‘কষ্টের ইনকাম অবৈধপথে পাঠিয়ে নষ্ট করে দিতে পারি না’

জাগো নিউজ ডেস্ক
জাগো নিউজ ডেস্ক জাগো নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:৫৮ পিএম, ০৪ আগস্ট ২০২২
মাহবুব কবীর মিলন

উপার্জনের অর্থ বৈধপথে দেশে পাঠাতে প্রবাসীদের অনুরোধ জানিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবীর মিলন। এসময় তিনি এক বাংলাদেশি প্রবাসীর কথা স্মৃতিচারণ করেন।

বৃহস্পতিবার (৪ আগস্ট) নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিতে প্রবাসীদের নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দেন তিনি। মাহবুব কবীর মিলনের সেই স্ট্যাটাস হুবহু তুলে ধার হলো।

‘কয়েক বছর আগে সফরে মালয়েশিয়া গিয়ে বেড়াতে গেলাম আইল্যান্ড হোপিং-এ। পাহাড়, সমুদ্র এবং লেক পরিবেষ্টিত মনোরম এক পর্যটন স্পট। একটি কম দামের আবাসিক হোটেলে উঠেছি। ফেরার আগের রাতে পাশেই এক খাবার হোটেলে বসলাম। সেখানে পরিচয় হলো আমাদের দেশের এক প্রবাসী ভাইয়ের। তিনি দিনে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে এবং সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত এই খাবার হোটেলে কাজ করেন।’

‘দেশের মানুষ পেয়ে এত ভালো লাগলো যে, মনে হলো তিনি কতো আপন আমার। আমাকে জিজ্ঞেস করাতে বললাম, এই পাশের হোটেলেই উঠেছি। কুশলাদি বিনিময়ের পর তাকে বললাম, তুমি দেশে টাকা পাঠাও কীভাবে? হুন্ডি নাকি ব্যাংকিং চ্যানেলে? উত্তর দিলো, স্যার ব্যাংকের মাধ্যমে। হুন্ডিতে তো লাভ বেশি। সেখানে নয় কেন? বললো, স্যার হুন্ডিতে দেশের ক্ষতি। আর এত কষ্টের ইনকাম আমার অবৈধপথে পাঠিয়ে তা নষ্ট (হারাম) করে দিতে পারি না। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে।’

‘খাবার শেষে বিল নিয়ে আসতে বললাম। উত্তরে বললো, আপনি আপনার রুমে যান, আমি বিল নিয়ে আসছি। তখন বাজে রাত ১০টার মতো। হোটেলে গিয়ে শুয়ে থাকলাম। রাত ১১টা পার হলো, ১১.৩০ এর দিকে আবার সেখানে গিয়ে ম্যানেজারকে আমার বিলের কথা বললে, তিনি জানালেন দীপু আপনার বিল দিয়ে চলে গেছে। হতবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞাস করলাম, কখন আসবে সে? আগামী কাল সন্ধ্যা ৬টায়। পরেরদিন আমাদের প্লেন বিকেলে। আর দেখা হবে না দীপুর সঙ্গে। ম্যানেজারকে টাকাটা নিতে বললাম, যেন দীপুকে তা দিয়ে দেয়। তিনি বললেন, টাকা নিতে দীপু নিষেধ করেছে।’

‘হেরে গেলাম দীপুর কাছে। আজও বুকটা খচখচ করে। এ কেমন ছেলে সে!! আমি আজও ভেবে পাই না, সামান্য সময় (খাবারের সময়) কথা বলার মাঝে পরিচয় হওয়া ছেলেটি মালয়েশিয়ায় আমার খাবার বিলটি নিজে দিয়েছিল কেন!!’

‘২০১৩ সালে ওমরাহ করতে গিয়েছি। কাবাঘরের ঠিক সামনের হোটেলের ৩/৪ তলায় মার্কেট ছিল। আছর নামাজ পড়ে মাগরিবের আগে পর্যন্ত সেখানে গল্পগুজব করতাম। একটি আতরের দোকানে ছিলেন সালেহ ভাই (এখন সিলেটে বসবাসরত), তার পাশের দোকানেই বশর ভাই (চট্টগ্রাম বাড়ি)। চা, কফি আর চীজ কেক নিয়ে প্রতিদিন সবাই মিলে ভাগাভাগি করে খেতাম। সাথে ছিল আমার স্ত্রী। সালেহ আর বশর ভাইকেও জিজ্ঞেস করেছিলাম, দেশে টাকা পাঠান কীভাবে? তারা একই উত্তর দিয়েছিলেন। দেশের আর নিজের ক্ষতি করে সামান্য কিছু টাকার জন্য হুন্ডিতে টাকা পাঠাই না। অবৈধ পথ মানে হারাম টাকা।’

‘ফেরার আগের দিন বশর ভাইয়ের দোকানে অনেকগুলো তসবি আর মেয়েদের ব্যবহার্য্য জিনিসপত্র কিনে টাকা দিতে গেলে তিনি বেকে বসলেন। কিছুতেই টাকা নেবেন না। তার এক কথা, আপনি এত বড় পদে চাকরি করে প্রতিদিন আমাদের সাথে বসে গল্পগুজব করেছেন, বসার কিছু দিতে পারিনি, দাঁড়িয়ে স্বামী-স্ত্রী দীর্ঘ সময় ছিলেন। আপনাদের টাকা কিছুতেই নিতে পারবো না। মাল ফেরত দিতে চাইলাম, সেটাও তিনি নেবেন না। এক রকম জোর করে ব্যাগ হাতে দিয়ে সিঁড়ি পর্যন্ত নামিয়ে দিয়ে গেলেন। হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ দুজন।’

‘হেরে গেলাম আমরা দুজন বশর আর সালেহ ভাইয়ের কাছে। সালেহ ভাইও অনেকগুলো আতরের দাম নেয়নি। এই ভালোবাসা তো কোনো মূল্য দিয়ে কেনা যায় না। টয়লেটেও দেশি ভাই পেলে সেখানে দাঁড়িয়ে তাদের ভালো-মন্দ খোঁজ নিতাম। আমরা তো ঋণী এই মানুষগুলোর কাছে। জাতিগতভাবেই ঋণী। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং সৌদিতে অনেক প্রবাসী ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরেছি। দোহা এয়ারপোর্টেও তাই।’

‘ভাইয়েরা আমার। যত কষ্টই হোক আপনাদের, যত দুঃখই পান না কেন। আমাদের এই বিপদে আপনারা কি এগিয়ে আসবেন না? এই দেশ তো আপনাদের, আমাদের, সবার। ভালমন্দ ছিল, আছে এবং থাকবে। দিন পরিবর্তন হবেই ইনশাআল্লাহ।’

‘আপনাদের কষ্টার্জিত উপার্জন বৈধপথে পাঠান দেশে। আলো আসতে না চাইলে, তাকে তো টেনে আনতেই হবে।’

জেডএইচ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।