‘কর্মকর্তারা উন্নয়ন মানে বোঝেন, একই ফুটপাত পাঁচবার করা’

ইসমাইল হোসাইন রাসেল
ইসমাইল হোসাইন রাসেল ইসমাইল হোসাইন রাসেল
প্রকাশিত: ১২:৪৯ পিএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১

বাঙালির ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ভাষা আন্দোলন। ভাষার সম্মান রক্ষা ও রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বন্দুকের সামনে বুক পেতে প্রাণ দিয়েছিলেন রফিক-সালাম-বরকত-জব্বাররা। সেই ভাষাসৈনিকদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের নামে অবিভক্ত সিটি করপোরেশনের ১০টি সড়কের নামকরণ করা হয়।

দীর্ঘ ১৪ বছর পরও ভাষা শহীদদের নামে নামকরণ হওয়া সেসব সড়কের নামফলকের সংস্কার করা হয়নি। পোস্টার-ব্যানার ও ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের মালপত্রে ঢেকে গেছে এসব নামফলক। ফলে অবহেলা অযত্নেই হারিয়ে যাচ্ছে নামফলকে লেখা শহীদদের কৃতিত্বগাথা জীবনবৃত্তান্ত।

ভাষা শহীদদের নামফলকের এমন অযত্ন-অবহেলা ও সিটি করপোরেশনের ভূমিকা নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. মুনতাসির মামুন।

জাগো নিউজ : ২০০৭ সালে ভাষা শহীদদের নামে ধানমন্ডির ১০টি সড়কের নামকরণ করা হয়। তবে অবহেলা অযত্নে সেসব সড়কের নামফলকই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, নতুন প্রজন্ম এসব সড়কের নামই জানে না। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কি?

ড. মুনতাসির মামুন : এগুলোর দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। সিটি করপোরেশন নাম রেখেছে, ফলক বসিয়েছে। সেগুলো রক্ষার দায়িত্বও তাদের, তারা যদি না রাখেন সে বিষয়ে তো আমাদের কিছু করার নেই।

জাগো নিউজ : এর ফলে কি ভাষাসৈনিকদের সম্মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে না?

ড. মুনতাসির মামুন: সারাদেশেই এখন এ অবস্থা। সম্মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না সেটা আপেক্ষিক ব্যাপার। আমি ভাবতে পারি সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা মনে করেন, এগুলো তাদের কাজের অগ্রাধিকার নয়। এসব বিষয়ে কিছু বলার নেই। আমি শুধু বলবো, এদেশের কর্মকর্তারা সৃজনশীল নন, আমলাতন্ত্র সৃজনশীল নন। তারা রুটিন চাপে অথবা কোনো দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠলে কিছু কাজ করেন, নয়ত রুটিন কাজ করেন। উন্নয়ন মানে বোঝেন, একই ফুটপাত পাঁচবার করা, মার্কেট করা; এগুলো হচ্ছে উন্নয়ন। মানসিক উন্নয়নের যে একটি বিষয় রয়েছে সেগুলো সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। সুতরাং এদেশের মানুষ যে রকম, তাদের নেতারাও সে রকম এবং তাদের কাজকর্মও সে রকম।

জাগো নিউজ : এসব নামফলক রক্ষণাবেক্ষণ ও সড়কের নাম যথাযথ ব্যবহারে সিটি করপোরেশনের কি ধরনের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

ড. মুনতাসির মামুন : আমি কিছু মনে করি না। সিটি করপোরেশন এগুলো রক্ষা করবে, নাকি যাদের প্রয়োজন তাদের নামে করবে, সেগুলো কখনই তারা করেনি। কিছু কিছু নামকরণ আছে যেগুলো তাদের নামে জীবিতকালে রাস্তা হওয়ার কথা না কিন্তু হয়েছে। এসব বিষয়ে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই। সিটি করপোরেশন যদি মনে করে ইতিহাসের দলিলপত্র রাখবে তাহলে রাখবে, যদি মনে না করে রাখবে না।

জাগো নিউজ : ভাষাসৈনিকদের প্রতি সম্মান রেখে আর কি ধরনের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে?

ড. মুনতাসির মামুন : আসলে ৭০ বছর আগে ভাষা আন্দোলন হয়েছে। এখন আর কি করা যাবে? ইতিহাসের অংশ এতটুকুই করা হবে আর কিছু করার নেই। একটি করতে পারত সেটি হচ্ছে, ভাষার জাদুঘর করতে পারত; সেটি করা হয়নি। মূল কাজ যেটি সেটিই আজ পর্যন্ত করা হয়নি, সেটি হচ্ছে বাংলা ভাষা শেখানো। যেখানে বাংলা ভাষাই শেখানো হয় না, সেখানে প্রত্যেক ফেব্রুয়ারিতে এসব প্রশ্ন আমার কাছে অবান্তর মনে হয়।

জাগো নিউজ : নতুন প্রজন্মের অনেকেই ভাষা দিবস সম্পর্কে জানে না, তাদের ইতিহাস জানাতে কি ধরনের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

ড. মুনতাসির মামুন : যিনি জানেন না সেটা তার ব্যর্থতা, তার পরিবারের ব্যর্থতা। কারণ এগুলো ক্লাস ওয়ান থেকে পড়ানো হয়। তার মানে তারা ভালো করে পড়ে না, তাই না পড়লে জানবে না। সারাদিন ইউটিউব দেখলে এগুলো জানার কথা নয়। সুতরাং এ প্রশ্ন গত ২০ বছর ধরে শুনছি, ২০ বছরেও যখন কেউ জানতে পারে না তখন আমাদের আর কিছু বলার নেই।

আইএইচআর/এআরএ/এসএইচএস/জেআইএম

মূল কাজ যেটি সেটিই আজ পর্যন্ত করা হয়নি, সেটি হচ্ছে বাংলা ভাষা শেখানো। যেখানে বাংলা ভাষাই শেখানো হয় না, সেখানে প্রত্যেক ফেব্রুয়ারিতে এসব প্রশ্ন আমার কাছে অবান্তর মনে হয়।

এদেশের কর্মকর্তারা সৃজনশীল নন, আমলাতন্ত্র সৃজনশীল নন। তারা রুটিন চাপে অথবা কোনো দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠলে কিছু কাজ করেন, নয়ত রুটিন কাজ করেন। উন্নয়ন মানে বোঝেন, একই ফুটপাত পাঁচবার করা, মার্কেট করা; এগুলো হচ্ছে উন্নয়ন।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]