Jago News logo
Banglalink
ঢাকা, সোমবার, ২৬ জুন ২০১৭ | ১১ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

অফিস ভাড়ার নামে প্রগতি লাইফের টাকা নয়ছয়


সাঈদ শিপন, নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২:৩১ পিএম, ১১ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার | আপডেট: ০৯:৩১ এএম, ১৩ জানুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার
অফিস ভাড়ার নামে প্রগতি লাইফের টাকা নয়ছয়

রাজস্ব ফাঁকি, কমিশনে অনিয়ম, হিসাবে গরমিল, সম্মেলনের নামে আর্থিক অনিয়ম, পরিচালকদের অনৈতিক সুবিধা, এজেন্ট ও এমপ্লয়ার অব এজেন্ট প্রশিক্ষণ ব্যয়ে অনিয়মসহ নানাবিধ অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে জীবন বীমা কোম্পানি প্রগতি লাইফের বিরুদ্ধে। এসব অনিয়মের কারণে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গ্রাহকরা। এতে একদিকে হচ্ছে আইন লঙ্ঘন, অন্যদিকে মানি লন্ডারিংয়ের আশঙ্কা। প্রতিষ্ঠানটির এসব অনিয়মের তথ্য নিয়ে জাগো নিউজের সাত পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে চতুর্থ পর্ব

অফিস ভাড়া খাতে অস্বাভাবিক অর্থ ব্যয় করেছে প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স। মাঠ পর্যায় এবং প্রধান কার্যালয়ের অফিস ভাড়ার আগের বছরের অগ্রিম সমন্বয় শেষ হওয়ার আগেই নতুন করে দেয়া হয়েছে অগ্রিম।

অফিস ভাড়া খাতে অস্বাভাবিক অর্থ ব্যয় এবং নিয়মবহির্ভূত অগ্রিম দেয়া বীমা আইন ২০১০ এর ২৬ (২) ধারা পরিপন্থী। এতে প্রতিষ্ঠানটির নগদ-প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং গ্রাহকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে। সেই সঙ্গে আর্থিক অনিয়মের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।

আইডিআরএ’র বিশেষ নিরীক্ষায় উঠে এসেছে, প্রগতি লাইফ ২০১২ সালে অফিস ভাড়া খাতে ৫ কোটি ৮০ লাখ ৯০ হাজার ৮৭১ টাকা, ২০১৩ সালে ৫ কোটি ২৭ লাখ ৯১ হাজার ৪৬৯ এবং ২০১৪ সালে ৫ কোটি ৫৭ লাখ ১৮ হাজার ৪০৫ টাকা ব্যয় করেছে।

progoti

প্রতিষ্ঠানটির অফিস ভাড়া খাতে ব্যয় করা এ অর্থ প্রথম বর্ষ ব্যবসা সংগ্রহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না এবং অস্বাভাবিক বলছে বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ।

কারণ হিসেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০১২ সালে প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম আয়ের ১৫ দশমিক ২৭ শতাংশ, ২০১৩ সালে ৪০ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ১৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ অফিস ভাড়া খাতে ব্যয় করা হয়; যা জীবন বীমা ব্যবসার প্রকৃতি অনুযায়ী অস্বাভাবিক।

আইডিআরএ’র অভিমত, কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব সঠিকভাবে পরিপালন না হওয়ায় অফিস ভাড়া খাতে এমন অস্বাভাবিক অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এটি কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার কর্মদক্ষতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। অস্বাভাবিক ভাড়া দেয়ার কারণে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ব্যয় অনুমোদিত সীমার চেয়েও বেশি হয়েছে। ফলে বীমা গ্রাহকদের আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা বিদ্যমান।

প্রতিষ্ঠানটির অগ্রিম অফিস ভাড়ার বিষয়ে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে প্রগতি লাইফ মাঠ পর্যায়ে নতুন অফিস ভাড়া নেয়নি। অথচ ২০১২ সালে মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোতে অফিস ভাড়া অগ্রিমের প্রারম্ভিক জের ১ কোটি ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৪৪৯ টাকা থাকার পরও নতুন করে ৫২ লাখ ৮৩ হাজার ২৮৮ টাকা অগ্রিম দেয়া হয়েছে।

progoti

একইভাবে ২০১৩ সালে অফিস ভাড়া অগ্রিমের প্রারম্ভিক জের ১ কোটি ৩৬ লাখ ৯৪ হাজার ৮২১ টাকা থাকার পরও নতুন করে ৭৬ লাখ ৫২ হাজার ৫৩০ টাকা অগ্রিম দেয়া হয়। পরের বছর ২০১৪ সালে অফিস ভাড়া অগ্রিমের প্রারম্ভিক জের ১ কোটি ৮৭ লাখ ৪ হাজার ৪৭৯ টাকা থাকার পরও নতুন করে ৫০ লাখ ৫৫ হাজার ৭৪৫ অগ্রিম দেয়া হয়।

