বিএসইসি-ডিএসই’র প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:২৯ এএম, ২৮ ডিসেম্বর ২০১৮

কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনের দুই প্রতিষ্ঠান সেনজেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ কনসোর্টিয়ামকে (জোট) পেয়েছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। তবে এ জোটকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী করার ক্ষেত্রে শুরুর পথটা মসৃণ ছিল না ডিএসই’র জন্য। জড়িতে পড়তে হয় পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে। ২০১৮ সালে বিএসইসি-ডিএসই’র এ প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব ছিল পুঁজিবাজারের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়।

বছরের শুরুর দিকে কৌশলগত বিনিয়োগকারীর খোঁজে টেন্ডার (দরপত্র) আহ্বান করে ডিএসই। এতে সেনজেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ কনসোর্টিয়ামের পাশাপাশি অংশ নেয় ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ, ফন্ট ইয়ার বাংলাদেশ ও নাসডাক’র সমন্বয়ে গঠিত আর একটি কনসোর্টিয়াম। টেন্ডারে অংশগ্রহণ করে শেয়ারের সর্বোচ্চ দর এবং কারিগরি সহায়তার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আর্থিক প্রস্তাব দেয়ায় ডিএসই কর্তৃপক্ষ ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে চীনা জোটকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী করার সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে ডিএসই’র ওই সিদ্ধান্তে বাধ সাধে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। ডিএসই’র পর্ষদকে পরপর দুদিন ডেকে নিয়ে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি রীতিমতো শাসিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে টেন্ডারে অংশগ্রহণ করা অপর কনসোর্টিয়ামকে (ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ, ফন্ট ইয়ার বাংলাদেশ ও নাসডাক) কৌশলগত বিনিয়োগকারী করতে চাপ দেয়। এ কনসোর্টিয়ামকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী করতে রাজনৈতিক চাপ রয়েছে বলেও ডিএসইর পর্ষদকে জানানো হয়।

এর আগে বাংলাদেশে উড়ে আসেন ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বিক্রম মুকুন্দ লিময়ে। ঢাকায় এসে বিএসইসি’র শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনির্ধারিত এক বৈঠকে বসেন। এরপর ১১ ফেব্রুয়ারি ডিএসই’র চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল হাশেম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কে এ এম মাজেদুর রহমানকে ডেকে নিয়ে যায় বিএসইসি। ওই বৈঠকে বিএসইসি চেয়ারম্যান ও সিংহভাগ কমিশনার উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বিএসইসি’র এক কমিশনার ডিএসই’র এমডি ও চেয়ারম্যানকে ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী করতে চাপ দেন। ডিএসই’র প্রতিনিধি দল রাজি না হলে ওই কমিশনার তাদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি ডিএসই’র আর একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে বসে বিএসইসি। ওই বৈঠকে ডিএসই প্রতিনিধিদের বিএসইসি’র চেয়ারম্যান বলেন, ‘ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী করতে রাজনৈতিক চাপ রয়েছে।’ এ সময় ডিএসই’র প্রতিনিধিরা বিএসইসি চেয়ারম্যানকে বলেন, ‘এটি করা হলে ডিএসইর স্টেকহোল্ডাররা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন এমন কোনো সিদ্ধান্ত তারা নিতে পারবেন না। এছাড়া কমিশন আগের বৈঠকে যে আচরণ করেছে, ভবিষ্যতে এমন আচরণ করলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়বে।’

এমন পরিস্থিতির মধ্যে চীনের দুই প্রতিষ্ঠান সেনজেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ কনসোর্টিয়ামকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী করতে ডিএসই’র পর্ষদের নেয়া সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য ২২ ফেব্রুয়ারি বিএসইসিতে জমা দেয়া হয়। ডিএসই’র প্রস্তাব আসার পরপরই তা যাচাই-বাছাই করতে চার সদস্যের কমিটি গঠন করে বিএসইসি। এরপরও বিএসইসি’র গঠিত কমিটি সেনজেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাবের বেশকিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এমনকী প্রস্তাবের একটি বিষয়ে আইনের পরিপন্থী বলেও মত দেয় তারা। ফলে ডিএসই’র কাছে বেশকিছু বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডিএসই থেকে বিএসইসিকে জানানো হয় যে, সেনজেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ কনসোর্টিয়াম তার প্রস্তাবের বেশকিছু শর্ত উঠিয়ে নিতে রাজি হয়েছে।

