প্রেস দিয়ে শুরু, এখন শিল্পপতি

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৫৯ পিএম, ২৯ আগস্ট ২০১৭
প্রেস দিয়ে শুরু, এখন শিল্পপতি

দু’টি বীমা কোম্পানির স্বত্বাধিকারী। দেশের বীমা শিল্পের প্রতিষ্ঠিত সফল ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে তার নাম। দ্বীপ জেলা ভোলার মানুষের কাছে পরিচিত ‘আশীর্বাদ’ হিসেবে। মসজিদ, মাদরাসা’র পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন বৃদ্ধনিবাস, হাসপা্তাল। নানা ঝড়-ঝঞ্ঝা মোকাবেলা করে নিজ প্রচেষ্টায় এমন অবস্থায় আসা এই শিল্পপতি ও সমাজসেবীর নাম নিজাম উদ্দিন আহমেদ

সম্প্রতি মেঘনা লাইফ’র কার্যালয়ে জাগো নিউজের মুখোমুখি হন নিজাম উদ্দিন। তুলে ধরেন নিজের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা। বর্ণনা করেন ছোট ব্যবসা থেকে শিল্পপতি হওয়ার বন্ধুর পথ। জানান বৃদ্ধনিবাস, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, মসজিদ ও মাদরাসা গড়ে তোলার পেছনের গল্প।

প্রথম কর্মজীবনের স্মৃতিচারণ করে নিজাম উদ্দিন বলেন, ব্যক্তিগত জীবনে আমার সাংবাদিক হওয়ার খুবই ইচ্ছা ছিল। যে কারণে আমি জার্নালিজমে পড়ালেখা করি। বরিশাল বিএম কলেজে পড়া অবস্থায় দৈনিক ইত্তেফাকে স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেই। বিএম কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করার পর ১৯৬৮ সালের দিকে ঢাকায় এসে ইত্তেফাকের ডেস্কে বসা শুরু করি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্নালিজমে ভর্তি হই।

এরপর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। সেই সময় আমি ইকবাল হলে (বর্তমানে জহুরুল হক হল) থাকতাম। তবে ২৫ মার্চ কালরাতে ঘুমায় এসএম হলে। রাত ১টার দিকে ইত্তেফাক থেকে ডিউটি শেষে হলে যাই। ইকবাল হলে থাকলে হয়তো ওইদিনই মারা পড়তাম। ভোরে এসএম হলের একটি গেট দিয়ে বের হয়ে আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে চলে যাই।

পাকিস্তানি আর্মিরা ভোর ৫টা-সাড়ে ৫টার দিকে আমার ওই আত্মীয়ের বাসায় এসে আমার সামনেই তাকে হত্যা করে। তার তিন মাসের মেয়ে আমার কোলে ছিল, সেই জন্যই হয়তো আমাকে ছেড়ে দেয়া হয়। এরপর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে যাই। মুক্তিযুদ্ধ শেষে আবার ইত্তেফাকে যোগ দেই। একপর্যায়ে নিজেই একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করি।

‘ব্যবসায়ী নিজাম উদ্দিন’ সম্পর্কে তিনি বলেন, ব্যবসায়ী হিসাবে জীবন শুরু করি ১৯৭৫ সালের পরে একটি প্রেস দেয়ার মাধ্যমে। ৭০ নম্বর গোপীবাগে ‘দিপালী প্রেস’ নামে একটি প্রেস চালু করি। আমার বড় ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়ে একটি মেশিন কিনি। কাগজ বাকি নিয়ে ব্যবসা চালাতে শুরু করি। আস্তে আস্তে প্রেসটা বড় হয়।

নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অনেকগুলো ভালো ভালো কাজ পেয়ে যাই। আর্মির দুই বড় কর্মকর্তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তারা হয়তো কোনো বিশেষ কারণে আমাকে পছন্দ করে ফেলেন। তারা বলেন, তুমি শিক্ষিত লোক, তুমি আর্মির কাজগুলো করো। তাদের সার্বিক সহযোগিতায় প্রচুর কাজ পাই। আস্তে আস্তে প্রেসটাও উন্নতি করি। ওই প্রেসই আমার ব্যবসার মূল ভিত গড়ে দেয়।