আইডিআরএ বলছে, যেহেতু নতুন অফিস নেয়া হয়নি সেহেতু অগ্রিম ভাড়া দেয়ার প্রশ্ন আসে না। যদি বাড়ি ভাড়া নবায়নের ক্ষেত্রে অগ্রিম দেয়া হয়, তবে আগের অগ্রিম সমন্বয় হওয়ার পর নতুন করে অগ্রিম দেয়ার প্রশ্ন আসে। কিন্তু প্রগতি লাইফ কী কারণে সমন্বয় হওয়ার আগেই নতুন করে অগ্রিম দিয়েছে, সে বিষয়ে কোম্পানি থেকে পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায়নি। এভাবে নিয়মবহির্ভূতভাবে অগ্রিম প্রদানের ফলে নগদ প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাবের কারণে গ্রাহকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় এবং আর্থিক অনিয়মের সম্ভাবনা থাকে।

প্রধান কার্যালয়ের অগ্রিম ভাড়ার বিষয়ে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১২ সালে প্রারম্ভিক জের ১ কোটি ৪৯ লাখ ৮৩ হাজার ৩৫০ টাকা থাকার পরও নতুন করে ২ কোটি ৮৫ লাখ ৯১ হাজার ৬৫০ টাকা দেয়া হয়েছে।

একইভাবে ২০১৩ সালে ৩ কোটি ৫৩ লাখ ৪১ হাজার ৯৪৩ টাকা প্রারম্ভিক জের থাকার পরও নতুন করে ৩০ লাখ ২৫ হাজার ৬৭৭ টাকা অগ্রিম দেয়া হয়েছে।

পরের বছর ২০১৪ সালে ১ কোটি ৮৫ লাখ ৭৪ হাজার ৫৪৮ টাকা প্রারম্ভিক জের থাকার পরও নতুন করে অগ্রিম দেয়া হয় ১ কোটি ৫ লাখ ৯৫ হাজার ৭০০ টাকা।

কারওয়ানবাজারে প্রগতি লাইফের প্রধান কার্যালয় অবস্থিত প্রগতি ইন্স্যুরেন্স ভবনের তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম এবং নবম তলা নিয়ে। ২০১৩ সালে নবম তলা প্রগতি লাইফ এবং প্রগতি ইন্স্যুরেন্সের মধ্যে ৫০ শতাংশ হারে ভাগাভাগি হয়। পরের বছর ২০১৪ সালে নবম তলার ৭৫ শতাংশ প্রগতি লাইফ এবং ২৫ শতাংশ প্রগতি ইন্স্যুরেন্সের নামে ভাগাভাগি হয়।

progoti

নবম তলা প্রগতি লাইফ এবং প্রগতি ইন্স্যুরেন্সের মধ্যে ভাগাভাগি হলেও চুক্তি অনুযায়ী ওই ফ্লোরের সব ভাড়া প্রগতি লাইফ বহন করে। ফলে প্রগতি লাইফ ফ্লোরটি আনুপাতিক হারে ব্যবহার করে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান।

এছাড়া প্রগতি লাইফ এবং প্রগতি ইন্স্যুরেন্সে ‘কমন ডিরেক্টরশিপ’ থাকার পরও রিলেটেড পার্টি ডিসক্লোজার হিসেবে বার্ষিক হিসাব বিবরণীতে ডিসক্লোজ করা হয়নি; যা বিএএস-২৪ এবং বীমা আইন ২০১০ এর ২৬ (২) ধারা পরিপন্থী।

আইডিআরএ বলছে, কমন ডিরেক্টরশিপ থাকার কারণে অফিস ভাড়া আগের অগ্রিম সমন্বয় হওয়ার আগেই নতুন করে অগ্রিম দেয়া হয়। এটি না করে অগ্রিম দেয়া টাকা অন্য লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগ আয় বৃদ্ধি পেত এবং বীমা গ্রাহকরা আর্থিক সুবিধা পেত। কিন্তু কোম্পানি ওই অর্থ বিনিয়োগ না করে পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে প্রগতি লাইফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জালালুল আজিম জাগো নিউজকে বলেন, অফিস ভাড়ার বিষয়ে নিরীক্ষক যে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে তা সঠিক নয়। তারা বিষয়টি না বুঝেই অনিয়মের কথা বলেছে। আর অগ্রিম ছাড়া কোনো অফিস ভাড়া নেয়া সম্ভব নয়। আমাদের কোনো অফিস এক বছরের জন্য, কোনো অফিস দুই বছরের জন্য আবার কোনো অফিস তিন বছরের জন্য ভাড়া নেয়া হয়েছে। সুতরাং সব অগ্রিম একসঙ্গে ‘ক্লিয়ার’ হবে না। কিন্তু নিরীক্ষক সব গড়ে হিসাব করেছে।

এমএএস/এনএফ/এআরএস/জেআইএম

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Jagojobs