একশ কেজি তালার ভেতর পাঁচ হাজার চাবি

মুহাম্মদ ফজলুল হক
মুহাম্মদ ফজলুল হক , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৫১ পিএম, ৩১ আগস্ট ২০১৭ | আপডেট: ১১:১৬ পিএম, ৩১ আগস্ট ২০১৭
একশ কেজি তালার ভেতর পাঁচ হাজার চাবি

সুপ্রিম কোর্টের প্রায় পাঁচ হাজার চাবি সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে বিশাল বড় একটি তালার (আলমারির) ভেতরে। কোর্ট থেকে দাবি করা হচ্ছে সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় তালা এটি। একশ কেজি ওজনের এই তালার ভেতরে পাঁচ হাজার চাবি ২৪ ঘণ্টা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। বিশাল এই তালার আলমারির ভেতর থেকেই বিতরণ করা হয় সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ চাবিগুলো।

দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে শুরু করে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতির কক্ষ, বেঞ্চ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কোর্টের বিভিন্ন শাখা এবং সকল কর্মকর্তা কর্মচারীদের কক্ষের দরজার নির্ধারিত তালার চাবি এই তালার ভেতরে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী আবার তা বিতরণও করা হয়।

সুপ্রিম কোর্টের সব অফিসের জন্য সংরক্ষিত করে রাখা এই চাবিগুলো সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু করে রাত ১০টা পর্যন্ত আদান প্রদান চলে। প্রতি কক্ষের লোকজন আসার পর এই তালা থেকে চাবি নিয়ে দরজা খোলা হয়। অফিসের কাজকর্ম শেষে আবার বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে রাত ১০ পর্যন্ত চাবি জমা নেয়া হয়।

নিরাপত্তায় নিয়োজিত মো. খোকন কাজী জাগো নিউজকে জানান, এর আগে এই তালার ভেতরে চার হাজারের মতো চাবি রাখা হতো। এখন চাবির সংখ্যা বেড়ে পাঁচ হাজার হয়েছে। পাঁচ-ছয় মাস আগে চার হাজার চাবির হিসেব দিলেও এখন পাঁচ হাজার চাবি হলো কী করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন কোর্ট ছাড়া আরও বিল্ডিং তৈরি করার পর অনেকগুলো অফিস কক্ষ বাড়ানো হয়েছে।ওইসব কক্ষে নতুন করে তালা লাগানোর পর তা বেড়ে পাঁচ হাজার হয়ে গেছে।

tala

সুপ্রিম কোর্টের মাঝামাঝি বরাবর রাস্তা থেকে পূর্বদিকে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের মূলভবনে ঢোকার সময় নিচতলা (গ্রাউন্ড ফ্লোর) ঢুকতেই ডান দিকে এই তালা রাখা হয়েছে। সেখানে এই তালার পাহারায় একজন ব্যক্তি সারাক্ষণ নিয়োজিত থাকেন। পর্যায়ক্রমে একজনের পর অপরজন দায়িত্ব পালন করে থাকেন। চাবিসহ এই তালার পাহারায় দিন রাত ২৪ ঘন্টা সুপ্রিম কোর্টের সিকিউরিটি গার্ড ছাড়াও সর্বদা আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা এই গেটের সামনে বসে থাকেন।

দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে শুরু করে হাইকোর্ট বিভাগ এবং পুরাতন হাইকোর্ট ভবন, আইনজীবী সমিতি ভবন, অতিরিক্ত (এনেক্স) ভবনসহ প্রধান বিচারপতি, হাইকোর্ট শাখার বিচারপতি, রেজিস্ট্রার, নেজারত এবং বিভিন্ন শাখার সব চাবি এই একটি তালার ভেতর আবদ্ধ থাকে।

চাবিগুলো জমা দেয়া হয় সেখানে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত ব্যক্তিদের কাছে।এখানে শিফট অনুযায়ী তিনজন পর্যায়ক্রমে (ডিউটি) দায়িত্ব পালন করে থাকেন। খোঁজখবর নিয়ে তাদের কয়েকজনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন, রাসেল আহমেদ-২, আরশাদুল আলম বুলবুল, এবং দিলিপ কুমার দাস। এছাড়া ফরহাদ হোসেন নামের অপর এক নিরাপত্তাকর্মীও থাকেন মূল গেট দিয়ে মানুষজন ঢোকার স্থানে। আদালতের কার্যক্রম শুরুর আগে সকাল ৯টা থেকেই দুইজন পুলিশ ডিটেকটিভ মেটাল ও আর্চওয়ে দিয়ে চেক করে কর্মচারীদের ঢুকতে দেন। এরপরই চাবি নিয়ে তারা তাদের নিজ নিজ কক্ষে যান।

