রেলের ভাড়া বাড়ছে

মেসবাহুল হক
মেসবাহুল হক , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:০৯ পিএম, ১৯ অক্টোবর ২০১৭ | আপডেট: ১২:৪০ পিএম, ২১ অক্টোবর ২০১৭
রেলের ভাড়া বাড়ছে

নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) আইন কার্যকর না হওয়ায় চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতির আশঙ্কা করছে সরকার। এই ঘাটতি মোকাবেলায় কর ছাড়া রাজস্ব এবং এনবিআর বহির্ভূত কর আদায় বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।

কর আদায় বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে রেলের ভাড়া ১৫ শতাংশ বাড়ানো, যানবাহন রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে ‘যানবাহন কর’ খাতে রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্যোগ, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত রেশন সামগ্রীর দাম বাড়ানো এবং বিয়ের রেজিস্ট্রেশন ফি বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ‘কর ছাড়া রাজস্ব এবং এনবিআর বহির্ভূত কর বৃদ্ধি’ সংক্রান্ত একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সদ্য বিদায়ী অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন।

সভায় রেলপথ মন্ত্রণালয় হতে আগত প্রতিনিধি জানান, রেলওয়ে খাতে বেশি পরিমাণে রাজস্ব আদায় হয়ে থাকে মূলত যাত্রী পরিবহন এবং মালামাল পরিবহন থেকে। বর্তমানে রেলওয়ে বিভাগে যে অবকাঠামো রয়েছে তাতে গড়ে বছরে ছয় কোটি যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব। তবে গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট প্রায় সাত কোটি যাত্রী পরিবহন করা হয়েছে।

রেলপথে যাত্রী পরিবহনের ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কোচের সঙ্কটের কারণে আরও বেশি সংখ্যক যাত্রীকে সেবাপ্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না।

‘আগামী দুই বছরের মধ্যে নতুন কোচ সংগ্রহের কোনো সম্ভাবনা নেই’ উল্লেখ করে ওই প্রতিনিধি আরও জানান, তবে পুরনো কোচ মেরামতের মাধ্যমে অধিক সংখ্যক যাত্রী পরিবহনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রেও ওয়াগন সঙ্কট রয়েছে বলে তিনি সভায় অবহিত করেন। এছাড়া বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর দিয়ে ইঞ্জিন স্থানান্তর করা যায় না। এসব অসুবিধা দূর করা সম্ভব হলে শুধুমাত্র মালামাল পরিবহন খাতে এক হাজার ৩০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ রাজস্ব আয় করা সম্ভব।

ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি জানান, গত অর্থবছরে সাত শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, গত কয়েক বছরে রেলে পরিবহনসেবার মান বাড়ানো হয়েছে। ফলে এ খাতে ব্যয় বেড়ে গেছে। তাই আয়-ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি কমিয়ে আনার জন্য আমরা ভাড়া বাড়াতে চাই। তবে এটা শুধু রেলপথ মন্ত্রণালয়ের একার কাজ নয়। এজন্য সরকারের অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয় ভাড়া বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে রেলে সকল শ্রেণির যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ক্ষেত্রে ভাড়া বাড়ে সাত দশমিক ৩২ শতাংশ। ওই সময় প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ৩৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। এর আগে প্রায় ২০ বছর পর ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রেলের ভাড়া বাড়ানো হয়। কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয় ৩৬ পয়সা, যা ছিল মোট ভাড়ার ২০ শতাংশ।

সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি যাত্রী পরিবহন ছাড়াও পার্সেল, মালামাল ও কন্টেইনার পরিবহনে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা হয়। নতুন ভাড়ায় রুটভেদে সাড়ে সাত থেকে নয় শতাংশ বাড়ে। এর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে শোভন শ্রেণির ভাড়া ২৬৫ টাকা থেকে ২৮৫ টাকা, শোভন চেয়ার ৩২০ থেকে ৩৪৫ টাকা, এসি চেয়ার ৬১০ থেকে ৬৫৬ টাকা, এসি সিট ৭৩১ থেকে ৭৮৮ এবং এসি বার্থ এক হাজার ৯৩ থেকে এক হাজার ১৮৯ টাকা।

ঢাকা-খুলনা রুটে শোভন শ্রেণির ভাড়া ৩৯০ থেকে বেড়ে ৪২০ টাকা, শোভন চেয়ার ৪৬৫ থেকে ৫০৫ টাকা, এসি চেয়ার ৮৯১ থেকে ৯৬১ টাকা, এসি সিট এক হাজার ৭০ থেকে এক হাজার ১৫৬ এবং এসি বার্থ এক হাজার ৫৯৯ থেকে এক হাজার ৭৩১ টাকা। ঢাকা-সিলেট রুটে শোভন শ্রেণির ভাড়া ২৬৫ টাকা, শোভন চেয়ার ৩২০ টাকা, এসি চেয়ার ৬১০ টাকা, এসি সিট ৭৩৬ এবং এসি বার্থ এক হাজার ৯৯ টাকা।

ঢাকা-রাজশাহী রুটে উল্লেখিত শ্রেণির ভাড়া যথাক্রমে ২৮৫, ৩৪০, ৬৫৬, ৭৮২ ও এক হাজার ৬৮ টাকা। অন্যান্য রুটেও প্রায় একই হারে ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়। অপরদিকে পণ্য ও কনটেইনার পরিবহনে ভাড়া বাড়ানো হয় সাত-নয় শতাংশ হারে। এতে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আইসিডি পর্যন্ত ওজন ও দৈর্ঘ্যভেদে আগে বিভিন্ন ধরনের কনটেইনার পরিবহনে ভাড়া ছিল নয় হাজার থেকে ২১ হাজার টাকা। এখন তা বাড়ানো হয়েছে নয় হাজার ৭০০ থেকে ২২ হাজার ৬০০ টাকা। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের আইসিডি পর্যন্ত ফিরতি পথের কনটেইনার পরিবহনের ভাড়াও বাড়ান হয়েছে।

ওই সময় রেলের ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছিল বিভিন্ন সংগঠন। তাদের বক্তব্য ছিল, জনমত উপেক্ষা করে ও যাত্রীস্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে এডিবির ‘ব্যবস্থাপত্র’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে রেলপথের যাত্রীভাড়া বাড়ানো হয়েছে। তারা আরও বলেন, ২০১২ সালে রেলপথের যাত্রীভাড়া বাড়ানোর সময় রেল কর্তৃপক্ষ যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হয়নি।

প্রসঙ্গত, গত ২৯ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেট পাস হয়। বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে মোট আয় ধরা হয় দুই লাখ ৯৩ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা এবং অনুদানসহ ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় এক লাখ ছয় হাজার ৭৭১ কোটি টাকা। তবে আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় সেটা নতুন ভ্যাট কার্যকরের ওপর নির্ভর করছিল। কিন্তু নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর করতে না পারায় রাজস্ব আদায় ২০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হবে বলে ধারণা করছে সরকার।

এমইউএইচ/এমএআর/আরআইপি