তিনি বলেন, প্রেস ব্যবসার পর কর্ণফুলি ইন্স্যুরেন্স প্রতিষ্ঠা করি। আমার স্ত্রীর নামে ৬০ লাখ টাকা দিয়ে কর্ণফুলি ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার কিনি। এরপর মেঘনা লাইফ প্রতিষ্ঠা করি। নিজের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। এখন দুটি বীমা কোম্পানির চেয়ারম্যান। আমি একজন শিক্ষকের ছেলে। আমার বাবা ১৫ টাকার বেশি বেতন পেতেন না। আমার বয়স যখন তিন মাস, তখন আমার বাবা মারা যান। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থা মা মারা যান।

আমার বড় ভাই শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও পরে ব্যবসা শুরু করেন। তিনিই আমাকে পড়ার খরচ দিতেন। তিনি ধনী পরিবারে বিয়ে করায় আমাকে সেই সময় আর্থিক অনটনের মধ্যে পড়তে হয়নি। ভাই আমাকে টাকা দিতেন এবং আমি নিজে ইত্তেফাকে চাকরি করার কারণে কিছু টাকা পেতাম।

সমাজ সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার বিষয়ে নিজাম উদ্দিন বলেন, বর্তমানে আমি প্রতিষ্ঠিত একজন ব্যবসায়ী। তাই এ সমাজের প্রতি, দেশের প্রতি আমার একটা দায়িত্ব আছে। সেই জন্যই দ্বীপ জেলা ভোলায় ‘নিজাম-হাসিনা’ ফাউন্ডেশন গড়ে তুলি। সেখানে বড় অঙ্কের অর্থ দান করি। ওই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে হাসপাতাল, বৃদ্ধনিবাস, মসজিদ, মাদরাসা, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলি।

প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে মানুষ উপকৃত হচ্ছে। ফাউন্ডেশনের আওতায় গড়া হাসপাতালে কমপক্ষে ২৫ হাজার মানুষের চোখের অস্ত্রোপচার হয়েছে। দেড় লাখের বেশি মানুষ চোখের চিকিৎসা নিয়েছে। অনেক পরিবার আছে যারা নিজেদেরই খাবার জোগাড় করতে পারে না। সেখানে বয়োজ্যেষ্ঠদের অবস্থা খুবই করুন। তাদের কথা মাথায় রেখে গড়ে তুলি বৃদ্ধনিবাস। যদি কারও সমস্যা হয়, তিনি এই নিবসে এসে থাকতে পারেন। তাদের থাকা, খাওয়া, চিকিৎসা- সব ব্যবস্থাই সেখানে আছে।

আপাতত সেখানে ৫০ থেকে ৬০ জনের থাকার ব্যবস্থা আছে। দীর্ঘদিন থাকার পর অনেকে বাড়ি চলে যান, কিছুদিন পর আবারও ফিরে আসেন। রোজার সময় ২০০ থেকে ৩০০ জন বৃদ্ধনিবাসে অবস্থান করেন। আমি নিজের আয়ে আমার মাকে কোনো শাড়ি কিনে দিতে পারিনি। বাবাকেও কিছু দিতে পারিনি। রোজার সময়, ঈদের সময় এখন ১০ থেকে ১৫ হাজার শাড়ি দান করি।

আমি এখন প্রতিষ্ঠিত। গুলশান, বনানীর মতো জায়গায় থাকি। অথচ এক সময় আমি তিন মাইল হেঁটে স্কুলে গিয়েছি। আর এখন আমার ছেলে-মেয়েরা বিদেশ থেকে পড়ালেখা করে আসছে। পাজেরো গাড়িতে চলে ক্লাসে যায়।

ভোলার মানুষের কাছে ‘আশীর্বাদ’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ভোলার যারা বড়মাপের মানুষ, তারাও নিজ জেলার জন্য অনেক কিছু করেছেন। এখনও করছেন। তাদের মধ্যে আমাদের বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ রয়েছেন। নাজিউর রহমান ছিলেন, তিনিও ভোলার জন্য অনেক কিছু করেছেন।

ভোলার মানুষের জন্য আমি কিছু করতে পারছি, এ জন্য আমার কোনো গর্ব নেই। আমি তাদের জন্য কিছু করতে পারছি, এটাই আমার প্রাপ্তি। আমাকে কে, কী বলে সেটা কোনো বিষয় না, আমি সবকিছু করছি আল্লহ্’র খুশির জন্য। বাহবা পাওয়ার জন্য আমি কিছু করি না। আমার যদি টাকা না থাকত তাহলে তো কিছুই করতে পারতাম না। আজ আল্লাহ্ আমাকে সামর্থ দিয়েছেন, তাই কিছু করতে পারছি- বলেন নিজাম উদ্দিন।

এমএএস/এমএআর/জেআইএম