এসব নিরাপত্তা কর্মীদের তত্ত্বাবধান করেন মো. খোকন কাজী। এদের মধ্যে ঈদে অনেকেই নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে চলে যাবেন ঈদ করতে। তাদের মধ্যে ফরহাদ, রাসেল ২ ও আরশাদুল আলম ঈদের ছুটিতে গ্রামে চলে গেলেও দিলিপ কুমার দাসের সঙ্গে ঢাকায় রয়েছেন মো. খোকন কাজী।

tala1

দিলিপ কুমার জাগো নিউজকে জানান, ঈদ একটি বড় উৎসব। ঈদে তো আর কোথাও যাব না, কিন্ত আমার ইচ্ছা সঙ্গীরা যাতে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাদের পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে পারে। ঈদের দিন কেমন দায়িত্ব পালন করতে হয় জানতে চাইলে দিলিপ কুমার দাস জাগো নিউজকে বলেন, ওইদিনও স্যারেরা (বিচারপতিরা) কোর্টে ঈদের নামাজ পড়তে আসেন। তখন একটু আগে আসলেন, চাবি নিয়ে নিজের কক্ষে একটু বসে থেকে নামাজ পড়তে যান। আবার দেখা গেল নামাজ শেষ করার পর মন চাইলে কেউ একটু বসলেন। ঈদের জামাত শেষে মানুষের চাপ (ভিড়) কমলে পরে যান।তাই ঈদের দিনেও তালা চাবির কড়া পাহারা দিতে হয় বলে জানান দিলিপ কুমার দাস।

খোকন কাজী জাগো নিউজকে জানান, সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় তালা এটি। একশ’ কেজি ওজনের এই তালার ভেতরে সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার চাবি রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। এই তালার আলমারির ভেতরের চাবির নিরাপত্তার দায়িত্বে এবং যারা এর তদারকি করেন তাদের টেনশনে থাকেন কোন ভুল কিংবা চাবি হারিয়ে যায় কিনা তা নিয়ে।

ফরহাস হোসেন জানান, সুপ্রিম কোর্টের মূল ভবনের নিচতলা সংলগ্ন বিশাল আকৃতির ধাতব তালাটি যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখেন নিরাপত্তাকর্মীরা। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে চাবি বিতরণ শুরু হয়। বিতরণ নিয়ম মাফিক চলে সারাদিন। আবার অফিসের কাজ শেষে রাত ১০টা পর্যন্ত এসব চাবি জমা নেয়ার পর একসঙ্গে তালাবদ্ধ করে প্রায় ১০ ফুট উঁচু ও পাঁচ ফুট চওড়া এই একশ কেজি ওজনের তালার ভেতরে রাখা হয়।

tala2

রাসেল জানান, দেখতে তালা হলেও এটি আসলে একটি বড় আলমারি। এর ভেতরে সুপ্রিম কোর্টের মূল পুরাতন এবং এনেক্স ভবনের কোর্ট ও অফিস কক্ষের হাজার হাজার চাবি সংরক্ষিত থাকে। তিনি বলেন, এখানে যারা দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন তাদের কাছ থেকে সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যেই চাবি বুঝে নেয়া শুরু হয়। আবার বিকেল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চাবি জমা দিয়ে যান সংশ্লিষ্টরা।

আমরা এই বিশাল তালার মধ্যে সারিবদ্ধভাবে চাবিগুলো সাজিয়ে রাখি। সার্বক্ষণিক তদারকিতে থাকা খোকন কাজী জাগো নিউজকে বলেন, সব সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করি যাতে নির্দিষ্ট কোর্ট কক্ষের চাবি ঠিকভাবে দেয়া যায়। সারাদিন এই বিশাল তালার পাশে বসে চাবির পাহারায় নিয়োজিত থাকার অনুভূতি জানতে চাইলে দিলিপ কুমার দাস ও মো. রাসেল জাগো নিউজকে বলেন, খারাপ লাগে না। সময় কেটে যায় গল্প করে এবং চাবি জমা নিতেই।

তবে তাদের দাবি, এতগুলো চাবি নিয়ে মাথায় একটা দায়িত্ব ভারী করেই রাখে। কারণ এখানকার প্রতিটি চাবিই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই চাবিগুলোর পাহারার বিষয়ে খুবই সতর্কতার মধ্যে থাকতে হয়।

এফএইচ/ওআর/জেআইএম