মাত্রাতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও পলিসি তামাদি

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৩৪ এএম, ১৩ জানুয়ারি ২০১৭

রাজস্ব ফাঁকি, কমিশনে অনিয়ম, হিসাবে গরমিল, সম্মেলনের নামে আর্থিক অনিয়ম, পরিচালকদের অনৈতিক সুবিধা, এজেন্ট ও এমপ্লয়ার অব এজেন্ট প্রশিক্ষণ ব্যয়ে অনিয়মসহ নানাবিধ অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে জীবন বীমা কোম্পানি প্রগতি লাইফের বিরুদ্ধে। এসব অনিয়মের কারণে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গ্রাহকরা। এতে একদিকে হচ্ছে আইন লঙ্ঘন, অন্যদিকে মানি লন্ডারিংয়ের আশঙ্কা। প্রতিষ্ঠানটির এসব অনিয়মের তথ্য নিয়ে জাগো নিউজের সাত পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে পঞ্চম পর্ব

ব্যবস্থাপনা খাতে মাত্রাতিরিক্ত অর্থ খরচ করেছে প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স। এতে কোম্পানিটির ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রাহকরা। কারণ ব্যবস্থাপনা খাতে অতিরিক্ত যে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে তার ৯০ শতাংশই পাওয়ার কথা ছিল বীমা গ্রাহকদের।

মাত্রাতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের পাশাপাশি প্রতি বছর কোম্পানিটিতে অস্বাভাবিক হারে বীমা পলিসি তামাদি (বন্ধ) হয়ে যাচ্ছে। বীমা গ্রাহকদের সঠিক সেবা না দেয়ার কারণে পলিসি অস্বাভাবিক হারে তামাদি হচ্ছে বলে মনে করছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।

প্রগতি লাইফে বিশেষ নিরীক্ষা চালিয়ে আইডিআরএ প্রমাণ পেয়েছে, ব্যবস্থাপনা ব্যয় খাতে প্রগতি লাইফ আইন লঙ্ঘন করে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ে বছরে ১৩৭ কোটি ৩৯ লাখ ৯০ হাজার ৫৬১ টাকা অবৈধভাবে ব্যয় করেছে।

এর মধ্যে ২০০৯ সালে ১২ কোটি ৩৮ লাখ ২৯ হাজার ৬৯৫ টাকা, ২০১০ সালে ২৭ কোটি ৫৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬৫৯ টাকা, ২০১১ সালে ২৮ কোটি ৯৪ লাখ ৬০ হাজার ৬১৭ টাকা, ২০১২ সালে ২৮ কোটি ১৪ লাখ ৪০ হাজার ১৯৪ টাকা, ২০১৩ সালে ২৩ কোটি ৬৭ লাখ ২৯ হাজার ৬৪ টাকা এবং ২০১৪ সালে ১৬ কোটি ৭১ লাখ ৯৪ হাজার ৩৩২ টাকা আইনি সীমার অতিরিক্ত খরচ করা হয়।

Inner

আইডিআরএ জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির প্রতিটি সার্ভিস সেন্টার এবং সার্ভিস সেলের প্রথম বর্ষ এবং নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহের জন্য ব্যবস্থাপনা খাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

প্রধান কার্যালয়ের ব্যয় ছাড়াই ২০১২ সালে প্রতিটি সার্ভিস সেন্টার বা সার্ভিস সেল থেকে প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম আয়ের জন্য ১০০ থেকে ১৮৪.৬৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করা হয়েছে। অর্থাৎ ১০০ টাকা প্রিমিয়াম আয় করলে ব্যয় করা হয়েছে ১০০ থেকে ১৮৪ টাকা পর্যন্ত।

একইভাবে ২০১৩ সালে প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম আয়ের ওপর ১০০ থেকে ১৩১.০৮ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করা হয়। ২০১৪ সালে ব্যয় করা হয় ১০২ থেকে ১৬৪.৭০ শতাংশ পর্যন্ত।

Incert

প্রথম বর্ষ প্রিমিয়ামের মতো নবায়ন প্রিমিয়াম আয় থেকেও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেছে প্রগতি লাইফ। ২০১২ সালে নবায়ন প্রিমিয়াম আয়ের ৩৩.৭৩ থেকে ৬৩.৫৯ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করা হয়েছে। ২০১৩ সালে ২৬.২২ থেকে ৬০.১৮ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ১৯.০৮ থেকে ৭৪.৮৫ শতাংশ ব্যয় করা হয়।

