হাথুরু-মাশরাফি-মুশফিকে আলোচিত ক্রিকেট বর্ষ

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৪:১১ পিএম, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭

বিদায়ী বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেটে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় কি? স্মৃতির পাতা উল্টে এখন হয়তো সেটাই খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। সাফল্য-ব্যর্থতার মিশেলে যে মানুষের সময় কাটে সেটা ক্রিকেট দিয়েও প্রমাণ করা সম্ভব। বাংলাদেশের ক্রিকেটে সে দৃশ্যই সবার চোখে পড়বে। সাফল্য যেমন এসেছে, তেমনি ব্যর্থতার গøানিও পেতে হয়েছে।

তবে মাঠের এসব পারফরম্যান্সের তুলনায় মাঠের বাইরের কিছু ঘটনাও বেশ আলোড়ন তুলেছে বাংলাদেশ ক্রিকেটে। কোচ হাথুরুসিংহের হঠাৎ পদত্যাগ, মাশরাফির টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর কিংবা মুশফিকের নেতৃত্ব হারানো- সে সবরেই অংশ।

haturi

হাথরুসিংহের আলোচিত পদত্যাগ
যার নেতৃত্বে দল সবচেয়ে বেশি চাঙ্গা থাকে, ভাল খেলতেও থাকে মুখিয়ে- সেই মাশরাফির অলক্ষ্যে সরে দাঁড়ানোর ঘটনা বাংলাদেশ সমর্থকদের মনকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েলে। মাশরাফি সত্যিই কেন টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট ছাড়লেন, কী কারণে অধিনায়কত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পাশাপাশি ক্রিকেটের সবচেয়ে ছোট ফরম্যাটে আর না খেলার সিদ্ধান্ত নিলেন?

তা নিয়ে এখনো আছে নানা গুঞ্জন। মাশরাফি কখনো এ সম্পর্কে কোনরকম মন্তব্য না করলেও তার ঘনিষ্ঠ মহল থেকে জানা, মূলতঃ মনের দুঃখ, যন্ত্রনা ও অভিমানেই টি-টোয়েন্টি ছেড়েছেন মাশরাফি।

কারণ, মাশরাফি টি-টোয়েন্টি খেলুক তা চাননি কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। তিনি ভিতরে ভিতওে কলকাঠি নাড়েন। বোর্ডের শীর্ষ কর্তাদের কাছে কান ভারী করেন- মাশরাফির বয়স হয়েছে, তার টি-টোয়েন্টি খেলার মত চপলতা ও ফিটনেসে ঘাটতি আছে।

কোচের এমন অব্যাহত চাপ সইতে না পেরে এক সময় ত্যক্ত-বিরক্ত মাশরাফি নাকি সবার অজান্তে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের অধিনায়ক পদ থেকে সরে দাঁড়ানোই শুধু নয়, জাতীয় দলে না খেলার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেন।

কিন্তু হায়! যিনি মাশরাফিকে এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিলেন, সেই হাথুরুসিংহে নিজেও এখন আর বাংলাদেশের কোচ নন। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে জাতীয় দলের ব্যর্থতার পর চন্ডিকা হাথুরুসিংহে হঠাৎ বোর্ডে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিলেন, তিনি আর বাংলাদেশকে কোচিং করাতে চান না।

বিসিবি অবশ্য তাকে রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। তবে অনঢ় হাথুরু শেষ পর্যন্ত আর থাকেননি। শ্রীলঙ্কার কোচ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। প্রসঙ্গতঃ সেই ২০১৪ সাল থেকে একটানা চার বছর বাংলাদেশের কোচের দায়িত্ব পালন করে সর্বোচ্চ ক্ষমতা ও স্বাধীনতা ভোগ করেছেন হাথুরু।

কিন্তু ১৫ অক্টোবরে হঠাৎ দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে বসেন তিনি। লোভনীয় আর্থিক সুযোগ-সুবিধা আর দল নির্বাচন থেকে শুরু করে, গেম প্ল্যান ঠাউরে দেয়া এবং একাদশ সাজানো- সব কিছুতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করার পরও হাথুরু কেন পদত্যাগ করলেন? সেটাই বড় বিস্ময়ের খোরাক।

তার পদত্যাগের প্রকৃত কারণ এখনো অজানা। খোদ হাথুরুসিংহে নিজে এ নিয়ে কোন আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেননি। বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে কিছু সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। যার সারমর্ম দাঁড়ায় সিনিয়র ক্রিকেটারদের আচরণ ও দায়িত্ব সচেতনতায় অসন্তুষ্ট হয়েই হাথুরুর সরে দাঁড়ানো।

mashrafee

মাশরাফির টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর
তাকে নিয়ে আর তার অধিনায়কত্ব নিয়ে যে কত কাহিনী রচিত হয়েছে, তা গুনে শেষ করা কঠিন। প্রাণখোলা আচরণ, আকাশের মত উদার মানসিকতা এবং দক্ষ ও গতিশীল নেতৃত্বগুণ মাশরাফি বিন মর্তুজাকে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা অধিনায়কের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। সবার চোখে নড়াইলের এ তেজোদ্দীপ্ত ক্রিকেটারটিই বাংলাদেশের সব সময়ের সেরা অধিনায়ক।

পরিসংখ্যানও সে সাক্ষীই দিচ্ছে। তার নেতৃত্বেই সর্বাধিক ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, মধ্য তিরিশেও মাশরাফি দলের এক নম্বর পেসার। নিচের দিকে তার ব্যাট এখনো অনেকের চেয়ে বড় নির্ভরতা। মাশরাফি মাঠে থাকাই অনেক কিছু। দল চাঙ্গা, উজ্জীবিত করার যাদুকরি ক্ষমতা আছে তার। যার নেতৃত্বে সহযোগিরাও ভাল খেলতে হন সর্বোচ্চ উজ্জীবিত।

