করোনাকালে বন্ধ ডিএসইর মোবাইল অ্যাপ নিবন্ধন, ভোগান্তি

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৪৮ পিএম, ০১ জুন ২০২১ | আপডেট: ০১:২৮ পিএম, ০১ জুন ২০২১

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) প্রযুক্তির ওপর জোর দিলেও ‘অদক্ষ’ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) তাতে বাঁধ সাধছে। কর্মকর্তাদের দক্ষতার অভাবে প্রতিষ্ঠানটি প্রযুক্তিতে খুব একটা এগুতে পারেনি। বরং ক্ষেত্র বিশেষে উল্টো পিছিয়ে গেছে।

দেশ স্বাধীনের আগে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এখনো পর্যন্ত ডিজাস্টার রিকভারি (ডিআর) সাইট করতে পারেনি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির তথ্য সম্ভার মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। আইটি সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিলে প্রতিষ্ঠানটি থেকে সব তথ্য হারিয়ে যেতে পারে।

এ দিকে মহামারি করোনাভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতিতে অনলাইন লেনদেনের ওপর অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এই অনলাইন লেনদেনের প্রসার ঘটাতেও প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিএসই।

পুঁজিবাজারে অনলাইনে লেনদেনের ক্ষেত্রে ডিএসইর চালু করা একমাত্র মাধ্যম মোবাইল অ্যাপ। ২০১৬ সালের ৯ মার্চ বেশ ঘটা করেই ‘ডিএসই মোবাইল’ নামে একটি অ্যান্ড্রয়েডভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন চালু করে ডিএসই। এর পর একে একে পাঁচ বছর কেটে গেলেও অ্যাপটি বিনিয়োগকারী বান্ধব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি। উল্টো মহামারি করোনাকালে বিনিয়োগকারীদের নতুন করে মোবাইল অ্যাপ নিবন্ধন দেয়াই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

ডিএসইর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের অক্টোবর থেকেই বিনিয়োগকারীদের মোবাইল অ্যাপ নিবন্ধন দেয়া বন্ধ রেখেছে ডিএসই। প্রায় অর্থবছর ধরে নিবন্ধন দেয়া বন্ধ রাখা হলেও এ বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের কোনো তথ্যই জানায়নি ডিএসই কর্তৃপক্ষ। অবশ্য সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নিবন্ধন দেয়া বন্ধ রাখলেও ডিএসইর কর্মকর্তারা তাদের পছন্দের কিছু বিনিয়োগকারীকে বিশেষ ব্যবস্থায় নিবন্ধন দিচ্ছেন।

মোবাইল অ্যাপে নতুন নিবন্ধন দেয়া বন্ধ রাখার কারণ হিসেবে ডিএসইর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ইতোমধ্যে মোবাইল অ্যাপের ধারণ ক্ষমতার থেকে বেশি বিনিয়োগকারীকে নিবন্ধন দেয়া হয়েছে। ফলে নতুন নিবন্ধন দিতে সমস্যা হচ্ছে। সমস্যা সমাধানে অ্যাপের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে। এই কাজ শেষ হলে বিনিয়োগকারীদের আবার নতুন করে নিবন্ধন দেয়া হবে।

ডিএসইর মোবাইল অ্যাপের নিবন্ধন ও লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি বছরের শুরুতে ডিএসইর মোবাইল অ্যাপে নিবন্ধিত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ছিল ৪৯ হাজার ৩৪৪ জন। যা ১১ মে এসে দাঁড়ায় ৬৪ হাজার ৩১৬ জনে।

jagonews24

নতুন নিবন্ধন দেয়া বন্ধ রাখার পরও অ্যাপে নিবন্ধিত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ার কারণ হিসেবে ডিএসইর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মোবাইল অ্যাপে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নতুন করে নিবন্ধন দেয়া না হলেও, ভিআইপি কিছু বিনিয়োগকারীকে নিবন্ধন দেয়া হচ্ছে। এছাড়া যারা আগে নিবন্ধন নিয়ে রেখেছেন, কিন্তু দীর্ঘ দিন নিষ্ক্রিয় ছিলেন তাদের অনেকেরটা এখন সক্রিয় করা হচ্ছে। এ কারণে হালনাগাদ তথ্যে অ্যাপে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বেড়েছে বলে উঠে এসেছে।’

এদিকে একাধিক ব্রোকারেজ হাউসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিনিয়ত বিনিয়োগকারীরা মোবাইল অ্যাপের নিবন্ধন নেয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কিন্তু ডিএসই থেকে নিবন্ধন দেয়া বন্ধ রাখায় তারা বিনিয়োগকারীদের মোবাইল অ্যাপের নিবন্ধন দিতে পারছেন না। এতে অনেক সময় বিনিয়োগকারীরা অসন্তুষ্ট হচ্ছেন।

এ বিষয়ে একটি ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মোবাইল অ্যাপের নতুন নিবন্ধন আজ দেব, কাল দেব এমন করে মাসের পর মাস পার করে দিচ্ছে ডিএসই। কিন্তু ডিএসইর অদক্ষ জনবলের কারণে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। যার জন্য সাফার করতে হচ্ছে আমাদের। কিছু কিছু বিনিয়োগকারী মনে করছে, আমরাই হয় তো ইচ্ছা করে তাদেরকে মোবাইল অ্যাপের নিবন্ধন দিচ্ছি না। বাস্তবতা হলো- মোবাইল অ্যাপের নিবন্ধনের পুরোটাই ডিএসইর হাতে।’

jagonews24

ডিএসইর এক সদস্য বলেন, ‘দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে শেয়ারবাজার এখন অনেকটাই ভালো অবস্থায় রয়েছে। ডিএসইর ম্যানেজমেন্টে দক্ষ জনশক্তি থাকলে এই বাজারকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নেয়া যেত। কিন্তু দুঃখের বিষয় ডিএসইতে দক্ষ জনবলের বড় অভাব।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই দেখেন, করোনার এই পরিস্থিতিতে মোবাইল অ্যাপ নিবন্ধন দেয়া বন্ধ রাখা হয়েছে। যা সার্বিক বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যদি মোবাইল অ্যাপ নিবন্ধন এখন সচল থাকত, তাহলে অনেক বিনিয়োগকারী নিবন্ধন নিতেন। এতে বাজারে লেনদেনের গতি আরও বাড়ত।’

