নারীর ক্ষমতায়নে এগিয়ে সরকার, পিছিয়ে দল

আমানউল্লাহ আমান
আমানউল্লাহ আমান আমানউল্লাহ আমান , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:৩২ পিএম, ০৮ মার্চ ২০১৮

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারে নারীর ক্ষমতায়নে প্রশংসনীয় অগ্রগতি হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগে নেতৃত্বে পিছিয়ে আছে নারী। দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের সব কমিটিতে নারীর ক্ষমতায়ন বা পদায়ন ১৫ শতাংশ এবং শুধু কেন্দ্রীয় কমিটিতে এই হার প্রায় ১৯ শতাংশ।

গত বছর নির্বাচন কমিশনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্বাক্ষরিত দেয়া একটি চিঠির তথ্যে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০-এর খ-এর খ (২) অনুচ্ছেদে ২০২০ সালের মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ রাজনৈতিক দলের সবস্তরের কমিটিতে অন্তত ৩৩ শতাংশ পদ নারী সদস্যদের জন্য সংরক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আওয়ামী লীগের হাতে দুই বছরেরও কম সময় রয়েছে।

যদিও বর্তমান সরকার নারীর উন্নয়ন ও অগ্রগতির সূচকে প্রশংসনীয় অগ্রগতি লাভ করেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীর অংশগ্রহণের মান হিসেবে বিশ্বে ষষ্ঠ স্থানে বাংলাদেশ। জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা নারীর উন্নয়নে বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেছে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০১৬’ অনুযায়ী ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭২তম, যা দক্ষিণ এশিয়ার যে কোনো দেশের চেয়ে ভালো অবস্থান নির্দেশ করেছে।

সরকারে নারীর ক্ষমতায়ন সম্পর্কে বৃহস্পতিবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, বর্তমান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং এদেশের নারীদের কর্মস্পৃহা, দক্ষতা ও ত্যাগের ফলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের নারীর অবস্থান সুদৃঢ় হয়েছে। বর্তমানে জাতীয় সংসদে ৭২ জন নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের আমলেই জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলা পরিষদে একজন করে নির্বাচিত মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা এক তৃতীয়াংশে উন্নীত করা হয়েছে। এসব আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা নারীর ক্ষমতায়ন বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে।

তিনি বলেন, নারীর উন্নয়নে অগ্রমুখী কৌশল গ্রহণের ফলেই আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, সংসদ উপনেতা, বিরোধীদলীয় নেতা, হুইপ, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারপারসন, বিচারপতি, সচিব, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ডিসি, এসপিসহ সরকারের সব ক্ষেত্রে নারীদের দৃপ্ত পদচারণা। এমনকি আমাদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এমপি বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েসনের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হয়েছেন, যা বাংলাদেশের জন্য বিরল সম্মান।

দলের মধ্যে নারীর ক্ষমতায়নে এখনও আওয়ামী লীগ পিছিয়ে থাকা সম্পর্কে দলটির নেতারা জানিয়েছেন, দল ও দলের সভাপতি শেখ হাসিনা নারীর ক্ষমতায়নে আন্তরিক হলেও দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি পূরণ কঠিন। তারপরও আওয়ামী লীগ এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ আজ রোলমডেল। আমাদের দলের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব কমিটিতে নারীর অংশগ্রহণও ঊধ্র্বমুখী, যা অন্য যেকোনো দলের চেয়ে বেশি।

তারা বলেন, আমরা চাই নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়ুক। আমাদের দলীয় ফোরামেও এ নিয়ে বারবার কথা হয়েছে। তবে এই কাজ অনেক কঠিন। কারণ নারীরা বর্তমানে অনেক দূর এগিয়ে গেছে এটা যেমন সত্য তেমনি তৃণমূলে এখনও অনেক জায়গায় নারীরা রাজনীতিতে আসতে পারছেন না। পুরুষশাসিত সমাজে এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীরা দুর্বল থাকে। পুরুষশাসিত সমাজে নানা ধরনের নির্যাতনের মুখে নারীদের পড়তে হয়।

দলটির নেতারা জানিয়েছেন, শুধু দলে নয় গ্রামীণ পর্যায় থেকে শুরু করে চাকরি ক্ষেত্রে নারীদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে নারীদের ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যায়েও আমরা নারী নেতৃত্বকে উৎসাহিত করছি। আমরা বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, পৌরসভা নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন এবং সংসদ নির্বাচনেও নারীদের উৎসাহ দিচ্ছি।

আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, নারীর ক্ষমতায়ন ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি সারা বিশ্বে প্রশংসনীয় হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনে দেয়া দলটির চিঠির তথ্য মতে, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বে রোলমডেল। তার নেতৃত্বে রাজনীতিসহ সব ক্ষেত্রেই নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এই ধারা অব্যাহত রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের ৯০-এর খ-এর খ (২) অনুচ্ছেদ অর্জন করা হবে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, ২০২০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ পদ নারী সদস্যদের জন্য সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েই অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতো আওয়ামী লীগও ২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হয়েছিল, যা পূরণে সময় আছে দুই বছরেরও কম।

নির্বাচন কমিশনকে দেয়া আওয়ামী লীগের তথ্য অনুযায়ী, ৬৪টি জেলা ও ১২টি মহানগর নিয়ে মোট ৭৮টি সাংগঠনিক জেলা কমিটি রয়েছে আওয়ামী লীগের। এর বাইরে ৪৯০টি উপজেলা কমিটি, ৩২৩টি পৌরসভা ও ৪ হাজার ৫৫০টি ইউনিয়ন কমিটি এবং তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিটি পৌরসভা ও ইউনিয়নে ওয়ার্ড কমিটি রয়েছে। এর মধ্যে ৮১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সভাপতিসহ মোট ১৫ জন নারী রয়েছেন। এছাড়া গত বছরের জুন পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী দলের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটিতে নারী সদস্যের হার ১৫ শতাংশ বলে জানিয়েছে দলটি।

নির্বাচন কমিশনকে দেয়া আওয়ামী লীগের চিঠিতে বলা হয়, দলের তিন সহযোগী সংগঠন- মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ ও মহিলা শ্রমিক লীগের শতভাগ সদস্য নারী। তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব সৃষ্টি ও নারীর ক্ষমতায়নে সংগঠনগুলো কাজ করছে। ২০২০ সালের মধ্যেই সব কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আওয়ামী লীগ সক্ষম হবে বলেও চিঠিতে জানানো হয়।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ জাগো নিউজকে বলেন, আমরা ইতোমধ্যে ১৯ থেকে ২০ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে পেরেছি। আগামী পাঁচ বছরে আরও বৃদ্ধি পাবে, আমরা আশা করছি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৩৩ শতাংশ অর্জন করতে পারব।

তিনি বলেন, উইমেন ইম্পাওয়ারিংয়ের মাধ্যমে আমরা নারীদের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে চাচ্ছি। গ্রামীণ পর্যায় থেকে শুরু করে চাকরি ক্ষেত্রে নারীদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে নারীদের ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যায়েও আমরা নারী নেতৃত্বকে উৎসাহিত করছি।

হানিফ বলেন, আমরা বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা এবং সংসদ নির্বাচনেও নারীদের উৎসাহ দিচ্ছি। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা আশা করছি ২০২০ সালের মধ্যে নারী নেতৃত্বের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারব।

যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আকতার জাগো নিউজকে বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের বিধান মোতাবেক বাংলাদেশের অন্য রাজনৈতিক দলের চেয়ে আওয়ামী লীগে নারী নেতৃত্বের অংশগ্রহণ বেশি। অন্য দলের তুলনায় আওয়ামী লীগ এগিয়ে আছে। তবে আমি মনে করি আমাদের আরও আগানো উচিত। কারণ নির্বাচন কমিশনে দেয়া প্রতিশ্রুতি অর্জনে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো উচিত। রাজনীতির তৃণমূল থেকে একেবারে কেন্দ্র পর্যন্ত।

তিনি বলেন, নারীরা জন্মগতভাবে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে বড় হয়। রাজনীতিটা আরও অনেক বড় ক্ষেত্র এবং চ্যালেঞ্জিং। রাজনীতির মাঠে নারীদের অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীরা দুর্বল থাকে। পুরুষশাসিত সমাজে নানা ধরনের নির্যাতনের মুখে নারীদের পড়তে হয়। সবসময় নারীকে পুরুষের সমকক্ষ কি না সে বিচার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই অবজ্ঞা করা হয়। একজন নারী যতই সৎ হোক, নির্ভিক হোক, দেখা যায়, নির্বাচন করার সময় বলা হয়, টাকা নাই, লোকবল নাই। বলা হয়, নির্বাচন করে জিতে আসতে পারবে না।

এইউএ/জেডএ/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :