ভারতের তালেবান-নীতিতে পরিবর্তন আসন্ন

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৩৬ পিএম, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

আলতাফ পারভেজ। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস বিষয়ক গবেষক। লিখছেন রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক নানা প্রসঙ্গে। তালেবান ও আফগানিস্তান সরকারের মধ্যকার চলমান শান্তি আলোচনা এবং চুক্তির বিষয় নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজের। বলেন, ‘আফগান যুদ্ধ ছিল আমেরিকার ভুলে ভরা একটি রণনীতি। যে যুদ্ধ থেকে কিছুই অর্জন করতে পারেনি আমেরিকা। আফগানিস্তানে শান্তি ফেরাতে হলে সকল পক্ষকে ছাড় দিতে হবে বলেও মত দেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ : আফগানিস্তানে যা ঘটতে যাচ্ছে, তা প্রত্যাশিত ছিল কি-না?

আলতাফ পারভেজ : হ্যাঁ, এটা প্রত্যাশিত। কারণ যখন দু’পক্ষ কেউ কাউকে হারাতে পারে না তখন একপর্যায়ে তারা আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। আফগানিস্তানে সেটাই হচ্ছে। ন্যাটো তালেবানদের হারাতে পারেনি। আবার ন্যাটোকে ভিয়েতনামের মতো পরাজিত করে তাড়াতেও পারেনি তালেবানরা। যদিও যুদ্ধাবস্থা তাদের পক্ষেই কিছুটা, কিন্তু সিদ্ধান্তসূচক বিজয় তো নেই। ফলে উভয়ে এখন একটা আপসরফায় পৌঁছতে চাইছে।

জাগো নিউজ : যে চুক্তি সম্পন্ন হতে যাচ্ছে, তাতে শান্তি আদৌ ফিরবে কি? এমন একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কোন পক্ষ লাভবান হচ্ছে?

আলতাফ পারভেজ : আফগান সমাজে পূর্ণ শান্তি আসা খুবই দূরবর্তী একটি সম্ভাবনা। কারণ সেখানে বহু ধরনের অশান্তির উপাদান রয়েছে। দেশটা ভৌগলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। সেই গুরুত্বকে ব্যবহার করার মতো পরিণত রাজনৈতিক বিকাশ সেখানে ঘটেনি।

jagonews24

বারবার দেশটিতে বাইরের হস্তক্ষেপ হয়েছে। ফলে নিজের রাজনীতি ও বোধশক্তি নিয়ে সেখানকার নেতৃত্ব দাঁড়াতে পারেনি, দাঁড়াতে দেয়াও হয়নি। ব্রিটেন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র সবাই সেখানে একের পর এক হস্তক্ষেপ করে নানা বিভাজন তৈরি করেছে। তবে দোহার আলোচনায় সম্ভাব্য শান্তির একটা সূচনা হতে পারে। এটার দরকার আছে। এভাবেই শুরু করতে হবে আপাতত। যতটুকু শান্তিই আসুক সেটা আফগান জনগণের জন্য ভালো হবে।

জাগো নিউজ : বলা হচ্ছে, আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোট শূন্য হাতে ফিরছে আফগান থেকে। কিন্তু যুদ্ধনীতি, কর্তৃত্ব, ক্ষমতার প্রশ্নে ন্যাটোর তো বাড়তি শক্তিরও প্রকাশ ঘটল এখান থেকে। আপনার বিশ্লেষণ কী?

আলতাফ পারভেজ : আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে কিছু অর্জন করতে পারেনি। তাদের করদাতাদের বিপুল অর্থ নষ্ট করল কেবল। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতির বিপুল ব্যর্থতার অনন্য নজির স্থাপন হয়েছে। প্রথমত, মুজাহেদিনদের তারাই তৈরি করেছিল। আবার সেই মুজাহেদিন ও তালেবানদের বিরুদ্ধে তারাই যুদ্ধ করল। তাদের এই স্ববিরোধী নীতির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে লাখ লাখ মানুষ মরা গেল। কিন্তু তারা কোথাও এই স্ববিরোধী ভূমিকার জন্য জবাবদিহি করল না। যুক্তরাষ্ট্রের আফগান-নীতি কেবল ভুলে ভরাই নয়— বিধ্বংসীও বটে।

জাগো নিউজ : আলোচনা, চুক্তির মধ্য দিয়ে তালেবানদের ফের ক্ষমতায় আসার পথ প্রশস্ত হলো কি-না?

আলতাফ পারভেজ : আলোচনার ফল যা-ই হোক, তালেবানদের ক্ষমতার হিস্যা তো দিতেই হবে। তারাই বড় হিস্যা পেতে চলেছে। তবে তারা যদি পুরোটাই পেতে চায় তাহলে ভুল করবে। অন্যদের জন্য ক্ষমতার কত ভাগ তারা দিতে রাজি হবে, সেটার ওপরই তাদের সফলতা নির্ভর করছে। তবে শিগগিরই সেটা হবে না। শান্তি আলোচনায় অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। তবে সবার ওপরই সমঝোতার জন্য চাপ রয়েছে।

jagonews24

জাগো নিউজ : সশস্ত্র আন্দোলনে নানা বিপর্যের মধ্যেও টিকে থাকা এক বিস্ময়কর শক্তির নাম 'তালেবান'। এই শক্তির নীতিতে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসবে কি-না?