মোবাইল অ্যাপের নিবন্ধন বন্ধ রাখার কারণ জানতে চাইলে ডিএসইর চেয়ারম্যান ইউনুসুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি প্রযুক্তির লোক না। তারপরও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে যেটা জেনেছি তা হলো- ডিএসইর মোবাইল অ্যাপের যে ধারণ ক্ষমতা রয়েছে, তার থেকে বেশি বিনিয়োগকারীকে নিবন্ধন দেয়া হয়েছে। ফলে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণে অ্যাপের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আশাকরি, শিগগির অ্যাপের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।’

jagonews24

এ সময় কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাবেক এই সিনিয়র সচিব বলেন, ‘ডিএসইর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে আইটিতে দক্ষ লোকবলের অভাব রয়েছে। এখানে কোনো ডিজাস্টার রিকভারি সাইট নেই, এটা চিন্তা করতে পারেন! ইন কেজ কোনো দুর্ঘটনায় সব তথ্য হারিয়ে যাবে। এটা কতোবড় ঝুঁকি চিন্তা করে দেখেন। আমরা নতুন পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নেয়ার পর এটা দেখে অবাক হয়েছি। ডিজাস্টার রিকভারি সাইটের জন্য আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। আশাকরি, শিগগির এ সমস্যার সমাধানও হয়ে যাবে।’

যোগাযোগ করা হলে বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডিএসই থেকে মোবাইল অ্যাপ নিবন্ধন দেয়া বন্ধ রাখার বিষয়টি আমরা জেনেছি। আমরা তাদেরকে ছয় মাস সময় বেঁধে দিয়েছি, সমস্যা সমাধানের জন্য। কমিশন থেকে কন্টিনিউয়াসলি ডিএসইকে চাপে রাখা হচ্ছে।’

jagonews24

এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, ডিএসই মোবাইল অ্যাপে তিনটি সংস্করণ রয়েছে। এর মধ্যে দুটি বিনিয়োগকারীদের জন্য। আর একটি ব্রোকার হাউজের জন্য। বিনিয়োগকারীদের জন্য থাকা দুটি সংস্করণ হলো ‘ডিএসই মোবাইল ভিআইপি’ এবং ‘ডিএসই মোবাইল ট্রেডার’।

কিভাবে ব্যবহার করতে হয় ডিএসই মোবাইল অ্যাপ

যেকোনো বিনিয়োগকারী ডিএসই মোবাইল অ্যাপটি গুগল প্লে স্টোর থেকে ডাউনলোড করতে পারবেন। ডাউনলোড করার পর এটি ব্যবহার করার জন্য একজন বিনিয়োগকারীকে ব্রোকারেজ হাউজ থেকে একটি ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড নিতে হয়। এই ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড নেয়ার পর অ্যাপটির মাধ্যমে শেয়ার কেনাবেচার আদেশ দিতে পারেন বিনিয়োগকারীরা। আদেশ কার্যকর হলে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে তার মোবাইলে একটি এসএমএস যায়।

jagonews24

কোন সংস্করণে কী

ডিএসই ইনভেস্টর সংস্করণ দিয়ে হাউজগুলো ডিলার হিসেবে শেয়ারের সর্বশেষ তথ্য জানার পাশাপাশি শেয়ার কেনা-বেচার আদেশ দিতে পারে। অপরদিকে ডিএসই মোবাইল ভিআইপি দিয়ে সরাসরি লেনদেন করা যায় না। এটি দিয়ে মোবাইলে পোর্টফোলিও দেখা যায়। আর ডিএসই মোবাইল ট্রেডার দিয়ে বিনিয়োগকারী নিজেই লেনদেন সম্পন্ন করতে পারেন। তবে বাজার দরের চেয়ে বেশি দরে লেনদেনের অফার বা অর্ডার করলে সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউজ তা বাতিল করতে পারে।

এমএএস/এমআরআর/জিকেএস

মোবাইল অ্যাপের নতুন নিবন্ধন আজ দেব, কাল দেব এমন করে মাসের পর মাস পার করে দিচ্ছে ডিএসই। কিন্তু ডিএসইর অদক্ষ জনবলের কারণে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। যার জন্য সাফার করতে হচ্ছে আমাদের।

দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে শেয়ারবাজার এখন অনেকটাই ভালো অবস্থায় রয়েছে। ডিএসইর ম্যানেজমেন্টে দক্ষ জনশক্তি থাকলে এই বাজারকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নেয়া যেত। কিন্তু দুঃখের বিষয় ডিএসইতে দক্ষ জনবলের বড় অভাব।

ডিএসই থেকে মোবাইল অ্যাপ নিবন্ধন দেয়া বন্ধ রাখার বিষয়টি আমরা জেনেছি। আমরা তাদেরকে ছয় মাস সময় বেঁধে দিয়েছি, সমস্যা সমাধানের জন্য। কমিশন থেকে কন্টিনিউয়াসলি ডিএসইকে চাপে রাখা হচ্ছে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]