তবে ডিএসই’র ওই ব্যাখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যালোচনা কমিটির মন্তব্যে বলা হয়, ‘কৌশলগত বিনিয়োগকারী ইস্যুতে চীনের কনসোর্টিয়ামের স্বার্থ রক্ষার্থে ডিএসই কর্তৃপক্ষ স্বপ্রণোদিত হয়ে অনেক শর্ত দিয়েছে। এছাড়া কৌশলগত বিনিয়োগকারী ইস্যুতে বিএসইসি ব্যাখ্যা চাইলেও ডিএসই কর্তৃপক্ষ তা করেনি, বরং বিষয়গুলো এড়িয়ে গেছে।’

বিএসইসি ও ডিএসই’র এমন দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ায় ডিএসই’র কৌশলগত বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। তবে ডিএসই’র পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয় গণমাধ্যম। এতে দেরিতে হলেও ৩ মে ডিএসই’র কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনের সেনজেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ কনসোর্টিয়ামকে অনুমোদন দেয় বিএসইসি। ৪ সেপ্টেম্বর চীনা জোটের কাছে ডিএসই’র শেয়ার হস্তান্তরের মাধ্যমে শেষ হয় কৌশলগত বিনিয়াগকারী নিয়ে দ্বন্দ্ব।

বাজার পরিস্থিতি

বিএসইসি ও ডিএসই’র দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে চীনের দুই নামকরা পুঁজিবাজার বাংলাদেশের বাজারে অংশীদার হলেও শেষ হতে চলা বছরটি বিনিয়োগকারীদের জন্য খুব একটা সুখকর হয়নি। বছরটিতে ডিএসই’র বড় অঙ্কের মূল্য সূচক হারানোর পাশাপাশি মোটা অঙ্কের বাজার মূলধনও হারিয়েছে। লেনদেনের ক্ষেত্রেও ছিল নেতিবাচক প্রভাব।

২০১৭ সালের শেষ কার্যদিবসে ডিএসই’র প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স ছিল ছয় হাজার ৩০৬ পয়েন্ট। সেখান থেকে ২৬ ডিসেম্বর লেনদেন শেষে ডিএসইএক্স সূচকটি দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৩৪৯ পয়েন্টে। সে হিসাবে প্রধান মূল্য সূচক ৯৫৭ পয়েন্ট হারিয়েছে ডিএসই। অপরদিকে, ২০১৭ সালের শেষ কার্যদিবসে ডিএসই’র বাজার মূলধন ছিল চার লাখ ২৪ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা, যা ২৬ ডিসেম্বর লেনদেন শেষে দাঁড়ায় তিন লাখ ৮৫ হাজার ১৫৫ কোটি টাকায়। সে হিসাবে বাজার মূলধান কমেছে ৩৫ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা।

মূল্য সূচক ও বাজার মূলধনের মতো লেনদেনেও পড়ে নেতিবাচক প্রভাব। ২০১৭ সালে ৭৮ কার্যদিবসে ডিএসইতে এক হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হয়। এর মধ্যে একাধিক কার্যদিবসে দুই হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হয়। বাকি কার্যদিবসগুলোতে লেনদেন হাজার কোটি টাকা না ছাড়ালেও বেশির ভাগ দিন লেনদেন ছিল সাতশ কোটি টাকার ওপরে। অপরদিকে, ২০১৮ সালে মাত্র চার কার্যদিবস ডিএসইতে এক হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হয়। বছরের বেশির ভাগ কার্যদিবসেই ডিএসইতে লেনদেন ছিল ছয়শ কোটি টাকার নিচে।

সূচক, বাজার মূলধন ও লেনদেনের মতো বিদেশি বিনিয়োগে বছরজুড়ে নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ২০১৮ সালের শেষ হওয়া ১১টি মাসের মধ্যে আট মাসেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজার থেকে যে পরিমাণ টাকার শেয়ার কেনেন বিক্রি করে দেন তার চেয়ে বেশি। বিপরীতে ২০১৭ সালে মাত্র একটি মাসে বিদেশিদের শেয়ার কেনার চেয়ে বিক্রি বেশি ছিল। বাকি ১১ মাস বিদেশিরা যে পরিমাণ অর্থের শেয়ার বিক্রি করেন, ক্রয় করেন তার চেয়ে বেশি।

এমএএস/এমএআর/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :