ছিন্নমূলের আশ্রয়কেন্দ্র গাবতলী ওয়াটার বাস টার্মিনাল


প্রকাশিত: ০৪:৩৫ পিএম, ১১ জানুয়ারি ২০১৭
ছিন্নমূলের আশ্রয়কেন্দ্র গাবতলী ওয়াটার বাস টার্মিনাল

যান্ত্রিক নগরীতে পরিবহন সমস্যা ক্রমেই প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। জীবন জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষকে কর্মস্থলে ছুটে বেড়াতে হয়। তীব্র যানজটের কারণে নির্ধারিত গন্তব্যে যথাসময়ে পৌঁছাতে না পাড়ার বেদনা নিত্যদিন নগরবাসীকে পীড়া দেয়। ২০১২ সালের কথা। ঘটা করে উদ্বোধন করা হয় রাজধানী ঘিরে থাকা নদীগুলোতে ওয়াটার বাস। লক্ষ্য ছিল রাজধানীবাসীর যাতায়াতে দুঃখ লাঘব করা। গাবতলী থেকে বাবুবাজার, বাদামতলী ও সদরঘাট পর্যন্ত ২৯ কিলোমিটার পথ যানজটমুক্ত, আরামদায়ক ও কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। বিআইডব্লিউটিসির এ উদ্যোগে এক বুক স্বপ্নও বেঁধেছিল রাজধানীবাসী। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই আশা যেন দুরাশায় রূপ নেয়। বর্তমানে প্রায় ব্যর্থ এই প্রকল্প। অপরদিকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হাতিরঝিলে এফডিসি থেকে মেরুল বাড্ডা ও গুলশান গুদারাঘাটে সম্প্রতি চালু হওয়া ওয়াটার বাস সার্ভিস স্বল্প সময়ের মধ্যে জনগণের মাঝে আশা জাগিয়েছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও আন্তরিকতা থাকলে যে একটি প্রকল্প সফল হতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ হাতিরঝিলের ওয়াটার সার্ভিস। জাগো নিউজের একঝাঁক তরুণ সংবাদকর্মী সরেজমিন দুটি প্রকল্প ঘুরে এসে একাধিক প্রতিবেদন তৈরি করেছেন।
 
খাঁ খাঁ করছে নদীতে নামার সিঁড়িগুলো। কোথাও যেন কেউ নেই। মানুষের সাড়াশব্দ বাড়তে থাকে সকাল সাড়ে ৮টার পর। লালু কিংবা আফজাল মাঝির হাঁকডাক শোনা যাচ্ছিল মাঝে মধ্যে। ডিঙ্গি নৌকায় এপার ওপার যাতায়াত করতে দেখা যায় ইশারাবাদ আমিনবাজার এলাকার লোকজনকে। কিন্তু এটা যে গাবতলী ওয়াটার বাস টার্মিনাল তা বোঝার কোনো উপায় নেই।
 
সোমবার সকাল ৮টায় সরেজমিনে গাবতলী ওয়াটার বাস টার্মিনালে এসে দেখা যায়, অফিস কক্ষের সামনে শুয়ে আছেন ছিন্নমূলের তিনজন। ভ্রাম্যমাণ বাদাম, সিগারেট বিক্রেতা কিংবা দিনমজুরদের বসে থাকতে দেখা যায় ওয়াটার বাস টার্মিনালে। তবে তালাবদ্ধ অফিস কক্ষ। জানালা দিয়ে তাকালেই দেখা যায়, চেয়ার ও টেবিল পড়ে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। স্পষ্ট বোঝার উপায় নেই এটাই গাবতলী ওয়াটার বাস টার্মিনালের অফিস।

gabtoli
 
ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়েছে ওয়াটার বাস টার্মিনালের সাইনবোর্ড। নৌ-রুটের কোথায় কতো টাকা ভাড়া তাও ময়লায় ঢাকা পড়েছে। দুপুর পেরিয়ে বিকেল গড়ালেও খোলেনি অফিস কক্ষ। নেই যাত্রীদের আনাগোনাও। সর্বশেষ কতদিন আগে অফিস খোলা হয়েছিল তাও হলফ করে বলতে পারছে না কেউ। গাবতলী ওয়াটার বাস টার্মিনাল কর্তৃপক্ষের কাউকেই পাওয়া যায়নি।