আলতাফ পারভেজ : তালেবানদের অনেকগুলো দেশ মদদ দিয়েছে। আবার তারা ন্যাটোর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ করেছে, তার ন্যায্যতাও ছিল। অর্থাৎ তাদের যথেষ্ট জনভিত্তিও রয়েছে। এই দুইয়ে মিলে তাদের শক্তি। ন্যাটো তাদের হারাতে পারেনি— এটা অবশ্যই তাদের বড় অর্জন। তবে এখন ন্যাটোর সঙ্গেই তো তাদের আলোচনায় বসতে হচ্ছে। আবার ন্যাটোর পুতুল সরকারের সঙ্গেও বসতে হচ্ছে। অর্থাৎ আলোচনা যে জরুরি সেই উপলব্দি তো তাদের এসেছে। তাদের নীতির যথেষ্ট পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে। এটাই বাস্তবতা।

জাগো নিউজ : তালেবানদের জন্য কী ধরনের চ্যালেঞ্জ সামনে আসছে?

আলতাফ পারভেজ : তালেবানরা যুদ্ধে ভালো করেছে। কিন্তু শান্তিকালে দেশকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারা হবে আসল চ্যালেঞ্জ। তারা সংখ্যালঘুদের কীভাবে ক্ষমতার হিস্যা দেয়, সেটার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। নারীদের নিয়ে তাদের যে নীতি সেটা অনেকখানি বদলাতে হবে। না হলে বৈশ্বিক সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা পাবে না তারা। আবার প্রত্যেক প্রতিবেশীর সঙ্গে তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ভারসাম্য রাখতে হবে। যা মোটেই সহজ হবে না। উপরন্তু রয়েছে আইএস-এর চ্যালেঞ্জ। আফগানিস্তানে দ্রুত আইএস-এর ঘাঁটি হয়ে উঠতে পারে।

জাগো নিউজ : তালেবানদের মুক্তি দেয়াসহ নানা চ্যালেঞ্জে আফগান সরকারও। বিদেশি কর্তৃত্ব খর্ব হলে আফগান সরকার বেসামাল হতে পারে কি-না?

আলতাফ পারভেজ : আফগানিস্তানের এখনকার সরকার তো ন্যাটোর সহায়তায় টিকে আছে। যুক্তরাষ্ট্র পাহারা না দিয়ে রাখলে এই সরকার টিকতে পারবে না। তালেবানরা যত সামনে আসবে, এই সরকারের দিন ততই ফুরাবে। তালেবানরা যদি হাজারা, উজবেক ও তাজিকদের সমর্থন আদায় করতে পারে তাহলে এই সরকারের টিকে থাকারই কোনো দরকার নেই। অন্যের পাহারায় টিকে থাকা সরকারের দরকার কী? তালেবানদের উচিত প্রতিশোধপরায়ন না হয়ে বিদ্যমান পক্ষগুলোকে শান্তিপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে আস্থায় নেয়া এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনের দিকে যাওয়া। তাহলে বর্তমান পুতুল সরকারের দিন শেষ হয়ে যাবে।

jagonews24

জাগো নিউজ : শান্তি আলোচনায় ইরান সরাসরি কোনো পক্ষ নয়। কিন্তু আফগানিস্তানে ইরানের ছায়াশক্তি বাড়ছে। ইরানের অবস্থান নিয়ে কী বলবেন?

আলতাফ পারভেজ : আফগানিস্তানে ইরান পরোক্ষে একটা পক্ষ বটে। হাজারাদের সঙ্গে রয়েছে তারা। আফগানিস্তানে ইরানের বিপুল স্বার্থ রয়েছে। দেশটিতে আইএস বাড়লে ইরানের বিপদ রয়েছে। আবার হাজারারা তাদের নিরাপত্তার অন্যতম গ্যারান্টার মনে করে ইরানকে। তালেবানদের সঙ্গে আগে ইরানের সম্পর্ক বৈরি থাকলেও এখন সেটা আর নেই। তবে এ অবস্থা কতদিন থাকবে, সেটাই দেখার বিষয়। বিশ্বজুড়ে শিয়া-সুন্নি যে বিভেদ আছে, তার অপছায়া আছে আফগানিস্তানেও। ফলে ইরান চাইবে তালেবানদের সঙ্গে একটা সমঝোতায় আসতে। তালেবানরা সেটা কীভাবে নেবে, তার ওপর ইরান-তালেবান সম্পর্কের ভবিষ্যত নির্ভর করছে।

জাগো নিউজ : বলা হচ্ছে, আলোচনা থেকে পাকিস্তান লাভবান হতে পারে। ভারত কীভাবে দেখছে?

আলতাফ পারভেজ : পাকিস্তান এ মুহূর্তে একধরনে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। অতীতে তালেবানদের তারা নানাভাবে সহায়তা করেছে। ফলে এই শক্তি আফগানিস্তানে ক্ষমতায় এলে তারা ভূরাজনীতিতে সুবিধা পাবে। তবে ভারত এতদিন তালেবানদের থেকে দূরে থাকলেও এখন সম্পর্ক নিবিড়ের চেষ্টা করছে বা করবে। যে কোনোভাবেই আফগানিস্তানে তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। ফলে ভারতের তালেবান-নীতিতেও পরিবর্তন আসন্ন। সেটা যুক্তরাষ্ট্রেরও বড় চাওয়া। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানকে তালেবান-পাকিস্তান জোটের হাতে ছেড়ে দিয়ে আসবে না। আরও কিছু শক্তিকে তারা শান্তি আলোচনায় প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে যুক্ত করাবে।

এএসএস/এমএআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]