বাড়ছে খরচ স্থবির বিনিয়োগ

মো. শফিকুল ইসলাম
মো. শফিকুল ইসলাম মো. শফিকুল ইসলাম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:১১ এএম, ২৪ জানুয়ারি ২০১৮
ফাইল ছবি

গ্যাসের স্বল্পতার কারণে ক্রমেই স্থবির হয়ে পড়ছে দেশের শিল্প খাত। প্রয়োজনীয় গ্যাসের অভাবে কারখানায় বাড়ছে খরচ। সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গ্যাস না থাকায় উৎপাদনে যেতে পারছে না অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান। ফলে উদ্যোক্তা থাকলেও স্থবির অবস্থা বিরাজ করছে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন কমে গেছে। বিকল্প হিসেবে জ্বালানি ব্যবহার করায় বাড়ছে খরচ। আবার গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় তারা উৎপাদন শুরু করতে পারছেন না। এতে নষ্ট হচ্ছে মূলধনি যন্ত্রপাতি। ফলে বাড়ছে ব্যাংক ঋণের সুদ। এছাড়া গ্যাসের নিশ্চয়তা না পাওয়ায় আগ্রহ থাকলেও নতুন শিল্প স্থাপনে সাহস করছেন না অনেক উদ্যোক্তা। ফলে সম্প্রসারণ হচ্ছে না নতুন শিল্প। শ্লথ হয়ে পড়েছে বিনিয়োগের গতি। এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানির মাধ্যমে সঙ্কট মোকাবেলা করা হবে বলছেন নীতি নির্ধারকরা।

তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, শিল্প কারখানায় গ্যাস সঙ্কটের বিষয় অনেক পুরনো। উৎপাদনের অন্যতম কাঁচামাল গ্যাস সরবরাহ সঙ্কটের কারণে উদ্যোক্তারা পিছিয়ে যাচ্ছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পোশাক খাত। এ বিষয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করেছি। এলএনজি না আসা পর্যন্ত এটি পুরোপুরি সমাধান হবে না। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হলে ২০২১ সালের মধ্যে পোশাক রফতানি ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে বলেও জানান এ তৈরি পোশাক রফতানিকারক।

বেশ কয়েকটি শিল্প কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাস সঙ্কটের কারণে কারখানার উৎপাদন ব্যাহতের সঙ্গে খরচও বাড়ছে। প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় জেনারেটর ও বয়লার চালাতে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। গ্যাসের তুলনায় খরচ বাড়ছে বহুগুণ।

এ দিকে একজন শিল্পোদ্যোক্তা জানিয়েছেন, গ্যাস সঙ্কটের কারণে কারখানার বয়লার ডিজেল দিয়ে চালাতে হচ্ছে। তিনি বলেন, যেখানে বয়লার গ্যাসে চালালে ব্যয় হয় সর্বোচ্চ সাড়ে তিন টাকা। সেখানে ডিজেলভিত্তিক বয়লারে ইউনিটপ্রতি খরচ হচ্ছে ৪৬ টাকা।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ায় বিদ্যুৎ সঙ্কট কিছুটা কেটেছে। তবে এখনও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে গ্যাস সঙ্কট আগের মতোই আছে, বরং ইদানীং তা বেড়েছে।

তিনি জানান, সরকার তাদের আশ্বস্ত করেছে শিল্প খাতে গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যা চলতি বছরে সহনীয় পর্যায়ে আসবে।

প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, গ্যাস সঙ্কট সমাধানে এলএনজি আমদানি প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। শিগগিরই আমদানি করা হবে। এতে গ্যাস সঙ্কটের ৫০ শতাংশ দূর হবে।

জানা গেছে, বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা দিনে ৩৫০ কোটি ঘনফুটের ওপরে। উৎপাদন হয় ২৭০ কোটি ঘনফুট। ঘাটতি ৮০ কোটি ঘনফুট। এজন্য নতুন সংযোগ দেয়া হচ্ছে না। আবাসিকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে। হাজার হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠানের গ্যাস সংযোগের আবেদন থাকলেও দেয়া হচ্ছে খুব সীমিত আকারে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটির মাধ্যমে গত বছর বিশেষভাবে গ্যাস সংযোগ পেয়েছে মাত্র দেড়শতাধিক প্রতিষ্ঠান।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানিয়েছেন, গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে প্রায় দুই হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠান। এলএনজি আমদানি শুরু হলে এই কারখানাগুলোর সংযোগ পাবে। গ্যাস-বিদ্যুৎসহ অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ পরিস্থিতি প্রায় স্থবির হয়ে আছে। এদিকে বর্তমানে বেসরকারিখাতে বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে নিতে হলে বেসরকারিখাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে ৩৪ শতাংশ উন্নীত করতে হবে।

এ বিষয়ে ব্যাংকাররা বলছেন, বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদ হার অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও উদ্যোক্তারা ঋণ নিচ্ছে না। এর প্রধান কারণ অবকাঠামোগত সমস্যা। বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুতের সঙ্কট। আর এর মধ্যে গ্যাস সংঙ্কটই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা।

এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) প্রেসিডেন্ট আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সঙ্কটের কারণে দেশে নতুন নতুন শিল্প কারখানা হচ্ছে না। জ্বালানি খাতে ব্যয় বাড়ছে। ফলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন না। এতে বিদেশের বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বেগ পেতে হচ্ছে। তাই দেশের উৎপাদন ও রফতানি বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গ্যাস-বিদ্যুৎসহ অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এসআই/ওআর/এআরএস/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :