৭ সালে এসে।

এ বছরই টেস্টে প্রথম বাঘের গর্জনে কেপে ওঠে ক্রিকেটের মাঠ। টাইগারদের সামনে পরাজিত হয় অস্ট্রেলিয়ার মত বিশ্বসেরা দল। ঘরের মাঠে যারা কঠিন প্রতিপক্ষ, সেই লঙ্কানরাও টাইগারদের শৌর্য-বীর্যের কাছে হার মানে।

এক কথায় ২০১৭ সালে বাংলাদেশের ক্রিকেট আকাশে ওঠে একটি নতুন সুর্য্যরে দেখা মেলে। সবাই দেখেন, জানেন এবং বোঝেন- ‘বাংলাদেশ অন্তত ঘরের মাঠে টেস্ট জয় শিখেছে। প্রতিপক্ষ যেই হোক না কেন, অনুকুল কন্ডিশনে টেস্টে ভাল খেলার এবং ম্যাচ জেতার সামর্থ্য জন্মেছে টাইগারদেও মধ্যে।’

এত গেল সাফল্যের কথা। এর বিপরিতে আরও একটি সত্য আছে। তাহলো- দেশে এবং স্লো ও লো পিচে পাঁচদিনের ম্যাচ ড্র করা এবং জেতার কলাকৌশল রপ্ত হলেও এশিয়ার বাইরে বিশেষ করে ফার্স্ট বাউন্সি ট্র্যাকে গিয়ে লড়াই করা এবং জেতার সামর্থ্য তৈরি হয়নি এখনো। ২০১৭ সালে টিম বাংলাদেশের টেস্ট সিরিজগুলোর দিকে একবার তাকালেই দেখা মিলবে এ সত্যের।

আসুন সংক্ষেপে বাংলাদেশের এ বছরের টেস্ট পরিসংখ্যানটা দেখে নেই। ২০১৭ সালে মোট ৯টি টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ। যার ৭টি দেশের বাইরে। আর ২টি মাত্র ম্যাচ ঘরের মাঠে। কাকতালীয়ভাবে সবগুলো ম্যাচেরই ফল নিষ্পত্তি হয়েছে। টাইগাররা জিতেছে দুটি টেস্টে এবং হেরেছে সাতটিতে।

jagonews24

প্রথম জয়ের দেখা মেলে ২০১৭ সালের মার্চে; শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোর পি সারা ওভালে লঙ্কানদের বিপক্ষে নিজেদের শততম টেস্টে ৪ উইকেটের অসাধারণ এক জয় পায় মুশফিকুর রহীমের দল। এরপর আগস্টে ঘরের মাঠে অসিদের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক জয়। মিরপুরের শেরেবাংলায় ২০ রানের অবিস্মরণীয় জয় দিল ধরা।

তবে বছর শুরু হয় নিউজিল্যান্ড সফর দিয়ে। জানুয়ারিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ক্রাইস্টচার্চ আর ওয়েলিংটনে দুই ম্যাচের সিরিজ খেললো মুশফিকের দল। ফলের দিকে তাকালে মনে হবে সিরিজটি খুব খারাপ কেটেছে বাংলাদেশের।

কারণ ওয়েলিংটনে প্রথম টেস্টে কিউইরা জয়ী হয় ৭ উইকেটের ব্যবধানে। আর ক্রাইস্টচার্চে দ্বিতীয় ও শেষ ম্যাচে টাইগাররা হার মানে ৯ উইকেটে; কিন্তু পারফরমেন্সের বিচারে ওই সিরিজকে মোটেও বাজে বলার সুযোগ নেই। কারণ, সামগ্রিক বিচার-বিশ্লেষণে টাইগারদের পারফরমেন্স ভাল ছিল।

বিশেষকরে ঘরের মাঠে অনুকুল পরিবেশ-প্রেক্ষাপটে ব্ল্যাক ক্যাপ্সদের বিপক্ষে প্রতিকূল ও অনভ্যস্ত আবহাওয়া, পরিবেশ আর উইকেটেও মুশফিকের দল বুৃক চিতিয়ে লড়াই করেছে। প্রথম তিনদিন রীতিমত চালকের আসনেই ছিল বাংলাদেশ।

কিন্তু শেষ দুই দিনে ম্যাচ হয়েছে হাতছাড়া। সেটাই শেষ নয়। ওয়েলিংটনে প্রচন্ড ঠান্ডা আবহাওয়া, কনকনে বাতাস আর ফার্স্ট ও বাউন্সি ট্র্যাকে সাকিব আল হাসান ডাবল সেঞ্চুরি করে বসেন। সঙ্গে অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের ব্যাট থেকে আসে দারুণণ এক সেঞ্চুরি।

যে উইকেটে কিউই ফাস্ট বোলার ট্রেন্ট বোল্ট আর টিম সাউদির প্রচণ্ড গতি আর সুইংয়ে খাবি খান অনেক নামি-দামি ব্যাটসম্যান, সেখানে সাকিব (২১৭) আর মুশফিক (১৫৯) স্বচ্ছন্দে খেলে এক জুটিতে ৩৫৯ রানের বিশাল ইনিংস গড়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন।

