‘আমাকে চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাবে বলে শুয়ে আছে আইসিইউতে’

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:৪২ পিএম, ১৭ মে ২০১৮ | আপডেট: ০৯:০৫ পিএম, ১৭ মে ২০১৮
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে মালেক রশিদ

* কাজ করছে না মস্তিষ্ক

* প্রয়োজন বিপুল অঙ্কের চিকিৎসা ব্যয়

‘শুক্রবার ছুটির দিনে চিড়িয়াখানায় বেড়াতে নিয়ে যাবে। আমি বাচ্চাদের সাজিয়ে নিজেও সাজছিলাম। দুপুর ১টার দিকেও ফোনে কথা হলো। এরপরেও ফোন আসল, তবে ওর কণ্ঠ ছিল না। ওর ফোনে কে যেন জানালো, দুর্ঘটনার কথা। সেই সাজ নিয়েই ঢাকা মেডিকেলে যাই। আমার প্রাণপ্রিয় স্বামীর রক্তাক্ত নিথর দেহ হাসপাতালের বারান্দায়। দুর্ঘটনার পর ওর মুখের কথা আর শুনতে পাইনি। আমাকে চিড়িখানায় নেয়ার কথা বলে শুয়ে আছে আইসিইউতে।’

রাজধানীর মিরপুর বাংলা কলেজে পড়তে গিয়ে মালেক রশিদের সঙ্গে পরিচয় হয় ইয়াসমিন আক্তার স্মৃতির। সেই পরিচয় থেকেই প্রেম। বিশ্বাসের সম্পর্কের পরিণত রূপ নেয় বিয়েতে। উভয়ের পরিবারের স্বীকৃতিও ছিল তাতে। ফলে বিয়ের পরেও মধুর ভালোবাসার ডানা প্রসারিত হয় রশিদ-স্মৃতির সংসারে। চার বছর আর তিন মাস বয়সী দুই ছেলে সন্তান মিলে আলোয় ভরপুর হয়ে ওঠে সে সংসার

এত আলো! অথচ স্মৃতির সামনে এখন শুধুই অন্ধকার। গত ১১ মে দুপুর দেড়টায় স্বামী রশিদ সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন। এরপর থেকেই অথৈই সাগরে হাতড়িয়ে বেড়াচ্ছেন স্মৃতি। সুখের নিদ্রা চলে গেছে পরিবারের অন্যদের চোখেও।

Malek-Rashed
সন্তান নিয়ে মালেক ও স্মৃতির সংসার ছিল আলোয় ভরপুর।

প্রেমের মানুষটি আদৌ ফিরবেন কি না, তার কিছুই জানেন না স্মৃতি। ঘটানার পর থেকেই আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) অচেতন অবস্থায় রয়েছেন গার্মেন্টসে এক্সেসরিজ সরবরাহকারী মালেক রশিদ। কপালের হাড় ভেঙে মাথার ভেতরে ঢুকেছে। দুর্ঘটনার পর মারাত্মক হার্ট অ্যাটাকও হয়েছে তার। বাম হাত ভেঙে নড়বড়। একজন সুস্থ-সবল যুবকের সোনালী স্বপ্ন যেন এক সর্বনাশা দুর্ঘটনাতেই ম্লান হয়ে গেছে।

ঘটনার দিন দুপুর দেড়টার দিকে বেড়িবাঁধ দিয়ে মিরপুর-২-এ ফিরছিলেন। শাহ আলী থানাধীন গোরান চটবাড়ী রাস্তা সংলগ্ন ছোট মসজিদের সামনে আসতেই ঢাকা মেট্রো ছ-১১-০৩৩৩ নম্বরের বাসটি একটি লেগুনাকে ওভারটেক করতে চায়। এ সময় ঢাকা মেট্রো ব-১১-৭৪৮১ আরেকটি বাসের সঙ্গে ত্রিমুখী সংঘর্ষে গুরুত্বর আহত হন মালেক রশিদসহ বেশ কয়েকজন। নিহত হন শিশু খাদিজাসহ আরও দুই যুবক।

Malek-Rashed-1
সুস্থ অবস্থায় প্রাণচঞ্চল মালেক রশিদ।

মৃত্যু ছুঁতে না পারলেও কার্যত অচল হয়ে গেছে মালেক রশিদের মস্তিষ্ক। ঘটনার পর শাহ আলী থানার পুলিশ অচেতন রশিদকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠায়। ঢামেকে আইসিইউতে বেড না পাওয়ায় পরে ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর নেয়া হয় স্কয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে। চিকিৎসা ব্যয়ে অপারগ হয়ে স্কয়ার হাসপাতাল থেকে তাকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যেই লাখদশেক টাকা ব্যয় হয়েছে বলে তার পরিবার জানিয়েছে। মালেক রশিদকে বাঁচাতে হলে দীর্ঘসময় আইসিইউতে রাখা এবং বিপুল অঙ্কের চিকিৎসা ব্যয় প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

Malek-Rashed-3
বাবাকে খুঁজে ফিরছে চার বছর আর তিন মাস বয়সী দুই ছেলে সন্তান।

কথা হয় পাগলপ্রায় স্মৃতির সঙ্গে। বলেন, ‘এভাবে স্বামীকে বাকরুদ্ধ দেখে কলিজা ফেটে যাচ্ছে। জানি না, স্বাভাবিক জীবনে আর ফিরবে কি না! এত প্রেম দু’জনায়। অথচ চোখের জল ছাড়া আর কিছুই নেই আমার। তিন মাসের সন্তান অজান্তেই বাবাকে খুঁজে ফিরছে। বড় ছেলে বাবাকে ছাড়া ঘুমাতে যায় না। বৃদ্ধ শ্বশুর হাসপাতালের বারান্দায় বসে আছেন চাতকের মতো। আর পারছি না। কোথায় পাবো এত টাকা! যারা এত বড় ক্ষতি করল, তাদের কি কোনো-ই দায় নেই।

এএসএস/জেডএ/পিআর

তিন মাসের সন্তান অজান্তেই বাবাকে খুঁজে ফিরছে। বড় ছেলে বাবাকে ছাড়া ঘুমাতে যায় না। বৃদ্ধ শ্বশুর হাসপাতালের বারান্দায় বসে আছেন চাতকের মতো

আর পারছি না। কোথায় পাবো এত টাকা! যারা এত বড় ক্ষতি করল, তাদের কি কোনো দায় নেই