নির্বাচনের প্রস্তুতিতেই আ.লীগের বছর পার

ফজলুল হক শাওন
ফজলুল হক শাওন ফজলুল হক শাওন , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৮:৩২ এএম, ২৯ ডিসেম্বর ২০১৮

২০১৮ সালের পুরো সময় নির্বাচনের প্রস্তুতিতে কেটেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। বছরের শুরু থেকে আওয়ামী লীগের ১৫টি সাংগঠনিক টিম সারাদেশে সাংগঠনিক সফর শুরু করে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বিভাগভিত্তিক জনসভা করেন।

সারাদেশে তৃণমূল নেতাদের নিয়ে দুদফা গণভবনে আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভাসহ বিভিন্ন জনসভা এবং সাংগঠনিক সফরের মধ্য দিয়ে বছর পার করেন শেখ হাসিনা। সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ডিসেম্বরে তৃণমূল নেতারা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণাতে শেষ করেন বছর।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বছরের শুরুতেই মহাপরিকল্পনা তৈরি করে আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের নেতৃত্বে মহাপরিকল্পনাটি তৈরি হয়। এর অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা নতুন বছরের শুরু থেকেই সারাদেশে সাংগঠনিক সফর শুরু করেন। এ সফরে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নেন কেন্দ্রীয় নেতারা। যাচাই করেন সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের জনপ্রিয়তাও। সেই সঙ্গে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল-দ্বন্দ্ব-বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করেন।

আওয়ামী লীগের ১৫টি সাংগঠনিক টিম মাঠে নামে ২৬ জানুয়ারি থেকে। কেন্দ্রীয় নেতাদের নেতৃত্বে গঠিত এ টিমের সদস্যরা সারাদেশ সফর করেন। দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার নির্দেশে মূলত তারা দলকে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করতেই মাঠে নামেন। প্রায় ছয় মাস ধরে তারা আওয়ামী লীগের ৭৬টি সাংগঠনিক জেলা সফর করেন। এ সফরের মধ্য দিয়ে তারা দলকে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করে তোলেন। অনেক জেলা-উপজেলার দলীয় কোন্দল মিটিয়ে ফেলা হয় এ সফরের মধ্য দিয়ে।

সরকারের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ১২ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কখন ও কীভাবে হবে সেই বার্তা দেন। প্রধানমন্ত্রীর এ বার্তায় মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতারা বিভাগ ও জেলায় জেলায় সফর শুরু করলে নির্বাচনী উত্তাপ আরও বাড়ে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সভায় সিদ্ধান্ত হয়, কেন্দ্রীয় নেতাদের সাংগঠনিক সফরের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়েকটি বিভাগ সফর করবেন।

হযরত শাহ জালালের (রহ.) মাজার জিয়ারত এবং সিলেটে জনসভার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নির্বাচনী সফর শুরু করেন। সিলেট সফরের পর ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি বরিশালে জনসভা করেন। এরপর রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ সফর করেন। এ সব জনসভায় তিনি নৌকা মার্কায় ভোট প্রার্থনা করেন।

চলতি বছরে রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও গাজীপুরে সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এসব নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে জাতীয় নির্বাচনের আমেজ দেখা দেয়। এসব এলাকায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় কোন্দল এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্যও দলকে প্রস্তুত করা হয়।

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এবার ঐতিহাসিক ৭ মার্চ পালন করে ভিন্ন আঙ্গিকে। কারণ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ ‘বিশ্ব প্রামাণ্য দলিল’ হিসেবে ইউনেসকোর স্বীকৃতি পাওয়ার পর এবারই প্রথম দিবসটি উদ্যাপন করে আওয়ামী লীগ। এ কারণে দিবসটি জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। ঘোষণা করা হয় সাতদিনের কর্মসূচি। এ উপলক্ষে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করা হয়।

ওইদিন ঢাকার রাজপথে জনতার স্রোত নামে। ঢাকা মহানগর ও ঢাকা জেলা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ থেকে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী বিভিন্ন শোভাযাত্রাসহ এ জনসভায় যোগ দেন।

৭ মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতির চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস। প্রকৃতার্থে ৭ মার্চের ভাষণ বাংলাদেশের স্বাধীনতার মৌলিক দলিল। বাঙালির বিশ্বজয়ের অমর স্লোগান। যা আজ বিশ্ব ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে ‘ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব্ দ্য ওয়াার্ল্ড রেজিস্ট্রার’-এ অনুর্ভুক্ত করে ইউনেসকো। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের অনন্য স্মৃতি-বিজড়িত দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করতে ১ মার্চ থেকে সাতদিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করে আওয়ামী লীগ।

দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, থানা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সভা-সমাবেশ, সাজসজ্জা, মাইকযোগে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার, র্যালি, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার প্রকাশসহ বর্ণাঢ্য কর্মসূচি গ্রহণের মধ্য দিয়ে যথাযথভাবে ৭ মার্চ পালন করা হয়।

এছাড়া বছরের শুরু থেকেই বিভিন্ন বিভাগে জনসভা এবং বিভিন্ন জেলায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও স্থাপনার উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নৌকা মার্কায় ভোট প্রার্থনা করেন। বিভিন্ন জেলায় প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের সময়ও নৌকা মার্কায় ভোট চান। প্রতিটি সভায় তিনি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছিলেন বলেই আজ দেশের এ উন্নয়ন।’ সরকারের এ ধারাবাহিকতা রক্ষায় আবারও নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।

তবে বছরের শুরুতেই অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক পদ নিয়ে। ঘোষণা ও স্বাক্ষর হওয়ার আগেই কমিটির তালিকা ভাইরাল হয়ে যায়। সাবেক ছাত্রনেতারা অনেকেই বাদ পড়েন। শুরু হয় সাবেক ছাত্র নেতাদের আন্দোলন। কয়েকবার বঞ্চিত ছাত্রনেতাদের তোপের মুখে পড়েন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

এছাড়া ছাত্রদের কোটা আন্দোলনও আওয়ামী লীগকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে। এ বছরের এপ্রিল মাসে কোটা আন্দোলন কর্মসূচি বেগতিক রূপ ধারণ করলে ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১১ এপ্রিল সংসদে ঘোষণা দেন, সরকারি চাকরিতে কোনো ধরনের কোটা আর থাকবে না। সব ধরনের কোটা তুলে দেয়া হবে। এ নিয়ে কাজ করতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে নির্দেশনাও দেয়া হয়। সর্বশেষ মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল করা হয়।

এফএইচএস/এনডিএস/বিএ/এমকেএইচ