পন্টুনের নিচে কথা হয় লাল মাঝির সঙ্গে। তিনি বলেন, ওয়াটার বাস টার্মিনালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বভাবের দোষে যাত্রীরা এখানে আসে না। নিজেদের খেয়াল খুশিতে চলে ওয়াটার বাস। কখনো বিকেলে কখনো বা দুপুরে। সকালে গত দুই মাসে একটি রুটেও দেখিনি ওয়াটার বাস চলতে।
 
আফজাল মাঝি বলেন, এখান থেকে সোয়ারিঘাট, বাবুবাজারে যেতে সময় লাগে মাত্র পৌনে এক ঘণ্টা। কিন্তু কখনোই এখান থেকে ওয়াটার বাস যথাসময়ে ছাড়ে না। ভরপুর যাত্রীর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয় অপেক্ষমাণ যাত্রীদের। পৌনে এক ঘণ্টার নৌপথ পাড়ি দিতে যাত্রীদের অপেক্ষা করতে হয় ৩ ঘণ্টারও বেশি। এসব কারণে আর যাত্রীরা এখানে আসতে চান না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, গত কুরবানির ঈদের পর থেকে এ সার্ভিস বলা যায় এক রকম বন্ধই। আগে সরকারিভাবে যখন চলতো তখনই ভালো ছিল। তখন যাত্রী না হলেও নির্দিষ্ট সময় ছেড়ে যেত। আর এখন তো সময় মতো বাসই আসে না। এলেও যাত্রীদের অপেক্ষায় থাকতে হয়।

gabtoli
 
গত ১৫ দিনেও অফিস খোলেনি বলে জানান নীরাঞ্জন রাজবংশি নামে এক জেলে। ছিন্নমূল মানুষের আশ্রয় কেন্দ্র হয়েছে ওয়াটার বাস টার্মিনাল।
 
এ বিষয়ে সোমবার দুপুরে ফোনে কথা হয় টিকিট কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা আলমগীরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ঈদের পর থেকে সার্ভিস বন্ধ। চাইলেও তো আমি নিজে থেকে খুলতে পারি না। মাঝে মধ্যে যাত্রী বেশি পেলে বাবুবাজার থেকে ফোন আসে। আজ যেন এখানে অফিস খোলা হয়। আগাম মাইকিং করে যাত্রীদের হাঁকডাক দেয়া হয়।
 
আলমগীরের অভিযোগ, বাদামতলী থেকে গাবতলী আসতে একবারই খরচ হয় ২ হাজার টাকার তেল। তেল খরচের যাত্রীই মেলে না। তাই সব সময় চলে না বাস।
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৪ সালে প্রথম একটি ওয়াটার বাস নামানো হয়। এরপর ২০১০ সালের ২৮ আগস্ট দুটি নৌযান দিয়ে দ্বিতীয় ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু করা হয়। যাত্রীর অভাব, নৌযানে ত্রুটির কারণে এ সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়।

gabtoli
 
তৃতীয়বারের মতো ২০১৩ সালের ৪ জুলাই ঢাকার নৌপথে যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যে আবার ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি)। ওই সময় ঘটা করে সার্ভিসের উদ্বোধন করেন নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। ঢাকা থেকে গাবতলী নৌপথে নতুন চারটি ও আগের দুটি মিলিয়ে মোট ছয়টি ওয়াটার বাস নামানো হয়। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এক ঘণ্টা পর পর ছাড়ার সিডিউলে গাবতলী থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ৩০ টাকা। তবে সেবারও কিছু দিন যাওয়ার পর ঢিলে হয়ে যায় সার্ভিস।
 
মনিরুল ইসলাম নামের এক যাত্রী বলেন, এখানে যাত্রী ঠিকই হয়। কিন্তু সার্ভিস না পেয়ে ফিরে যায়। পাঁচ মিনিট পরপর আসা যাওয়া করতো। কোনো বাস খালি যেত না। যদিও এখন চিত্র ভিন্ন। ওয়াটার বাস চালু থাকলে যাত্রী হবে না এটা ভুল কথা।
 
বাদামতলী ঘাটের মেসার্স ইমরান ট্রেডার্সের কর্ণধার মো. আলী আশরাফ জানান, তার নিজস্ব নয়টি ওয়াটার বাস চলে গাবতলী-বাদামতলী রুটে। কিন্তু গাবতলীতে যাত্রীর সংকট প্রকট হওয়ায় নিয়মিত চলে না ওয়াটার বাস।

জেইউ/এমএমজেড/জেআইএম