ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বিএনপি

মানিক মোহাম্মদ
মানিক মোহাম্মদ মানিক মোহাম্মদ , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:১৮ এএম, ০১ জানুয়ারি ২০১৮

গত এক বছরে পুনর্গঠনের নানা চেষ্টা সত্ত্বেও ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। সরকারের নানামুখী দমন-পীড়নের মধ্যে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে দলটি। তবে নেতাদের কেউ কেউ মনে করেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বিগত বছরগুলোতে দলটির জনপ্রিয়তা বেড়েছে।

২০১৭ সালের মে মাসে ভিশন-২০৩০ ঘোষণা করে আলোচনায় আসে বিএনপি। ভিশন-২০৩০ থেকেই নির্বাচনকালীন সরকারের জন্য ‘সহায়ক সরকার’র প্রস্তাব দেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। কিন্তু সে সময় শিগগিরই সহায়ক সরকারের বিস্তারিত তুলে ধরার কথা জানানো হলেও বছর শেষে সেটি আর সম্ভব হয়নি।

গত বছরের জুলাই মাসের মধ্যে এক কোটির টার্গেট নিয়ে বিএনপির ‘সদস্য সংগ্রহ অভিযান কার্যক্রম’ শুরু হয়। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কয়েক দফায় এ কর্মসূচির সময় বাড়ানো হলেও শেষ পর্যন্ত সদস্য সংগ্রহ অভিযান নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য দিতে পারেনি বিএনপি।

এর আগে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই তৃণমূলে দল পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সারাদেশে নতুন কমিটি করার কথা থাকলেও ২০১৭ সাল শেষেও এ কার্যক্রম শেষ করতে পারেনি দেশের অন্যতম বৃহৎ এ রাজনৈতিক দল।

অন্যদিকে, জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন ইস্যুতে বিগত কয়েক বছরে বিএনপির নিজস্ব কর্মসূচি না থাকলেও ২০১৭ সালের শুরুতে সুন্দরবন রক্ষার দাবিতে বাম সংগঠনের কর্মসূচিতে নৈতিক সমর্থন জানায়। এছাড়া বিএনপির অন্যতম দুই অঙ্গ-সংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের আংশিক কমিটি গঠন হলেও বছর শেষে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেননি শীর্ষ নেতারা।

গত জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে চিকিৎসার জন্য লন্ডন সফরে যান খালেদা জিয়া। প্রায় তিন মাস লন্ডন অবস্থানকালে দেশের রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়। বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয় তিনি আর দেশে ফিরবেন না। এর জেরে বিএনপির কার্যক্রম কার্যত কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। বিএনপির কিছু নেতার মধ্যে হতাশাও দেখা যায়। তবে লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর বিমানবন্দর থেকে খালেদা জিয়ার বাসা পর্যন্ত নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি দলের মধ্যে নতুন করে প্রাণসঞ্চার হয়। এরপর খালেদা জিয়ার কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচিও সারাদেশে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা যোগায়।

বছরের শেষ দিকে নভেম্বর মাসে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রায় দু' বছর পর বড় ধরনের সমাবেশ করে দলটি। সারাদেশ থেকে আসা নেতাকর্মীরা নেত্রীর নির্দেশনা নিয়ে ফিরে যান। কিন্তু ২১ ডিসেম্বর রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ প্রেস্টিজ রক্ষার লড়াই করলেও তেমন ভোট পাননি বিএনপির প্রার্থী। ২০১৬ সালের শেষ দিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে হারলেও ২০১৭ সালের মার্চে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জয়ের মুখ দেখে বিএনপি।

এছাড়া বিদায়ী বছরে বিএনপির নিয়মিত কর্মসূচির মধ্যে বিবৃতি-ব্রিফিং, আলোচনা সভা, মিলাদ মাহফিল, মানববন্ধন, দলের সর্বোচ্চ ফোরামের সভা ও কূটনৈতিক কয়েকটি কর্মসূচি ছিল উল্লেখযোগ্য।

বিদায়ী বছরে দুই দফা বন্যায় ত্রাণ তৎপরতা দেখালেও শীতকে কেন্দ্র করে তেমন কোনো কার্যক্রম হাতে নেয়নি দলটি। অবশ্য বন্যাদুর্গত এলাকায় ব্যাপক ত্রাণ কার্যক্রমের মাধ্যমে বেশ সুনাম কুড়ায়।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের শুরুতে বিএনপির সমালোচনা থাকলেও বিদায়ী বছরের মাঝামাঝিতে এসে ইসির সঙ্গে সংলাপে যোগ দেয় বিএনপি। তবে বর্তমান ইসি নিয়ে নানা আপত্তি তুললেও তাদের অধীনে অনুষ্ঠিত সবগুলো স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছে দলটি।

