আইপিও বাড়লেও ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ মান

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:৫৬ এএম, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮

আগের বছরের তুলনায় ২০১৮ সালে প্রায় দ্বিগুণ প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলন করেছে। প্রতিষ্ঠানের সংখ্যার দিকে থেকে বছরটিতে যেমন আইপিওর সংখ্যা বেড়েছে, তেমনি আইপিওর মাধ্যমে উত্তোলন করা অর্থের পরিমাণও বেড়েছে।

২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আইপিওর মাধ্যমে প্রায় তিনগুণ অর্থ উত্তোলন করেছে। দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ১৪টি প্রতিষ্ঠান আইপিওর মাধ্যমে ৬০১ কোটি ৭৪ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৭ টাকা উত্তোলন করেছে। এর মধ্যে একটি মিউচ্যুয়াল ফান্ড রয়েছে। বাকি ১৩টি কোম্পানি। আগের বছর ২০১৭ সালে দুটি মিউচ্যুয়াল ফান্ডসহ আট প্রতিষ্ঠান আইপিওর মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করে। প্রতিষ্ঠানগুলোর উত্তোলন করার অর্থের পরিমাণ ছিল ২৪৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের পুঁজিবাজারে ২০১৭ সালজুড়ে ছিল আইপিও খরা। সেখান থেকে ২০১৮ সালে এসে আইপিওর সংখ্যা যথেষ্ট বেড়েছে। তবে আইপিওতে যেসব কোম্পানি আসছে তার মান নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মনোযোগ দিতে হবে। বাজারে যাতে ভালো মানের কোম্পানি আসে সে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

তারা বলছেন, পুঁজিবাজারে যত কোম্পানি তালিকাভুক্ত হবে, বাজারের আকার তত প্রসারিত হবে। দায়িত্বশীলদের উচিত ভালো ভালো কোম্পানি যাতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া। আইপিওর সংখ্যা কম হওয়ার কারণে আমাদের পুঁজিবাজারের প্রত্যাশিত গ্রোথ হচ্ছে না। বাজারে কোম্পানির সংখ্যা বেশি থাকলে কারসাজির পরিমাণ কমে যায়।

ডিএসইর এক সদস্য বলেন, ২০১৭ সালে আইপিও খরার পর ২০১৮ সালে আইপিওর সংখ্যা বেড়েছে। তবে সেভাবে কিন্তু আইপিও বাড়েনি। এখন যেসব কোম্পানি আইপিওতে আসছে, তাদের মান নিয় যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। একটি কোম্পানির বিষয়ে তো ডিএসই থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। কিন্তু তারপরও কোম্পানিটির আইপিও অনুমোদন দেয়া হয়। এছাড়া সংবাদ মাধ্যমেও কয়েকটি কোম্পানির প্রসপেক্টাসে বিভ্রান্তকর তথ্য দেয়ার তথ্য এসেছে।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৮ সালে আইপিওর মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করা ১৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মিউচ্যুয়াল ফান্ড রয়েছে একটি। এসইএমএল এফবিএলএসএল গ্রোথ ফান্ড নামের প্রতিষ্ঠানটি উত্তোলন করেছে ৫৫ কোটি টাকা।

আগের বছর ২০১৭ সালে আইপিওতে আসা মিউচ্যুয়াল ফান্ডের সংখ্যা ছিল দুটি। ওই ফান্ড দুটির সম্মিলিত অর্থ উত্তোলনের পরিমাণ ছিল ৮০ কোটি টাকা। সে হিসেবে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে বছর ব্যবধানে অর্থ উত্তোলন কমেছে ২৫ কোটি টাকা।

এদিকে, ২০১৮ সালে আইপিওতে এসেছে ১৩টি কোম্পানি। কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত উত্তোলনের পরিমাণ ৫৪৬ কোটি ৭৪ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৭ টাকা। আগের বছর আইপিওতে আসে ছয় কোম্পানি। ওই কোম্পানিগুলোর উত্তোলিত অর্থের পরিমাণ ছিল ১৬৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। সে হিসাবে আইপিও থেকে কোম্পানির অর্থ উত্তোলন বেড়েছে ৩৭৭ কোটি ৪৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৭ টাকা।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আইপিওতে যত বেশি কোম্পানি আসবে, পুঁজিবাজারের গভীরতা তত বাড়বে। ভালো ভালো কোম্পানি যাতে পুঁজিবাজারে আসে সে জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ সুবিধা দিয়ে কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান এখনও পারিবারিক নিয়ন্ত্রণে। তারা জবাবদিহিতার কারণে পুঁজিবাজারে আসতে চায় না। কারণ এখানে আসলে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে হয়। শেয়ারহোল্ডারদের নিয়ে মিটিং করতে হয়। বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জে জবাবদিহিতা থাকে। এসব কারণে অনেক কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসতে চায় না। এছাড়া আমাদের দেশে সংস্কৃতি হয়ে গেছে যে, ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে তা আর পরিশোধ করতে হয় না। সে কারণে অনেকে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলন না করে ব্যাংক থেকে ঋণ নেন।’

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. বখতিয়ার হাসান বলেন, ‘আইপিওর সংখ্যা বেড়েছে, এটা ভালো লক্ষণ। বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা যত বাড়বে, বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তত বিকল্প পথ সৃষ্টি হবে। তবে আইপিও অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানির মানও দেখতে হবে। বাজারে ভালো কোম্পানি না এসে যদি দুর্বল কোম্পানি আসে তবে তা বাজারের জন্য খারাপ হতে পারে।’

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৮ সালে দুটি কোম্পানি প্রিমিয়াম নিয়ে আইপিওতে আসে। এর মধ্যে বসুন্ধরা পেপারের উত্তোলিত অর্থের পরিমাণ ২০০ কোটি টাকা। প্রিমিয়াম বাবদ কোম্পানিটি নিয়েছে ১৭৩ কোটি ৯৫ লাখ ৮৩ হাজার ২৮৯ টাকা। প্রিমিয়াম নেয়া অপর কোম্পানি আমান কটনের উত্তোলন করা অর্থের পরিমাণ ৮০ কোটি ৭৪ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৭ টাকা। এর মধ্যে প্রিমিয়াম বাবদ প্রতিষ্ঠানটি নিয়েছে ৫৯ কোটি ১৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫৭ টাকা।

এছাড়া বছরটিতে আইপিওর মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করা কোম্পানিগুলোর মধ্যে- কুইন সাউথ টেক্সটাইল ১৫ কোটি, অ্যাডভেন্ট ফার্মা ২০ কোটি, ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং স্টেশন ৩০ কোটি, এসকে ট্রিম অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ ৩০ কোটি, ভিএফএস থ্রেড ডাইং ২২ কোটি, এমএল ডাইং ২০ কোটি, সিলভা ফার্মাসিউটিক্যালস ৩০ কোটি, ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস ২০ কোটি, কাট্টালি টেক্সটাইল ৩৪ কোটি, এসএস স্টিল ২৫ কোটি এবং জেনেক্স ইনফোসিস ২০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছে।

এমএএস/এমএআর/আরএস/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :