পোল্ট্রির সঙ্গে তাল রেখে এগোচ্ছে না পশুসম্পদ

মাসুদ রানা
মাসুদ রানা মাসুদ রানা , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৪৭ পিএম, ১৪ নভেম্বর ২০১৭

প্রাণিসম্পদের পোল্ট্রি খাতে যতটা বিকাশ হচ্ছে, পশুসম্পদের ক্ষেত্রে ততটা হচ্ছে না। এজন্য দুধ ও মাংসের ঘাটতি বেড়ে চলছে, বাড়ছে দাম। এতে দেশের একটি জনগোষ্ঠীর পুষ্টির চাহিদা মিটছে না, কারণ পুষ্টির যোগানের সঙ্গে সম্পৃক্ত এ খাবারগুলো তাদের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে।

অপরদিকে পোল্ট্রি খাত এগোলেও চাহিদা অনুযায়ী ডিম উৎপাদনে এখনো আমরা পিছিয়ে আছি।

সরকারের দায়িত্বশীলরা বলছেন, আগের তুলনায় ডিম, দুধ ও মাংসের উৎপাদন অনেক বেড়েছে, চাহিদা বেড়েছে এর চেয়েও বেশি। ঘাটতি পূরণে নানা ধরনের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে এবং হচ্ছে।

গত কয়েক বছরে নিত্যপণ্যের বাজারে যে জিনিসটির দাম সবেচেয়ে বেশি বেড়েছে তা হচ্ছে গরু ও খাসির মাংস। ২০১৫ সালে প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম ছিল সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা। সরকারের ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ও কৃষি বিপণন অধিদফতরের ১৪ নভেম্বরের তথ্য অনুযায়ী বাজারভেদে প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম ৪৮০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা। আর খাসির মাংসের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকা থেকে ৭৫০ টাকায়।

দেশি মুরগির ডিম প্রতি হালি ৪০ থেকে ৪২ এবং ফার্মের মুরগির ডিম ২৮ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দুর্লভ হয়ে উঠেছে দেশি মুরগি। মাঝারি আকারের একটি দেশি মুরগি ৩৫০ থেকে ৩৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফার্মের মুরগি প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়। তরল দুধের দাম ৬০ থেকে ৭০ টাকা।

দেশের দারিদ্র্যতা কমলেও পুষ্টির যোগান দেয়া এ খাদ্যগুলোর দাম এখনো একটি বড় জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ২৫০ মিলিলিটার দুধ ও ১২০ গ্রামে মাংসের চাহিদা রয়েছে। ডিমের চাহিদা বছরে ১০৪টি।

মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১০ লাখ ধরে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, বছরে দেশে দুধের চাহিদা এক কোটি ৪৬ লাখ ৯১ হাজার টন। সেখানে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৭২ লাখ ৭৫ হাজার টন। একজন মানুষের চাহিদার অর্ধেক (১২৫ মিলিলিটার) দুধ উৎপাদন হচ্ছে। দেশে বছরে দুধের উৎপাদনে ঘাটতি ৭৪ লাখ ১৬ হাজার টন।

বছরে ডিমের চাহিদা এক হাজার ৬৭৪ কোটি ৪০ লাখ পিস। এর মধ্যে উৎপাদন হয় এক হাজার ১৯১ কোটি ২৪ লাখ। ঘাটতি ৪৮৩ কোটি ১৬ লাখ পিস। একজন মানুষ বছরে ১০৪টির পরিবর্তে ৭৫টি ডিম পাচ্ছে।

একজন মানুষের দৈনিক মাংসের চাহিদা অনুযায়ী দেশে বছরে ৭৫ লাখ ৫২ হাজার টন মাংসের প্রয়োজন। কিন্তু ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে মাংস উৎপাদিত হয়েছে ৬১ লাখ ৫২ হাজার টন। মাংসের উৎপাদনে ঘাটতি নয় লাখ টন।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ২০১৬ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর ৩৬ শতাংশ এখনো খর্বকায়, শীর্ণকায় ১৪ শতাংশ শিশু। পাশাপাশি অপুষ্টির কারণে কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে ৩৩ শতাংশ শিশু।

আইসিডিডিআর,বি ও ব্র্যাকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, উচ্চমাত্রার অপুষ্টির ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের ৩৬টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। দেশের ৫১ শতাংশ শিশু রক্তস্বল্পতায় (এনিমিয়া) ভুগছে। মায়েদের ক্ষেত্রে এ হার ৪২ শতাংশ।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আইনুল হক মঙ্গলবার (১৪ নভেম্বর) জাগো নিউজকে বলেন, কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে দুধ ও মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টা করছি। পশুর অধিক উৎপাদনশীল জাত তৈরি হচ্ছে। ৪৫ লিটার দুধ দেয়া গাভীও এখানে উৎপাদিত হচ্ছে। ৪০০-৫০০ কেজি মাংস দেয়া গরুও আমরা তৈরির চেষ্টা করছি।

তিনি বলেন, আগামীতে ডেইরি ও মাংসের জন্য বড় একটি প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছি। গাভী পালনের জন্য পাঁচ শতাংশ হারে ঋণের ব্যবস্থা করেছি।

মহাপরিচালক আরো বলেন, আমরা উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার জন্য ঋণের ব্যবস্থা করেছি। প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। পশু-পাখির রোগ প্রতিরোধের জন্য টিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছি।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের ১০ বছরের পরিসংখ্যান ঘেটে দেখা গেছে, দুধ ও মাংসের ঘাটতির কারণ এ সময়ে গবাদি পশুর সংখ্যা কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়েনি।

২০০৬-০৭ অর্থবছরে মোট গবাদি পশুপাখির সংখ্যা ছিল ২৯ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা হয়েছে ৩৭ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার। এ সময়ে আট কোটি ১৫ লাখ গবাদি পশু-পাখি বেড়েছে।

এর মধ্যে ২০০৬-০৭ অর্থবছরে গরু, মহিষ, ভেড়া, ছাগলের সংখ্যা ছিল চার কোটি ৭৫ লাখ ১০ হাজার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে পাঁচ কোটি ৪৭ লাখ ৫৭ হাজারে। হাঁস-মুরগীর সংখ্যা ২৪ কোটি ৬০ লাখ থেকে হয়েছে ৩২ কোটি ৬ লাখ ৩৩ হাজার।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক বলেন, প্রাণিসম্পদ খাতে পশু পালনের মাধ্যমে লাভবান হওয়ার বিষয়টি বেশ দীর্ঘ মেয়াদি। সেজন্য পোল্ট্রির সঙ্গে তুলনা করলে এ খাত পিছিয়ে আছে। মাংস ও দুধের ঘাটতি মেটানোর জন্য আমাদের দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, গরুসহ গবাদি পশু পালনের জন্য চারণভূমিসহ জমি লাগে, কিন্তু আমাদের জমি সংকট দেখা দিয়েছে।

পোল্ট্রি খাতের ব্যবসায়ী মঞ্জুর মোর্শেদ খান বলেন, বেসরকারিভাবে বিনিয়োগের জন্য পোল্ট্রি খাত অনেক দূর এগিয়ে গেছে। যদিও উৎপাদন চাহিদা চেয়ে বেশ কম, এরপরও মানুষ কিনতে পারছে। এখন যা উৎপাদন হচ্ছে ২০২১ সালে তার দ্বিগুণ দরকার হবে।

তবে দুধ ও মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বেসরকারি বিনিয়োগের গতি খুব কম জানিয়ে এ উদ্যোক্তা বলেন, এক্ষেত্রে গো-খাদ্যের অভাব, গবাদিপশুর রোগ-প্রতিরোধের ওষুধের পর্যাপ্ততার ঘাটতি আছে। দামি গরুর নিরাত্তার জন্য ভালো ওষুধ নেই। এজন্য ওইদিকে বিনিয়োগ করাটা ঝুঁকিপূর্ণ।

মঞ্জুর মোর্শেদ আরো বলেন, উৎপাদনে ঘাটতি থাকায় ক্রেতাদের একটু বেশি দাম দিতে হচ্ছে এটা ঠিক। তবে দাম না পেলে কেউ বিনিয়োগেও তো উৎসাহিত হবে না।

জিডিপিতে (মোট দেশজ উৎপাদন) ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রাণিসম্পদের অবদান এক দশমিক ৬৬ শতাংশ। যদিও ২০০৯-১০ অর্থবছরে এ হার ছিল দুই দশমিক ০৬ শতাংশ। অপরদিকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জিডিপিতে প্রাণিসম্পদের প্রবৃদ্ধি তিন দশমিক ২১ শতাংশ।

বাড়ছে মাংস উৎপাদন

২০০৬-০৭ ও ২০০৭-০৮ অর্থবছরে মাংসের উৎপাদন ছিল ১০ লাখ ৪০ হাজার টন করে। পরের বছর উৎপাদন ৪০ হাজার টন বাড়ে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে দুধের উৎপাদন হয় ১২ লাখ ৬০ হাজার টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে দুধের উৎপাদন ছিল ১৯ লাখ ৯০ হাজার টন, ২৩ লাখ ৩০ হাজার টন, ৩৬ লাখ ২০ হাজার টন, ৪৫ লাখ ২১ হাজার ও ৫৮ লাখ ৬০ হাজার টন।

দুধের উৎপাদনের চিত্র

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য থেকে জানা গেছে, দুধের উৎপাদন ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ছিল ২২ লাখ ৮০ হাজার টন। পরের বছর ছিল ২৬ লাখ ৫০ হাজার টন। কিন্তু এর পরের দু’বছর উৎপাদন আবার কমে যায়। ২০০৮-০৯ ও ২০১০-১১ অর্থবছরে ২২ লাখ ৯০ হাজার ও ২৩ লাখ ৭০ হাজার টন দুধ উৎপাদিত হয়।

২০১৪-১৫ অর্থবছর পর্যন্ত চার বছরে দুধের উৎপাদন যথাক্রমে ৩৪ লাখ ৬০ হাজার টন, ৫০ লাখ ৭০ হাজার টন, ৬০ লাখ ৯২ হাজার টন ও ৬৯ লাখ ৭০ হাজার টন।

ডিমের উৎপাদনও বেড়েছে

২০০৬-০৭ অর্থবছরে ডিমের উৎপাদন ছিল ৫৩৬ কোটি ৯৬ লাখ পিস। পরের বছর ডিম হয় ৫৬৫ কোটি ৩২ লাখ পিস। কিন্তু ২০০৮-০৯ অর্থবছরে উৎপাদন কমে হয় ৪৬৯ কোটি ৬১ লাখ পিস। ডিমের উৎপাদন ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৫৭৪ কোটি ২৪ লাখ, ২০১০-১১ বছরে ৬০৭ কোটি ৮৫ লাখ, ২০১১-১২ তে ৭৩০ কোটি ৩৮ লাখ পিস।

২০১২-১৩ তে ৭৬১ কোটি ৭৪ লাখ, ২০১৩-১৪ বছরে এক হাজার ১৬ কোটি ৮০ লাখ এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এক হাজার ৯৯ কোটি ৫২ লাখ পিস ডিম উৎপাদিত হয়।

আরএমএম/এসএইচএস/এমএআর/বিএ