সন্ন্যাস-সাধকের মহামিলন

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:৩৯ পিএম, ১৭ অক্টোবর ২০১৭ | আপডেট: ১১:০৮ এএম, ১৮ অক্টোবর ২০১৭
সন্ন্যাস-সাধকের মহামিলন

শহরের ব্যস্ততম রাস্তা এনএস রোড। মধ্যরাতেও মহাব্যস্ত। ভ্যান, রিকশা, নছিমন, করিমন আর অটোরিকশায় পুরো রাস্তা ঠাসা। পায়ে হাঁটার মানুষেরও কমতি নেই। এনএস রোড হয়ে বড় বাজার পেরুলেই মোহিনী মিলের সরু রাস্তা। আখড়াবাড়ির রাস্তাও এটি। মোহিনী মিলের কাছে আসতেই বাতাসে বাঁশের বাঁশির সুর লহরি শোনা গেল। সঙ্গে ঢাকের শব্দও।

সুর-শব্দ দুইয়ে মিলে ভাবতরঙ্গে প্রাণ দিল। বাঁশির সুর যেন বলতে চাইছে ‘লালন বলে, লালন বলে’। অমন সুরে সুর মিলাচ্ছে হেঁটে চলা ভক্তরাও। ওরা যেন সবাই দোহারি, যেন সবাই সাধক বনে যেতে চাইছে। লক্ষ্য আখড়াবাড়ি।

লালনের তিরোধান উপলক্ষে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় লালন মেলার। এরই ধারাবাহিকতায় চলছে লালন মেলা। মেলার প্রথম দিন থেকেই সাধক-বাউলের পদচারণে ভরে ওঠেছে কালীগঙ্গার তীর। কোনো বাধাই পথ রুদ্ধ করতে পারেনি সাধক, আশেকানদের। সকল জরা-জঞ্জাল পায়ে মাড়িয়ে হাজার হাজার সন্ন্যাস-সাধক মিলে এক মহামিলনে রূপ দিয়েছে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ি। পুরো আখড়াবাড়িই হয়ে উঠেছে সাধকের তীর্থস্থান।

lalon

সাধক মুরাদ ব্যাপারী বলছিলেন, প্রায় পয়ত্রিশ বছর থেকে সাঁইজির ধামে আসি। সাঁইজির ধামে সদাই কিনে মন ভরে না। যতই আসি, তৃষ্ণা ততই বাড়ে। এ তৃষ্ণা মিটাবার নয়। সাঁইজির কালামে (বাণী) মুক্তি মেলে। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে আত্মাকে শিশু রূপ দিতে সাঁইজিই পথ দেখিয়েছেন। মুক্তির তাড়না অনুভব করে তার দেখানো পথেই হাঁটতে চেষ্টা করছি।

লালনভক্তরাও ‘মনের মানুষ’ খুঁজে ফিরতে দিশেহারা। পরনে সফেদ লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, ফতুয়া আর মাথায় গেরুয়াই সংসার ত্যাগী মানুষগুলোর মনের খবরও বলে দিচ্ছে। আবার কেউ এসেছেন এক কাপড়েই। নারী বসনেও সাদার ছড়াছড়ি। এরা জাতে বিশ্বাসী নয়। সাদায় জাত চেনা যায় না। সাদায় রং থাকে না, হিংসা থাকে না। সাদাতেই কালো দূর হয়।

এমনটিই মনে করেন সাধক মানিক শাহ। তিনিও প্রায় তিন দশক ধরে লালনের ধামে আসেন। বলছিলেন, এমন সাধুসঙ্গ দুনিয়ার আর কোথাও মেলানো ভার। লালন আমাদের পথ দেখিয়েছে। ও পথেই মুক্তি। সমাজে এত হিংসা। কেউ কাউকে চিনি না। অথচ এই মানুষেই খোদার ভর। মানুষ না চিনলে খোদা মিলবে কী করে? তাইতো সাঁইজির কালাম ‘এসব দেখি কানার হাটবাজার’।

মানিক শাহের মতো হাজারও সাধু-ভক্ত মনের মানুষ খুঁজে ফিরছেন। খুঁজছেন নিজেকে, নিজের আত্মাকে। যে আত্মায় ভর করে আছে পরমাত্মা। পরমাত্মার দর্শন মানেই তো মনের মানুষের সঙ্গে মহামিলন। এমন মিলনের সাধনায় সাধকরা সর্বহারা। সংসার, সমাজ সব হারিয়ে অন্ধের মতো হাতড়াচ্ছে মনের মানুষের সন্ধানে।

এএসএস/এএইচ/বিএ