জাগ্রত বিবেকের মানবেতর ঘুম

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:৩২ পিএম, ১৮ জানুয়ারি ২০১৮ | আপডেট: ০৭:০৮ পিএম, ১৮ জানুয়ারি ২০১৮
জাগ্রত বিবেকের মানবেতর ঘুম
ছবি : মাহবুব আলম

জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভেতর থেকে সড়কে হেলে পড়া গাছের পাতায় পাতায় তখন কুয়াশা নিংড়ানো পানির ফোটা। খানিক সময় নিয়ে ভারি হয়ে, তা টপটপ করে পড়ছে পলিথিনের ওপর। কুয়াশা ভেজা পলিথিনগুলোতে ল্যাম্পপোস্টের আলোও পড়ছে। পূব দিকে থেকে ছুটে আসা গাড়ির হেড লাইটের আলোও মিলছে তাতে। ভেজা পলিথিনে আলো পড়তেই চিকচিক করে ওঠছে।

ঘড়ির কাঁটা তখন রাত সাড়ে তিনটার ঘরে। মাথা ঘেঁষে যখন ভারি ভারি ট্রাকের চাকা সড়ক পিষ্ট করে যাচ্ছিল, তখন পলিথিনের ভেতর থেকে ভয় আর আতঙ্কের চোখগুলো মিটমিট করে তাকাচ্ছিল। ঘুমে আচ্ছন্ন চোখগুলো উঁকি দিয়ে পরক্ষণেই পলিথিনের ভেতরে মিলে যাচ্ছে।

IMG_0477

জাতির জাগ্রত বিবেক শিক্ষকদের চোখ ওগুলো। ক্লান্ত অথচ স্বপ্ন জাগানিয়া ওমন চোখে শিক্ষকরা শীতের রাত পোহাচ্ছেন ঢাকার রাজপথে। এমপিওভুক্ত হওয়ার দাবিতে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের আমরণ অনশন চলছে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে। গত ১০ এপিল থেকে এ অনশন শুরু করেন শিক্ষকরা।

পিচ ঢালা সড়ক। নীচে খানিক পলিথিন জুটেছে কারও কারও ভাগ্যে। তবে বেশির শিক্ষকরাই পিচের ওপরেই শোয়া। কাঁথা-কম্বল বা চাদর মুড়িয়ে হিম হয়ে আসা শৈত্যপ্রবাহ মোকাবেলা করার চেষ্টা থাকলেও, কুয়াশা তাতে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছিল। আর কুয়াশা থেকে রক্ষা পেতেই পলিথিনের এই আবরণ।

কয়েক সারিতে শুয়ে থাকা শিক্ষকদের কারও কারও মাথা এসে ঠেকছে সড়কের মধ্যখানে। মাথার কাছে রাখা ব্যাগ আর জুতা। হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে তাতে হাতও রেখেছেন কেউ কেউ। দূর থেকে দেখলে মনে হবে সবজি জাতীয় কিছু পলিথিনে ঢেকে রাখা আছে বিক্রির জন্য।

IMG_0485

আর কাছে গিয়ে দেখলে মনে হবে, লাশের সারি। মনে হবে, স্বপ্ন ভরা প্রাণগুলো যেন বড় কোনো দুর্ঘটনায় নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে আছে।
লাশের সারিই বটে, নইলে এমন ব্যস্ত সড়কের মধ্যখানে ঘুমায় কি করে! জ্ঞান বিতরণের এই মানুষগুলোর বেঁচে থাকার অনুভূতি যে ভোঁতা প্রায়, তা যে কেউ রাতের এই অনশন দেখলেই ঠাওর করতে পারবে। রাজধানীর প্রধান এই সড়কে শত শত মানুষের অনশন, অথচ কোনো সেভ জোন করে দেয়া হয়নি।

যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, এমন শঙ্কা যে কোনো সচেতন মানুষই করতে পারেন। আশপাশে কোনো খাবার পানি বা টয়লেটের ব্যবস্থাও নেই। প্রেস ক্লাবের তালা বন্ধ থাকা আগ রাতেই। যদিও অনশনে বয়স্ক, নারীও অংশ নিয়েছেন। প্রাণের দাবিতে এসে চরম মানবেতরে ঠেকছে শিক্ষকদের এই অনশনে।

রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার গুঠির ডাঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক হুমায়ুন কবির অনশনে যোগ দিয়েছেন গত ১৩ জানুয়ারি।

IMG_0494

তিনি বলেন, চাকরিতে যোগ দেয়ার পর থেকেই তো অনশনে জীবন যাপন করছি। জীবনের সবই তো চাকরির পেছনে। অথচ চাকরির ২০ বছরেও এমপিও অধিভুক্ত করতে পারলাম না। বার বার প্রতিশ্রুতি মিলেছে, কিন্তু ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আসেনি।

ভোলার দৌলতখানের পঞ্চিম জয়নগর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসেছেন দুলাল চন্দ্র ভক্ত। বলেন, গত ১০ তারিখ থেকে অনশন চলছে। এই শৈত্যপ্রবাহে জীবন যায় যায়! প্রসাব-পায়খানার জায়গা নেই। ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে রাতে পোহায়। একটি গাড়ি ঘুমন্ত মানুষগুলোর ওপর ওঠে গেলেই স্মরণকালের ট্রাজেডি ঘটবে।

এএসএস/এমআরএম/পিআর