Jago News logo
Banglalink
ঢাকা, শনিবার, ২৭ মে ২০১৭ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

ধর্ষণের ঘটনায় ‘প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা’ : আটক হচ্ছেন পিয়াসা-মাহির?


আদনান রহমান, নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৯:১৮ পিএম, ১৪ মে ২০১৭, রোববার | আপডেট: ০৯:৩১ এএম, ১৫ মে ২০১৭, সোমবার
ধর্ষণের ঘটনায় ‘প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা’ : আটক হচ্ছেন পিয়াসা-মাহির?

রাজধানীর বনানীর দ্য রেইন ট্রি হোটেলে দুই তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হচ্ছেন ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা এবং সাফাতের বন্ধু ও ওই হোটেলের মালিক সংসদ সদস্য বিএইচ হারুনের ছেলে মাহির হারুন।

ধর্ষণের ঘটনায় ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ ভূমিকার কারণে দু-একদিনের মধ্যে তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন তদন্ত কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

তদন্ত কর্মকর্তারা বলেন, মামলার এজাহারে ধর্ষিতা তরুণীর ‘খালাতো বোন’ দাবি করা হয় ফারিয়া মাহবুব পিয়াসাকে। ধর্ষণের ঘটনার ৪০ দিন পর ৬ মে সন্ধ্যায় ভিকটিম দুই তরুণীসহ পিয়াসা বনানী থানায় উপস্থিত হয়ে অভিযোগ দাখিল করেন। পরবর্তীতে মামলায় অভিযুক্তদের বিভিন্ন বর্ণনায় পিয়াসার নাম উঠে আসে। এ কারণে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

piyasaঅন্যদিকে অবৈধ পন্থায় রুম বুকিং দিয়ে ধর্ষণের ‘প্ল্যাটফর্ম’ তৈরি করে দেয়ায় সাফাতের বন্ধু ও হোটেলের মালিক সংসদ সদস্য বিএইচ হারুনের ছেলে মাহির হারুনকেও আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, স্বচ্ছভাবে মামলার তদন্ত করতে তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তারা পুলিশের নজরদারিতে রয়েছেন।

মামলার অন্যতম আসামি আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদের স্ত্রী দাবি করা ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা জাগো নিউজে দেয়া সাক্ষাৎকারে ভিকটিম দুই তরুণীর সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। ওই মেয়েদের সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় নেই। একবার এক রেস্টুরেন্টে আমি আর সাফাত একসঙ্গে ছিলাম। তখন সাফাতের বন্ধু এ মামলার আরেক আসামি সাদমান ওই দুই মেয়েকে নিয়ে আসে। সে তার দুই বান্ধবীকে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এরপর আর কখনও ওই দুই মেয়েকে আমি দেখিনি।’

পিয়াসার দাবি, ‘ধর্ষণের এক সপ্তাহ পর দুই মেয়ে আমাকে কল দিয়ে কান্নাকাটি করতে থাকে। তারা জানায়, আমার স্বামী সাফাত বন্ধুদের নিয়ে তাদের ধর্ষণ করেছে। এর আগে আমার নামে বাজে বাজে সব কথা বলে ওদের মন গলানোর চেষ্টা করে সাফাত। কাঁদতে কাঁদতে দাম্পত্য জীবনে সে (সাফাত) আমার জন্য সুখী নয় বলে গল্প শোনাতে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা তো ভিন্ন। আমিই ওকে নিয়ে সুখী হতে পারছিলাম না। ওকে শোধরানোর চেষ্টা করেছি, পারিনি। কিন্তু পাপ তাকে গ্রাস করে নিল।’

পিয়াসা বলেন, ‘এ মামলায় আমার কোনো রকম সংশ্লিষ্টতা নেই। আমি বরং দুটি মেয়েকে ধন্যবাদ দেব, তারা সাহস দেখিয়েছে ভদ্রবেশী শয়তানদের মুখোশ খুলে দিতে। ছেলের বিরুদ্ধে যখন ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে, বনানী থানার ওসিকে দিয়ে ওর বাবা কৌশলে আমার নামটা বসিয়ে দিয়েছেন। যখন আমার পাওনা (বিচ্ছেদ সংক্রান্ত) নিয়ে কথা বলার কথা, তখন আমার অন্যের অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলতে হচ্ছে। আমার পরিবার ও আমি খুবই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে আছি। আমিও গণমাধ্যমের মেয়ে। এখানে আমার পরিচিত অনেক মানুষ আছেন, স্বজনও আছেন। সবার কাছে আমাকে ছোট করা হচ্ছে।’

প্রসঙ্গত, সাফাতের বাবা এর আগে জাগো নিউজের কাছে দাবি করেন, ধর্ষণ মামলার সঙ্গে সাফাতের ডিভোর্সপ্রাপ্ত স্ত্রী জড়িত। তার ষড়যন্ত্রের কারণে ওই দুই তরুণী তার ছেলের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনেছে। তিনি আরও জানান, পূর্বশত্রুতার জের ধরে তার ছেলের সঙ্গে এমন কাজ করেছে ছেলের সাবেক স্ত্রী।

দিলদার আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার ছেলের (সাফাত) সঙ্গে বেসরকারি একটি টেলিভিশনের সংবাদ উপস্থাপিকার বিয়ে হয়। তবে আমি সেই বিয়ে মেনে নেইনি। বিয়ের পর সেই মেয়ের নানা ধরনের অসৎ উদ্দেশ্য দেখে আমার ছেলে তাকে তালাক দেয়।’

body-show

তবে তালাকের বিষয়টি সত্য নয় দাবি করে পিয়াসা জাগো নিউজকে বলেন, ‘কোনো এক অজানা কারণে সাফাতের বাবা আমাকে তার ছেলের বউ হিসেবে মেনে নিতে পারেননি। উনি আমার ওপর মানসিক অত্যাচার করেছেন। ওনার এ যন্ত্রণায় একসময় আমি সাফাতকে নিয়ে ভাটারা থানায় নিরাপত্তার জন্য জিডি করতে বাধ্য হই। এর মধ্যেই হঠাৎ ৮ মার্চ একটি ডিভোর্স নোটিশ আসে আমার কাছে। কোনো কিছু না বলে-কয়ে সাফাত আমাকে ডিভোর্স দিয়ে পুরো পরিবারসহ ভারতের কলকাতায় পালিয়ে যায়। ডিভোর্স লেটারে আমি আমার জাল স্বাক্ষর দেখতে পাই। কোনো দেনা-পাওনার নিষ্পত্তি ছিল না। আমাকে কোনো ভরণ-পোষণ না দিয়েই সে গাঢাকা দেয়।’

‘এটাকে কোনোভাবেই ডিভোর্স বলা যায় না’- যোগ করেন তিনি।

‘আমি অনুধাবন করেছি, টাকা দিয়ে সব নিয়ম ওরা ভাঙতে পারে। ডিভোর্স পেয়ে আমি কষ্ট পেয়েছিলাম। অনেক কিছুর পরও আমি সাফাতকে ভালোবাসতাম। এভাবে বিনা কারণে, বিনা নোটিশে ডিভোর্স লেটার পাব ভাবতেই পারিনি। আমি তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পারিনি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি তারা সবাই কলকাতায়। এর কিছুদিন পরই একটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয় সাফাতের। সেখানে দেখা যায় এক মডেল ও অভিনেত্রীকে নিয়ে একটি রেস্টুরেন্টে বসে মদ খাচ্ছে সাফাত। তখন ডিভোর্স পাওয়া নিয়ে আমার কষ্ট হলেও এ মুহূর্তে আমি নিজেই একজন ধর্ষকের স্ত্রী হিসেবে ভাবতে পারছি না। ধর্ষক স্বামীর কাছ থেকে আমিই ডিভোর্স চাইব। সেটা নিয়মরীতি মেনেই’- জাগো নিউজকে বলেন পিয়াসা।

মামলার তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মামলার শুরু থেকে ধর্ষণ ঘটনার পেছনে পিয়াসাকে ‘নাটের গুরু’ হিসেবে উল্লেখ করছেন প্রধান আসামি সাফাতের বাবা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ। একই দাবি অপর আসামিদের পরিবারেরও। যেদিন ধর্ষণ মামলাটি দায়ের করা হয়, সেদিন পিয়াসা থানায় উপস্থিত ছিলেন। সেদিন নিজেকে ‘খালাতো বোন’ দাবি করলেও দুই তরুণীর সঙ্গে পিয়াসার পারিবারিক কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। ভিকটিম দুই তরুণীকে জিজ্ঞাসাবাদে কয়েকবার বিষয়টি উঠে এসেছে। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে দুই তরুণী পিয়াসাকে ‘পূর্ব পরিচিত’ হিসেবে দাবি করেছেন।

মাহির হারুনের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, মাহির সাফাতের বন্ধু। সেদিন রেইন ট্রি হোটেলে জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া তিনি সাফাতকে দুটি কক্ষ ভাড়া করে দেন। ধর্ষণের জন্যই কক্ষ দুটি ভাড়া করা হয়েছিল কিনা- তা নিশ্চিত হতে মাহিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

ধর্ষণের ঘটনায় মাহিরের পরোক্ষ কোনো মদদ থাকলে তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে নেয়া হতে পারে বলেও জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।

তদন্ত সংস্থা পুলিশের ওমেন্স সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) আসমা সিদ্দিকা মিলি জাগো নিউজকে বলেন, ‘তদন্ত করতে গিয়ে যাদের নাম সামনে আসবে প্রয়োজনে সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’

এদিকে রোববার দ্বিতীয় দিনের মতো রিমান্ডে সাফাত আহমেদ ও সাদমান সাকিফকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রিমান্ডে তারা পুলিশকে ধর্ষণ মামলার বিষয়ে নানা তথ্য দিয়েছেন। রিমান্ডে তারা ২৮ মার্চ রাতে দুই তরুণী ও তাদের বন্ধু শাহরিয়ারকে মারধর করার কথা স্বীকার করেছেন।

তদন্ত সূত্র জানায়, তদন্ত কর্মকর্তারা সেদিন রাতের ঘটনায় উপস্থিত দুই তরুণীর বন্ধু শাহরিয়ারের সঙ্গে কথা বলেছেন। পুলিশের কাছে শাহরিয়ার দাবি করেছেন, দুই তরুণীর আমন্ত্রণে শাহরিয়ার ও তার এক বান্ধবীকে নিয়ে রেইন ট্রি হোটেলে দাওয়াতে যান। মাতাল অবস্থায় সাফাত একপর্যায়ে তাকে মারধর করে এবং তার বান্ধবীর গায়েও হাত দিতে চায়। পরে শাহরিয়ার ও ধর্ষিতা এক তরুণীর আকুতিতে তারা তাকে ছেড়ে দেয়। তবে এর আগে তারা শাহরিয়ারকে মারধর করে।

গত ২৮ মার্চ রাজধানীর বনানীর ‘দ্য রেইন ট্রি’ হোটেলে সাফাত আহমেদ নামে এক বন্ধুর জন্মদিনে যোগ দিতে গিয়ে অপরাপর বন্ধুদের সহায়তায় ধর্ষণের শিকার হন ওই দুই তরুণী। তাদের অভিযোগ, সাফাত আহমেদ ও তার বন্ধুদের যোগসাজশে অস্ত্রের মুখে তাদের ধর্ষণ করা হয়।

ওই ঘটনার ৪০ দিন পর ৬ মে সন্ধ্যায় বনানী থানায় পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন দুই তরুণী। এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামি হলেন- সাফাত আহমেদ, সাদমান সাকিফ, নাঈম আশরাফ, সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ও তার দেহরক্ষী আবুল কালাম আজাদ।

আসামিদের মধ্যে সাফাত ও সাদমান সিলেট থেকে গত বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেফতার হন। এখনও পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন এজাহারের দুই নম্বর আসামি নাঈমসহ অপর দুজন।

গত শুক্রবার সাফাত ও সাদমান সাকিফের বিরুদ্ধে যথাক্রমে ৬ ও ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

মামলায় পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের বিষয়ে এডিসি মিলি বলেন, ‘নাঈম সম্পর্কে এখনও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পলাতক সব আসামিকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে।’

এআর/এমএআর/জেআইএম

আরও পড়ুন...

আপনার মন্তব্য লিখুন...