‘ও নাতিরা...নাও ভিড়াও নানিগো ঘাটে’

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বানিয়াশান্তা পল্লী থেকে ফিরে
প্রকাশিত: ০৪:১১ পিএম, ২৭ নভেম্বর ২০১৭ | আপডেট: ০৪:২১ পিএম, ২৭ নভেম্বর ২০১৭
‘ও নাতিরা...নাও ভিড়াও নানিগো ঘাটে’

দুপুরের জোয়ারে নদীবক্ষ তখনও যৌবনা। ফুলে-ফেঁপে থাকা সাগর পানিতে টইটম্বর পশুর নদীর দু’কূল। ডিঙা আর শ্যালোর নৌকাগুলো বিরামহীনভাবে যাত্রী পার করছে এপার থেকে ওপারে। যারা সুন্দরবন বিলাশে গিয়েছিলেন, তারা আরও আগেই ফিরেছে মংলা ঘাটে।

বেলা তখন একেবারেই পড়ন্ত। দিনভর তাপ ছড়িয়ে এ বেলায় গাঢ় রক্তলাল রূপ নিয়েছে হেমন্তের সূর্য। সুন্দরবনের কোলে ঢলে পড়তে বেলা আর সময় নিলো না। আর পরমুহূর্তেই প্রকৃতির রূপও বদলে গেল। নদীর কোল বয়ে খানিক হিমেল হাওয়া আসছে সুন্দরবনের গহীন থেকে। তাতে অবশ্য মনের উষ্ণতা আরও বাড়িয়ে দিলো।

দু’ধার ঘেঁষে জেলেদের মহোৎসব। মাছ ধরায় সামিল হয়েছেন নারীরাও। মংলা বন্দরের সার্চ লাইটগুলো তখন আলো ফেলছে নদীর জলে। বড় বড় লাইটার জাহাজ নোঙরপোতা মাঝনদীতে। যে লঞ্চ আর জাহাজ চলমান, সেগুলো সাইরেন বাজিয়েই পার হতে পারছে। লাইট জ্বালিয়ে অহেতুক নদীরূপের সৌন্দর্য ম্লান করছে না।

আলো-আঁধারের বিশেষ আবহে ছোট আকৃতির আমাদের ফাইবার নৌকাটি যখন ধীরে ধীরে বয়ে চললো, তখন ভাবতরঙ্গে যেন উথাল-পাতাল। নদী আর সুন্দরবনের রূপ মিলে অবেলার ভয় (রাতের নিরাপত্তাজনিত) ফিকে হয়েছে। প্রকৃতির এমন জমিনে মন মেলালে ভয় দূরে যায় বৈকি!

আধঘণ্টা চালিয়েই করমজল পয়েন্টে ভিড়লো নৌকাটি। করমজল পয়েন্ট তখন প্রায় ফাঁকা। গার্ড সতর্ক করে দিলো বনের মধ্যে না যাওয়ার। তবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই বনে ঢুকে দেখা মিললো বানর আর হরিণের। আর অসংখ্য কুমির ছানা তো পর্যটন কেন্দ্রটির মধ্যখানে হ্যাচারিতেই। অন্ধকার বন, অথচ আলোর পাহারা বসিয়ে চাঁদ উঁকি দিচ্ছে গাছের ফাঁক দিয়ে।

বনরূপের নৈসর্গিক প্রেমের অতৃপ্তি নিয়ে ফের তরী ভাসাতে হলো নদীবুকে। ততক্ষণে ভাটার টান নৌকার গতি খানিক কমিয়ে দিয়েছে। ফিরতি পথে মাঝি পশ্চিম তীর ঘেঁষে নৌকা চললো।

খানিক এসেই মাঝি বানিয়াশান্তা যৌনপল্লীর গল্প জোড়া দিলো। হাত উঁচিয়ে বলল, ওই যে পাড়া। আমাগোর কাছে এটি ‘নানির ঘাট’ নামে পরিচিত। অনেকে নটীবাড়িও বলে। রসিক পুরুষেরা আসে নানিগো (যৌনকর্মীর) লগে ফুর্তি করার জন্য। ঢাকা থেকে মালদার পার্টিও (টাকাওয়ালা) আসে এ পাড়ায়। আমরাই পার করে দিই। অনেকে সপ্তাহের জন্যই বেড়াতে আসে এ পাড়ায়। নদী, সুন্দরবন আর পাড়ার মায়ায় পরে অনেকে ফতুরও হয়। মাঝি রাজু পাড়ার সব খবরই রাখেন। বলেন, অনেক অপরাধীও আশ্রয় নেয় এ পাড়ায়। পুলিশের তল্লাশির বালাই নেই। টাকাতেই সব ম্যানেজ। আর ওই যে লাইটার জাহাজগুলো নোঙরপোতা দেখছেন, সেখানে পাড়া থেকে নানিরা গিয়ে সেবা দেন।

jagonews24

রাজু’র গল্প না ফুরাতেই বানিয়াশান্তা পল্লীর ঘাটে চলে আসে নৌকা। নৌকার গতি আরও কমিও দেয় রাজু। পাড়ঘেঁষেই অসংখ্য মাটির ঘর। খুপড়িসম টিনের ঘরও চোখে মিলল। কয়েক ঘর পরপরই দোকান। দোকানে দোকানে সোলার আর চার্জার লাইট মিলে পাড়ার রূপ বাড়িয়েছে। দোকানের বেঞ্চগুলোতে খদ্দের আর যৌনকর্মী গিঞ্জিমারা। তাতে অশালীন বাক্য বিনিময় হচ্ছে। হাসিতে খইও ফুটছে নিষিদ্ধ এই রঙ্গমহলে।

ভাটার বিড়ম্বনায় নৌকা আর ভেড়ানো হলো না ঘাটে। আধঘণ্টার মধ্যে মংলা ঘাটে নৌকা ভেড়াতে না পারলে জোয়ারের জন্য রাত ২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। নৌকার গতি বাড়াতেই পাড়া থেকে নারী কণ্ঠ ভেসে আসলো ‘যাইতোছো ক্যান, ও নাতিরা… নাও ভিড়াও নানিগো ঘাটে।’

এএসএস/এমআরএম/আরআইপি