ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আমাকে ফাঁসানো হয়েছে

মুরাদ হুসাইন
মুরাদ হুসাইন মুরাদ হুসাইন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৩৩ পিএম, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১

সামিয়া রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক এবং টেলিভিশন উপস্থাপক। একটি অভিযোগ তদন্তের পর সম্প্রতি দুটি ট্রাইব্যুনালের সুপারিশের ভিত্তিতে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পদ থেকে তাকে সহকারী অধ্যাপক পদে অবনমন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন সামিয়া রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক মুরাদ হুসাইন

জাগো নিউজ: আপনার বিরুদ্ধে প্লেইজারিজমের (একাডেমিক গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি) অভিযোগ ও ঢাবি প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে কীভাবে দেখছেন?

সামিয়া রহমান: যে অভিযোগে শাস্তি দেয়া হয়েছে, যার পরিচয় (শিকাগো ইউনিভার্সিটির জার্নাল ‘ক্রিটিক্যাল ইনকোয়ারি’র অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যালেক্স মার্টিন পরিচয়ধারী) দিয়ে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো প্রেস থেকে চিঠি এসেছে, সেই অ্যালেক্স মার্টিন বলেই তো ওই জার্নালে কেউ নেই এবং তারা এ ধরনের চিঠি পাঠায়নি। শিকাগো জার্নালের এডিটর নিজে এটি স্বীকার করেছেন। মামলাটাই মিথ্যা। যে প্লেইজারিজমের অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে, সেটির সঙ্গে জড়িত থাকার দালিলিক প্রমাণ ট্রাইব্যুনাল পর্যন্ত দিতে পারেনি। মিথ্যা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। যে চিঠিই মিথ্যা, সেই চিঠির ভিত্তিতে তদন্ত হলে, সেই তদন্ত অবশ্যই ষড়যন্ত্রের। যারা জোর করে ঘটনার সঙ্গে আমাকে জড়িত করছেন, এমনকি ট্রাইব্যুনালও বলছে প্লেইজারিজম না, তারপরও মিথ্যা করে বলা হলো যে, ট্রাইব্যুনালের সুপারিশের ভিত্তিতে তারা নাকি আমাকে দোষী প্রমাণিত করেছেন।

jagonews24

ঘটনাটা প্রথম জানতে পারি ২০১৬ সালে নভেম্বরের শেষ দিকে আমেরিকা যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে বসে। ডিন অফিসের প্রথম ফোনের মাধ্যমে জানানো হয়, আমার আর মারজানের (অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান, একই অপরাধে তারও পদোন্নতি আটকে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে) নামে একটি লেখার হার্ডকপি ও সফটকপি নাকি ডিন অফিস হারিয়ে ফেলেছে। একইসঙ্গে একটা লেখার হার্ড ও সফটকপি কীভাবে হারায়? সবচেয়ে বড় কথা, তাদের আমি জানাই আমি কোনো লেখা জমা দেইনি। তারা বারবার বলে মারজান একটি লেখা জমা দিয়েছিল। আমি মারজানকে তাৎক্ষণিকভাবে ফোন দিলে সে জানায়, ২০১৫ সালে তাকে দেয়া অনেক আইডিয়ার মধ্য থেকে একটি লেখা সে লিখে জমা দেয়, আবার রিভিউয়ার নাকি সেটি গ্রহণও করেছেন। আমি তাকে বকাবকি করি, আমাকে না দেখিয়ে জমা দেয়ার জন্য। সে বলে রিভিউয়ারও নাকি অ্যাকসেপ্ট করে ফেলেছে।

jagonews24

আমি খুব অবাক হই, আমাকে না দেখিয়ে ডিন অফিস কেন লেখাটি প্রসিড করলো। মারজানকে আমি আমেরিকা থেকে ফিরে না আসা পর্যন্ত লেখাটি স্থগিত রাখতে বলি। কিন্তু আমি আমেরিকায় থাকা অবস্থায়ই লেখাটি পাবলিশড হয়ে যায়, আমি জানতে পর্যন্ত পারিনি।

২০১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রথমবার তৎকালীন ডিন ড. ফরিদউদ্দীন আমাকে ফোনে লেখাটি পাবলিশড হওয়ার কথা জানান এবং বলেন, আমার বিভাগের দুজন শিক্ষক লেখাটির জন্য আমার বিরুদ্ধে শাস্তি দাবি করছেন তার অফিসে গিয়ে। অথচ আমি তখন জানতামও না যে, মারজান মানা করার পরও লেখাটি জমা দিয়েছে এবং সেটা পাবলিশড হয়েছে। যেহেতু পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমি জড়িত ছিলাম না, তাই দেরি না করে ৫ ফেব্রুয়ারি আমি সেটা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানাই। সেই স্বাক্ষরযুক্ত চিঠিও আছে আমার কাছে। তৎকালীন উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক স্যারকে বিষয়টি অবহিত করলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি সিন্ডিকেটে বিষয়টি তুলতে বলেন। কিন্তু ড. ফরিদউদ্দীন বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে রাখেন বারবার বলা সত্ত্বেও। বলেন যে, ডেড ইস্যু তোলার দরকার নেই। সাত মাস ধামাচাপা দিয়ে রাখেন। অথচ ২০১৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর উপাচার্য পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ভুয়া চিঠিটি তৈরি করা হয় শিকাগো জার্নালের নামে, অ্যালেক্স মার্টিনের পরিচয় দিয়ে। যেখানে সেই অ্যালেক্স মার্টিন বলেই কারও অস্তিত্ব নেই এবং চিঠিটিও শিকাগো জার্নাল থেকে পাঠানো হয়নি। 

জাগো নিউজ: ষড়যন্ত্রের কথা বলছেন, কীসের ষড়যন্ত্র?