বীমা আইন অনুযায়ী, প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম আয়ের সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ এবং নবায়ন প্রিমিয়াম আয়ের সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় হিসেবে খরচ করা যায়।

আইডিআরএ বলছে, ব্যবস্থাপনা খাতে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করার মাধ্যমে প্রগতি লাইফ বীমা আইন ২০১০ এর ৬২ ধারা এবং ১৯৫৮ সালের বীমা বিধিমালার ৩৯ বিধি লঙ্ঘন করেছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০১২ সালে প্রগতি লাইফ গ্রুপ বীমা বাদ দিয়ে প্রিমিয়াম আয় করেছে ৩৮ কোটি ২ লাখ ৪১ হাজার ২৬৭ টাকা। আর ব্যয় করা হয় ৩৯ কোটি ৬৮ লাখ ৪৭ হাজার ৯৮৩ টাকা। অর্থাৎ যে পরিমাণ প্রিমিয়াম আয়, ব্যয় করা হয় তার বেশি।

একইভাবে ২০১৩ সালে ১৩ কোটি ৬ লাখ ৭ হাজার ৫৮১ টাকা প্রিমিয়াম আয় হয় এবং ব্যয় হয় ১৩ কোটি ৪৫ লাখ ৯০ হাজার ৪০১ টাকা। পরের বছর ২০১৪ সালে ৩২ কোটি ২৩ লাখ ৬৩ হাজার ৯৪৪ টাকা আয়ের বিপরীতে ব্যয় করা হয় ৩১ কোটি ৯০ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ টাকা।

Incert

তামাদি পলিসির বিষয়ে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে নবায়নযোগ্য পলিসি ছিল ২ লাখ ৪০ হাজার ৬৩৭টি। কিন্তু বছরটিতে এ পলিসি থেকে মাত্র ৬১ হাজার ৮৬৬টি নবায়ন করা হয়। অর্থাৎ বছরটিতে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৭৭১টি বা ৭৪ দশমিক ২৯ শতাংশ বীমা পলিসিই তামাদি হয়ে গেছে।

একইভাবে ২০১৩ সালে নবায়নযোগ্য পলিসি ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার ৮২টি। এর মধ্যে নবায়ন করা হয় ৭৪ হাজার ৩৬০টি এবং তামাদি হয় ১ লাখ ৫৫ হাজার ৭২২টি। পরের বছর ২০১৪ সালে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৫১৫টি নবায়নযোগ্য পলিসির মধ্যে নবায়ন করা হয় ৮০ হাজার ৮৫১টি আর তামাদি হয়ে যায় ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬৬৪টি।

আইডিআরএ বলছে, পলিসি তামাদির এ হার অস্বাভাবিক। এতে বোঝা যায় বীমা আইন ২০১০ এর ৮৫ ধারা সঠিকভাবে পরিপালন করা হয়নি। তাছাড়া গুণগতমানের ব্যবসা সংগ্রহ না করা এবং গ্রাহকদের সঠিক সেবা না দেয়ায় পলিসি অস্বাভাবিক হারে তামাদি হয়।

যোগাযোগ করা হলে প্রগতি লাইফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জালালুল আজিম জাগো নিউজকে বলেন, ব্যবস্থাপনা ব্যয় নির্ধারণ করা হচ্ছে ১৯৫৮ সালের আইন দিয়ে। এ আইন দিয়ে নির্ধারণ করা সীমার মধ্যে থাকা কোনো কোম্পানির পক্ষে সম্ভব নয়। মূলত আইনের সমস্যার কারণে ব্যবস্থাপনা ব্যয় আইনি সীমার অতিরিক্ত হয়েছে।

অস্বাভাবিক পলিসি তামাদি হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, পলিসি তামাদি হওয়ার জন্য কোম্পানি দায়ী নয়। বীমা পলিসি করার পর গ্রাহক যদি টাকা না দেয় আমরা জোর করে আদায় করতে পারবো না। তবে আমরা চেষ্টা করছি পলিসি তামাদির হার কমিয়ে আনার। ইতোমধ্যে কিছুটা কমেও এসেছে। ২০১২ সালে যেখানে ৭৪ শতাংশ পলিসি তামাদি হয়, ২০১৪ সালে তা কমে ৬৫ শতাংশ হয়েছে।

এমএএস/এনএফ/এআরএস/এমএস