চেয়ারটিতে আর বসবেন না আনিসুল হক

আবু সালেহ সায়াদাত
আবু সালেহ সায়াদাত আবু সালেহ সায়াদাত , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:১৯ এএম, ০৪ ডিসেম্বর ২০১৭

 

সেদিন ছিল ২৭ জুলাই। ওই দিন শেষবারের মতো নিজ কর্মক্ষেত্র ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) অফিসে এসেছিলেন সদ্য প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। সেদিন দীর্ঘ সময় নিজ কার্যালয়ের রুমে বসে কাজ করেছেন, কথা বলেছেন সবার সঙ্গে।

সেদিনই ছিল তার শেষ কর্মক্ষেত্র। নিজের সাজানো গোছানো পরিপাটি অফিসে নিজের চেয়ারে বসে কাজ করেছেন তিনি। নিজের এ চেয়ারটিতে আর কখনই বসবেন না আনিসুল হক।

তার শেষ কর্মক্ষেত্রে আসার স্মৃতি নিয়ে কথা হয় ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি-সহকর্মী খন্দকার মাহাবুব আলমের সঙ্গে। তিনি ডিএনসিসির (জোন-৩) নির্বাহী প্রকৌশলী। তিনি বলেন, আনিসুল হক যে রুচিশীল মানুষ ছিলেন সেই পরিচয় মিলে তার সাজানো গোছানো অফিস দেখলে। এ সাজানো গোছানো অফিসে তিনি শেষবার এসেছিলেন ২৭ জুলাই। সেই দিনই ছিল তার শেষ অফিস। ওইদিন দীর্ঘ সময় নিজ চেয়ারে বসে কাজ করেছেন।

anisul

তিনি আরও বলেন, ডিএনসিসির সাজানো গোছানো কার্যালয় পুরো বিষয়ে নির্দেশনা দিতেন তিনি। কোথায় সোফা থাকবে, কোনো পেন্টিং-ছবি কোথায় বসবে, সব কিছু নির্দেশনা দিতেন, খুব রুচিশীল মানুষ ছিলেন। এমন অনেক পেন্টিং-ওয়াল ছবি আছে, যা তিনি নিজের বাসা থেকে নিয়ে এসে অফিসে বসিয়েছেন।

খন্দকার মাহাবুব বলেন, আনিসুল হক মধ্যে মাঝেই আমাকে বলতেন নাগরিকরা যখন নাগরিক সেবা নিতে ডিএনসিসি কার্যালয়ে আসবেন তখন তারা এমন রুচিশীল অফিস দেখে আস্থা পাবেন, তারা ভাববে ডিএনসিসি অফিস এত সুন্দর-নিশ্চয় ডিএনসিসি এলাকাও আগামীতে এমন সুন্দর ফিটফাট হবে। আমি ঢাকাকে এই সুন্দর অফিসের মতো করেই সাজাতে চাই।

সেই সব বিষয় মাথায় রেখে মেয়র তার অফিসটাকে রুচিশীল করে সাজিয়েছেন। তিনি ছিলেন একজন সফল, রুচিশীল, প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি। সেই সঙ্গে তিনি একজন আধুনিক, পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন। একজন মানবিক মানুষ বলেও যুক্ত করেন তিনি।

anisul

আমরা যারা তার সঙ্গে কাজ করেছি, তার প্রতিটা পদক্ষেপেই উনার রুচিশীলতার বিষয় দেখতে পাই। পুরো অফিসের ডেকোরেশনের জিনিস তিনি নিজে সিলেক্ট করে নিজের মতো করে সাজিয়েছেন। তার রুচিশীলতার পরিচয় ডিএনসিসি ভবনের ডেকোরেশন দেখলেই সবাই জানতে পারবেন।

ডিএনসিসি ভবনে মেয়রের অফিস ঘুরে দেখতে দেখতে কথা হয় আনিসুল হকের ব্যক্তিগত সহকারী আবরাউল হাসান মজুমদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, তিনি খুব পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন। প্রতিদিনই অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকতেন। উনার সকাল থেকেই ব্যস্ততার মাধ্যমে দিন শুরু হতো। ৮ মাস মেয়রের সঙ্গে ছিলাম। প্রতিটি পদে পদে উনার কাছে শিক্ষনীয় বিষয় আছে। নিজের রুচিশীলতা পরিচয় দিয়ে আজকের এ অফিস সাজিয়েছেন তিনি। প্রতিটি কাজ তিনি গুছিয়ে করতেন। আমারা মনে আছে এখানে যোগদান করার আগে তিনি আমার ভাইভা নিয়েছিলে ৩৩ মিনিট ধরে। ঢাকাকে যেমন বদলে দিতে চেয়েছিলেন, তেমনি তার কার্যালয় ডিএনসিসি কার্যালয়ও সাজিয়েছেন মনমুগদ্ধকরভাবে। তিনি ঢাকাকে বদলে দেয়ার উদ্যোগের জন্য ৪২টি কাজের লিস্ট করেছিলেন। কে কোন কাজ করবে, কীভাবে করবে সেসব তিনি লিখে রেখেছিলেন আর সেভাবেই মনিটরিং করছিলেন।

মেয়র কর্নারের ফ্লোরে রিসিভশনে কাজ করেন আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, মেয়র অফিসে প্রবেশ-বাইরে হওয়ার সময় তাদের খোঁজ নিতেন। অফিস সাজানো গোছানো বিষয়টি তিনি যন্ত্রসহকারে দেখতেন সব সময় নিজে পরামর্শ দিতেন এ জিনিসটা ওখানে রাখো, ওইটা এখানে আনলে ভালো হবে এমন।

anisul

সোমবার উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের দফতর কক্ষটিতে রক্ষিত বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন ক্যামেরায় ধারণ করার জন্য খুলে দেয়া হয়। সে সময় ডিএনসিসির মেয়র আনিসুল হকের কক্ষ এবং মেয়র ফ্লোরের সাজানো গুছানো ডেকোরেশন নানা দিক তুলে ধরেন নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার মাহাবুব আলম।

তিনি বলেন, এ ভবনের ডেকোরেশনের চিত্রের মাধ্যেমে সবাই আনিসুল হকের রুচিশীলতা বিষয়ে জানতে পারবেন।

গত ২৯ জুলাই ব্যক্তিগত সফরে সপরিবার যুক্তরাজ্যে যান আনিসুল হক। অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ১৩ আগস্ট তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার শরীরে মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত রোগ ‘সেরিব্রাল ভাস্কুলাইটিস’ শনাক্ত করেন চিকিৎসকরা। এরপর তাকে দীর্ঘদিন আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিল। একপর্যায়ে মেয়রের শারীরিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় তার কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র খুলে নেয়া হয়। কিন্তু মঙ্গলবার (২৩ নভেম্বর) ডিএনসিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, রক্তে সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাকে আবার আইসিইউতে নেয়া হয়। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার (৩০ নভেম্বর) রাতে মারা যান মেয়র আনিসুল হক।

এএস/জেএইচ/আইআই