সামিয়া রহমান: দেশের মানুষ আমাকে চেনেন, জানেন। আমার এই পরিচিতি তাদের ঈর্ষা, প্রতিহিংসার পর্যায়ে নিয়ে গেছে বলেই তো ফ্রেম করে (ছক কষে) ষড়যন্ত্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এতোটা নিচু কাজ করলেন। নীতিনির্ধারকদের বিভিন্ন পদে থাকায় আমার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আমাকে নিচে নামানোর পাঁয়তারা যারা করছেন, তারাই এ কাজটি করেছেন।

জাগো নিউজ: অভিযোগের ব্যাখ্যাটি কি সবার কাছে স্পষ্ট?

সামিয়া রহমান: শিক্ষার্থীদের আমি বিভিন্ন সময় নানা ধরনের আইডিয়া দিয়েছি। মারজানকেও আমি বিভিন্ন সময় আইডিয়া দিয়েছিলাম। কিছু কাজও করেছিলাম আগে। তবে বিতর্কিত প্রবন্ধটি আমাকে না জানিয়ে, না দেখিয়ে আমার নির্দেশনা অমান্য করে মারজান বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পাদকীয় বোর্ডে জমা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোনো ধরনের লেখা প্রকাশের আগে সম্পাদকীয় বোর্ড সভা করে সেটি প্রকাশের যোগ্য কি-না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়।

শুনলাম ২০১৭ সালের আগের দু-তিন বছর এ ধরনের কোনো বোর্ডই বসেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা লেখা যে কেউ চাইলেই ছাপাতে পারেন না। প্রথমে সেটা ডিন অফিসে স্বাক্ষর করে জমা দিতে হয় হার্ড ও সফটকপিসহ, তারপর সেটা যায় এডিটরিয়াল বোর্ডের কাছে, তারপর রিভিউয়ারের কাছে। রিভিউয়ার যদি কোনো মেজর বা মাইনর সংশোধনের কথা বলেন বা বাতিল করেন, সেটা যায় এডিটরিয়াল বোর্ডের কাছে। তারপর অথর সংশোধন করতে দেয়া হয়। অথর সংশোধনের পর আবার সেটি যায় এডিটরিয়াল বোর্ডের কাছে। যদি তারা ছাপার যোগ্য মনে করেন, তবে প্রকাশ করেন। এই লেখাটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় আমার জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ তদন্ত কমিটি এমনকি ট্রাইব্যুনাল পর্যন্ত দিতে পারেনি। তারা বলছে, দালিলিক প্রমাণ অস্পষ্ট। অথচ মারজান নিজে স্বীকার করেছে, তদন্ত কমিটির সামনে সে-ই জমা দিয়েছে, সে-ই রিভিউ করেছে। এটি তার অনিচ্ছাকৃত ভুল।

jagonews24

জাগো নিউজ: কমিটি ও ট্রাইব্যুনাল আপনার বিরুদ্ধে কী ধরনের সুপারিশ করেছে?

সামিয়া রহমান: এক মাসে সমাধানের নির্দেশ দেয়া হলেও তদন্ত কমিটি চার বছর লাগিয়েছে তদন্ত করতে। বিষয়টি স্ক্রটিনি (নিগূঢ় পর্যালোচনা) করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনজীবী মেজবাহউদ্দিনকে দায়িত্ব দেয়া হলে তিনি এটাকে প্লেইজারিজম বলেননি। তদন্ত কমিটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কে লেখা জমা দিয়েছে, কে রিভিউ করেছে তার দালিলিক প্রমাণ অস্পষ্ট। মারজান তদন্ত কমিটির কাছে স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছে সে-ই জমা দিয়েছে, সে-ই রিভিউ কপি সংশোধন করেছে। এটা তার অনিচ্ছাকৃত ও অনভিজ্ঞতাবশত ভুল। মারজান স্বীকার করার পরও কেন তদন্ত কমিটি বলে দালিলিক প্রমাণ অস্পষ্ট, কে জমা দিয়েছে। ট্রাইব্যুনাল বলেছে, রিভিউয়ারের কপি আমাদের কাছে পৌঁছায়নি। সেখানে ট্রাইব্যুনাল বলছে, প্লেইজারিজম না, অথচ সিন্ডিকেট বলে দিল—ট্রাইব্যুনালের সুপারিশ অনুযায়ী শাস্তি দেয়া হয়েছে। ড. রহমতউল্লাহ, যিনি ট্রাইব্যুনালের আহ্বায়ক, তিনি নিজে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত মানা হয়নি। কেন মানা হয়নি? এতো প্রতিহিংসা কেন আমার বিরুদ্ধে?

জাগো নিউজ: এতো দিন আপনি প্রতিবাদ করেননি কেন?

সামিয়া রহমান: আমার সাবেক আইনজীবী আমাকে মিসগাইড করেছেন। বলেছেন, তদন্তাধীন বিষয়ে কথা বলা যাবে না। চার বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের হুমকি-ধমকির কারণে বিষয়টি সিন্ডিকেটে মীমাংসিত হওয়ার আগে বাধ্য হয়েই চুপ ছিলাম। ষড়যন্ত্র করে আমার বিরুদ্ধে শিকাগো জার্নালের নামে মিথ্যা চিঠি দিয়ে এতো নিচু কাজ করা হবে সেটি আমার ধারণার বাইরে ছিল। যেহেতু আমার কাছে সব প্রমাণ রয়েছে, তা নিয়ে এখন আমি আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

এমএইচএম/এইচএ/জেআইএম

আমার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আমাকে নিচে নামানোর পাঁয়তারা যারা করছেন, তারাই এ কাজটি করেছেন

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]