যে জাদুঘর রণাঙ্গনে ফেরায়


প্রকাশিত: ১০:০০ পিএম, ১৬ এপ্রিল ২০১৭
যে জাদুঘর রণাঙ্গনে ফেরায়

সিঁড়ি মাড়িয়ে সদর দরজার সামনে যেতেই বিশাল আকৃতির জলাধার (কূপ)। একেবারে প্রবেশ দ্বারের সামনের এ কূপ থেকে চুয়ে চুয়ে পানি ঝরছে। কূপের মাঝখানে শিখা অম্লান।

পানি গড়ানোর শব্দের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে শিখা অম্লানের পতপত ধ্বনিও। যেন চেতনার অগ্নিস্নান মিলছে আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে।

নিচ তলার বিশাল বারান্দার উত্তরপাশে একটি আস্ত হেলিকপ্টার ঝুলানো। দক্ষিণপাশে যুদ্ধবিমান। যেন রণাঙ্গনের জন্য তাক করে রাখা। এগুলো মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল। সিঁড়ির গোড়ায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার বিশাল আকৃতির ম্যুরাল। সামনে সবুজের প্রান্তর।

museam

মুক্তিযুদ্ধের বিষয়বস্তু নিয়ে নির্মিত এ জাদুঘরের নয় তলা ভবনে চারটি গ্যালারি রয়েছে। বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিকথার সকল নিদর্শন মিলছে গ্যালারিগুলোতে।

রোববার দুপুরে নবনির্মিত জাদুঘর উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের পর সকলের জন্য তা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। তবে এদিন বিনামূল্যে প্রবেশ করতে পারেন দর্শনার্থীরা।

দুই বিঘা জমির উপর নির্মিত ভবনটির আয়তন এক লাখ ৮৫ হাজার বর্গফুট। গরমের সময় সকাল ১০টা থেকে ৬টা পর্যন্ত এবং শীতের সময় সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এটি খোলা থাকবে।

পাঁচ হাজার বর্গফুটের একেকটি গ্যালারি যেন মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। প্রতিটি গ্যালারিতে একাত্তরের নানা দলিল, চিঠি, বার্তাসহ অসংখ্য আলোকচিত্র প্রদর্শন করা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং তা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ সেগুনবাগিচায় প্রতিষ্ঠা করা হয় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। জায়গা সঙ্কুলান না হওয়ায় অনেক আগেই জাদুঘরটি স্থানান্তরের প্রয়োজন দেখা দেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আগারগাঁওয়ে নির্মাণ করা হয় আধুনিক মানের এ জাদুঘর।

museam

ভবনের নকশার পরতে পরতে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামী ইতিহাসের নানা কথা। ঠিক ভেতরেও তাই। বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, যুদ্ধের দিনগুলো, পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ, বিজয় মুহূর্তের দিনগুলোর সকল নিদর্শন মিলছে এখানে।

প্রথম গ্যালারিতে রয়েছে এ অঞ্চলের প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সময়ের নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন। এ গ্যালারির নামকরণ হয়েছে ‘আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংগ্রাম’ নামে। এখানে পাল-সেন-ইংরেজ আমল থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি সংস্কৃতির নানা নিদর্শন ঠাঁই পেয়েছে।

‘আমাদের যুদ্ধ, আমাদের ত্যাগ’ নামে নামকরণ করা হয়েছে দ্বিতীয় গ্যালারির। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু করে মার্চের ঘটনাবলি, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ থেকে শুরু করে ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় প্রবাসী সরকার গঠনের নানা নিদর্শন এখানে জায়গা পেয়েছে। রয়েছে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা এবং ভারতের শরণার্থী শিবিরের নানা চিত্র।

‘আমাদের যুদ্ধ, আমাদের মিত্র’ শিরোনামের তৃতীয় গ্যালারিতে মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধাদের নানা ঘটনা, রাজাকারদের তৎপরতা, মুক্তিযুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহলের ভূমিকা উঠে এসেছে।

museam

চতুর্থ গ্যালারির শিরোনাম ‘আমাদের জয়, আমাদের মূল্যবোধ’। এখানে সম্মুখযুদ্ধ, যৌথ বাহিনীর অভিযান, বিভিন্ন এলাকায় বিজয়, বুদ্ধিজীবী হত্যা এবং ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের নিদর্শনসহ নানা চিত্র ও দলিল সংরক্ষণ করা হয়েছে।

প্রতিটি গ্যালারি যেন মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে। বলে চেতনার কথা। ধারাবাহিক ও নিপুন কারুকার্যে সাজানো গ্যালারিগুলো ঘুরে দেখলেই এ প্রজন্মের সকলকে নিয়ে যাবে ’৭১-এর রণাঙ্গনে। নিদর্শনগুলোয় নজর পড়লেই আবেগের ঘনঘটায় চোখ ছলছল করে উঠবে যে কারোরই।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ব্যবস্থাপক সত্যজিৎ রায় মজুমদার। তিনি বলেন, এখানে সাড়ে ১৭ হাজার নিদর্শন সংরক্ষণ করা হয়েছে। যার প্রতিটিই আবগেপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত জিনিসপত্র, একাত্তরের নানান দলিল, চিঠি, বার্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলো নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশ জন্মের ইতিহাস জানতে সহায়তা করবে।

এএসএস/এমএআর/আরআইপি