এদিকে, আগের বছরের মতো বিদায়ী বছরেও মামলার চাপে ছিল বিএনপি। দলটির শীর্ষ নেতাদের কারাবরণ করতে না হলেও দলটির প্রধান খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে অধিকাংশ নেতাকর্মীর আদালতে হাজিরা ছিল রুটিন মাফিক কাজ। তবে বিদায়ী বছরের শেষের দিকে খালেদা জিয়ার আদালতে হাজিরাকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের ব্যাপক শো-ডাউন ছিল চোখে পড়ার মতো।

বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমীন ফারহানা বলেন, ২০১৭ সালটি আমাদের চাপের মধ্যে কেটেছে। দলের নেতাকর্মীদের বেশিরভাগ সময় কেটেছে কোর্টের বারান্দায় দৌড়াদৌড়ি করে। আমাদের বহু নেতা গুম হয়ে গেছে। একইভাবে দলের নেতাকর্মী ও দেশবাসী দেখেছে বিএনপি কত জনপ্রিয় দল। ম্যাডাম তিন মাস চিকিৎসা শেষে লন্ডন থেকে যখন দেশে ফিরলেন তখন অভূতপূর্ব সাড়া আমরা লক্ষ্য করেছি। এয়ারপোর্টের চারপাশ থেকে শুরু করে বাসা পর্যন্ত লাখো জনতা ওনাকে স্বাগত জানিয়ে নিয়ে আসেন।

‘আমরা দেখেছি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে উনি যখন ত্রাণ দিতে গেছেন সে সময় লাখো মানুষের ঢল নামে রাস্তার দু'পাশে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষ রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সনকে একনজর দেখার জন্য।’

তিনি বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেখেছি মানুষ শত বাধা অতিক্রম করে, প্রতিকূল পরিস্থিতি অতিক্রম করে কীভাবে জমায়েত হয়েছে। ওই সময় আমরা পাঁচ থেকে সাত লাখ লোক দেখেছি। গত ১০ বছরে আমাদের জনপ্রিয়তা কয়েক গুণ বেড়েছে।

দলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিম বলেন, ২০১৭ সাল আমাদের খুব খারাপ গেছে। ভালো যাওয়ার সুযোগ ছিল না। দেশনেত্রীর বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলার কারণে আমরা মর্মাহত। এটা জাতির জন্য দুঃখজনক। ২০১৭ সালে আমরা সরকারের অগণতান্ত্রিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি। তা অব্যাহত রয়েছে। সামনে তা বেগবান হবে। ২০১৮ সালে দেশের জনগণ এ সরকারের হাত থেকে মুক্তি পাবে।

এসব বিষয়ে দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, দলের শীর্ষ দুই নেতা বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা ২০০৭ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সরকারের অত্যাচার-অনাচার সইতে সইতে সময় পার করেছে। এখন আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। আমরা আর নড়তে পারছি না। অত্যাচার-অনাচার সইতে সইতে এ পর্যায়ে এসেছি।

‘২০১৮ সালে কী হবে তা বলা মুশকিল’ উল্লেখ করে গণদাবি মেনে নিয়ে নতুন বছরে আওয়ামী লীগ একটা সুষ্ঠু নির্বাচন করবে- এমনটাই প্রত্যাশা করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. নুরুল আমীন বেপারী বলেন, ২০১৭ সালটা বিএনপির জন্য ভালো যায়নি। সাংগঠনিক দিকটা তারা গুছিয়ে উঠতে পারেনি। খালেদা জিয়াকে আদালতের কাঠগড়ায় আসা-যাওয়া করতে হয়েছে। এর মধ্যে ভালো দিকটি হলো- সুষমা স্বরাজের সঙ্গে তিনি (বিএনপি চেয়ারপার্সন) যে আলোচনা করেছেন তার মধ্য দিয়ে যদি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে একটা ভালো সম্পর্ক স্থাপন করা যায় এবং সেটির মধ্য দিয়ে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আদায় করে নিতে পারলে ভবিষ্যতে ভালো হবে।

তিনি আরও বলেন, ২০১৭ সালের ভুলভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে দলটি ভবিষ্যতে কাজে লাগাবে। মন্দের পর ভালো আসে, ভালোর পর মন্দ আসে। এটাই রাজনীতির আসল বিষয়।

এমএম/এসআর/এমআরএম

আপনার মতামত লিখুন :