সামর্থ্যরে সবটুকু উজাড় করে দেন- সেই মাশরাফি ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল হঠাৎ করেই টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়ে বসেন। তাও ম্যাচ শুরুর আগের দিনের প্রেস কনফারেন্সে নয়। খেলা শুরুর আগে টসের পর টিভি সঞ্চালকের সাথে তাৎক্ষণিক কথোপকোথনে।

৬ এপ্রিল কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে অধিনায়ক ও ক্রিকেটার হিসেবে লাল সবুজ জার্সি গায়ে মাঠে নামেন মাশরাফি। তার বদলে অধিনায়কত্বের গুরু দায়িত্ব যার কাঁধে বর্তেছে, সেই সাকিব বল (৩/২৪) ও ব্যাট হাতে (৩১ বলে ৩৮) জ্বলে উঠলে বাংলাদেশ পায় ৪৫ রানের বড় জয়।

এরপর এ বছর আরও দুটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। দুটিই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। প্রথমটি ২৬ অক্টোবর বøুমফন্টেইনে। আর পরেরটি ২৯ অক্টোর পচেফস্ট্রমে। দুটিতেই হারে বাংলাদেশ।

mus

মুশফিকের টেস্ট অধিনায়কত্ব হারানো, সাকিব দুই ফরমেটে অধিনায়ক
টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট থেকে মাশরাফির সরে দাঁড়ানো আর হেড কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের হঠাৎ পদত্যাগের সাথে এ বছর আরও একটি রদবদল সাড়া জাগিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেটে। সেটা অবশ্য আগের দুটির মত ইচ্ছকৃত বা স্বেচ্ছায় নয়। ২০১৭ সালের শেষ মাসে ঘটেছে আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

টেস্ট অধিনায়কত্ব হারিয়েছেন মুশফিকুর রহীম। তার বদলে টেস্ট নেতৃত্ব দেয়া হয়েছে সাকিব আল হাসানকে। শুধু অধিনায়ক পদে রদবদলই নয়, সহ-অধিনায়ক পদেও এসেছে পরিবর্তন। তামিম ইকবালের বদলে সাকিবের ডেপুটি হয়েছেন মাহমুদউল্লাহ।

গত ১০ ডিসেম্বর বিসিবি পরিচালক পর্ষদের সভায় নেয়া হয়েছে এ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। বলার অপেক্ষা রাখে না, বছর খানেকের বেশি সময় ধরেই মুশফিকের টেস্ট ক্যাপ্টেন্সি আর কিপিং নিয়ে চলছে নানা কানাঘুষা। বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন এর আগেও কবার মুশফিকের আচরণ, কথা-বার্তা আর কিপিং নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

সবশেষে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে মুশফিক খোলা প্রেস কনফারেন্সে টিম ম্যানেজমেন্টের আভ্যন্তরীন সিদ্ধান্ত এবং কোচের দিক নির্দেশনার কথা বলে সবার আরও চক্ষুশুল হয়ে ওঠেন। অবশেষে ১০ ডিসেম্বর তার অধিনায়কত্ব কাটা হয়ে যায়। মুশফিকের বদলে প্রায় ছয় বছর পর আবার টেস্ট অধিনায়ক হয়েছেন সাকিব।

২০১১ যদি হয় সাকিবের অধিনায়কত্ব খোয়ানোর বছর, তাহলে ২০১৭ অধিনায়ক সাকিবের প্রত্যাবর্তনের বছর। এর আগে গত ৬ এপ্রিল টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট থেকে মাশরাফি সরে দাঁড়ানোয় ক্রিকেটের সবচেয়ে ছোট ফরম্যাটে বাংলাদেশের নেতৃত্ব বর্তায় সাকিবের কাঁধে।

bpl

বিপিএলে অধিনায়ক মাশরাফির দূর্লভ কৃতিত্ব
তার নেতৃত্বে ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডে হওয়া বিশ্বকাপে প্রথমবার কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে বাংলাদেশ। তার হাত ধরেই এই বছর জুনে প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে যায় টাইগাররা।

বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসে দুটি সেরা অর্জন ও বড় সাফল্য মাশরাফির নেতৃত্বে। লাল সবুজ জার্সি গায়ে ৫০ ওভারের ম্যাচে জাতীয় দল সবচেয়ে বেশি ম্যাচও জিতেছে মাশরাফির নেতৃত্বে। অধিনায়ক মাশরাফির এ সাফল্য শুধু জাতীয় দলেই নয়। আইপিএলের পর টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের দ্বিতীয় সাড়া জাগানো আসর বিপিএলেও অধিনায়ক মাশরাফির সাফল্য আকাশছোঁয়া।

মাশরাফিই একমাত্র অধিনায়ক, যিনি সর্বাধিক চার-চারবার বিপিএল জিতেছেন। শুধু ২০১৬‘তে পারেননি। না হয় ২০১২‘র প্রথম বিপিএল, ২০১৩, ২০১৫ আর ২০১৭‘তে শেষ হাসি অধিনায়ক মাশরাফির। প্রথম দু’বার ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরস, তৃতীয়বার কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স আর এবার রংপুর রাইডার্স চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মাশরাফির যোগ্য নেতৃত্বে।

এআরবি/আইএইচএস/আইআই