ওই জোড়া সেঞ্চুরিতে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৫৯৫ রানের হিমালয় সমান স্কোর গড়ে; কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে হয় ছন্দপতন। প্রথমবার এক অধিনায়ক মুশফিকুর রীহম যে রান করেছিলেন, দ্বিতীয় বার প্রায় সেই স্কোরে (মাত্র ১৬০ রানে) অলআউট হয় পুরো দল। তাতেই ঘটে সর্বনাশ। প্রায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ক্রাইস্টচার্চে দ্বিতীয় টেস্টেও।

সেখানে প্রথম ইনিংসে ২৮৯ রানে ইনিংষ শেষ হলেও বোলারদের চেষ্টায় কিউইদের ৩৫৪ রানে থামিয়ে দেয় বাংলাদেশ। মাত্র ৬৫ রানে পিছিয়ে পড়ে ঠিক দ্বিতীয়বার ব্যাটিংয়ে নেমে একদম মাটিতে নুয়ে পড়ল টিম বাংলাদেশ। ১৭৩ রানে সব উইকেট খুইয়ে বসে তারা। শেষ অবধি ৯ উইকেটে হার মেনে মাঠ ত্যাগ করতে হয় বাংলাদেশকে।

এরপর ফেব্রুয়ারিতে ভারতের বিপক্ষে প্রথমবারেরমত টেস্ট সিরিজ খেলতে যায় বাংলাদেশ। মাত্র এক ম্যাচে টেস্ট সিরিজ ছিল সেটি। সেখানেও দ্বিতীয় ইনিংসে চরম ব্যাটিং ব্যর্থতার কারণেই বড় পরাজয় থাকে সঙ্গী। ভারতের পাহাড় সমান ৬৭৯ রানের জবাবে প্রথমবার ৩৮৮ পর্যন্ত পৌঁছালেও দ্বিতীয় ইনিংসে আবার ২৫০ রানে অলআউট। এ কারণেই ২০৮ রানের পরাজয়ই থাকে সঙ্গী। দ্বিতীয় ইনিংসে একটু রয়ে-সয়ে খেলতে পারলে ম্যাচটি ড্রও করতে পারতো বাংলাদেশ।

ভারতের সাথে এক ম্যাচের টেস্ট সিরিজ হাতছাড়া হওয়ার পর মার্চে শ্রীলঙ্কার মাটিতে দুই ম্যাচের সিরিজ ১-১ এ ড্র করে মুশফিকরা। গলে প্রথম টেস্টে ২৫৯ রানের বড় ব্যবধানে হারের ধাক্কা সামলে পি সারা ওভালে শততম টেস্টে ৪ উইকেটের অবিস্মরণীয় জয়।

jagonews24

আগস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দেশের মাটিতে আবার দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ। সেখানে উল্টো চিত্র। ঢাকার শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ২০ রানের ঐতিহাসিক জয় ধরা দেয়। দুর্দান্ত অলরাউন্ড পারফরমেন্সে ম্যাচ সেরা সাকিব আল হাসান। প্রথম ইনিংসে ব্যাট হাতে ৮৪ রানের দারুণ ইনিংস উপহার দেয়ার পর বল হাতে স্পিনে বাজিমাত; (৫/৬৮ আর ৫/৮৫) ১৫৩ রানে ১০ উইকেট দখল করে জয়ের নায়ক ও ম্যাচ সেরা পারফরমার হলেন সাকিব।

চ্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে আবার পরের ম্যাচে পারফমেন্সের অবনমন। প্রথম ইনিংসে ৭২ রানে পিছিয়ে (অজিদের ৩৭৭ রানের জবাবে ৩০৫) থেকে আবার দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে ধ্বস (১৫৭ অলআউট)। তাতেই ম্যাচ থেকে ছিটকে গিয়ে ৭ উইকেটে হার।

এরপর সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে গিয়ে চরমভাবে নাজেহাল টাইগাররা। একমাস আগে দেশের মাটিতে যার অলরাউন্ড ণৈপুন্যে দলকে এনে দিয়েছিল ঐতিহাসিক সাফল্য, সেই সাকিব দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলেননি।

ছুটিতে বিশ্রামে ছিলেন তিনি। তাতেই দলের বোলিং ও ব্যাটিং শক্তি যায় অনেকটাই কমে। বাকিরাও কেউ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেননি। যা হবার তাই হয়েছে। পচেফস্ট্রমে প্রথম টেস্টে ৩৩৩ রানের বিরাট পরাজয়। ব্লুমফন্টেইনে ইনিংস ও ২৫৩ রানের লজ্জাজনক হার।

পুরো সিরিজে বোলাররা নিজেদের খুঁজেই পায়নি। পেসার ও স্পিনার কারোরই লাইন-লেন্থ ঠিক ছিল না। প্রোটিয়ারা অনায়াসে টাইগারদের নিয়ে ছেলে খেলায় মেতে ওঠেন। শুধু দুই ম্যাচের সিরিজে খুব করুণভাবে হারের কারণেই নয়, বাংলাদেশের পারফরমেন্স ছিল চরম অনুজ্জ্বল।

বছর শেষে আবারো সেই পুরনো সত্যই ফুটে ওঠে- বাড়তি বাউন্স, গতি বা সুইংয়ের দরকার নেই। এশিয়ার বাইরে তুলনামূলক দ্রæত গতির এবং দেশের তুলনায় একটু বেশি উচ্চতায় বল যে পিচে আসে- সেখানে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যান ও বোলারদের দূর্বলতা এবং ঘাটতি আরও বেশি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এআরবি/আইএইচএস/আরআইপি

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]