৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আওয়ামী লীগই

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:৩০ পিএম, ৩১ আগস্ট ২০১৮

ড. কামাল হোসেন। বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধানপ্রণেতা। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায়। দ্বিধা আর নানা টানাপোড়েন থেকে আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে গণফোরাম নামে রাজনৈতিক দল গঠন করেন।

ছয় দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে ফের আলোচনায় গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। নির্বাচন ঘিরে ‘জাতীয় যুক্তফ্রন্ট’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। ঐক্য গঠনে বৈঠক করছেন, আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

‘জাতীয় যুক্তফ্রন্ট’ গঠন প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয়টি থাকছে আজ।

জাগো নিউজ : স্বাধীনতার অর্ধশত বছরে বাংলাদেশ। এতোদিনেও আমরা নির্বাচনী ব্যবস্থা ঠিক করতে পারলাম না। মানুষ এখনও পরিবর্তন চেয়ে আন্দোলন করছে। তার মানে বাঙালি নিজেরা নিজেদের শাসন করতে অক্ষম?

কামাল হোসেন : বাঙালিরা স্বাধীনচেতা। শাসন ব্যবস্থার ঘাটতি আছে বলেই সংকট এবং এই সংকট উত্তরণে এ দেশের মানুষ বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু শাসন ব্যবস্থায় স্থিতিশীল অবস্থা আনতে পারেনি।

জাগো নিউজ : শাসন ব্যবস্থার এই ঘাটতিতে সাংবিধানিক কোনো সংকট আছে কিনা?

কামাল হোসেন : বাংলাদেশের সংবিধান কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পাথেয় বলে আমি মনে করি। দেশের চলমান পরিস্থিতি সাংবিধানিক কোনো সংকটের কারণে নয়। যারা দেশ পরিচালনা করছেন, যারা জনগণের ভোট নিয়ে সংসদ পরিচালনা করছেন, তাদের কারণে আজ এই সংকট।

সংসদীয় ব্যবস্থায় জনগণের প্রতিনিধি আসার কথা। আগে স্কুলশিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবীরা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতেন। এখন আসছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের কাছে ক্ষমতা গেলে জনকল্যাণ হয় না।

kamal-02

নির্বাচনী পরিপত্রে ত্রুটি দূর করতে আইন পরিবর্তন হলো। আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখানোর ব্যবস্থা রাখা হলো। নির্বাচনে কত টাকা ব্যয় করতে পারবেন, তারও নীতিমালা হলো। কিন্তু কোনো কিছুই আর কাজে আসছে না। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নীতির প্রতি আন্তরিকতা না থাকলে বিধান করে আসলে কোনো লাভ হয় না। নির্বাচন কমিশন কিছুই করতে পারছে না। পেশিশক্তির কাছে নির্বাচন কমিশন জিম্মি।

জাগো নিউজ : এমন পরিস্থিতির মধ্যে জোট গঠন করে আসলে কি ফল আসবে?

কামাল হোসেন : গণজাগরণ সৃষ্টির মধ্যেই পরিবর্তন আসবে। জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

তবে আমাদের হাতে সময় কম এখন। আরও আগে ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্তের দরকার ছিল। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা আর কয়েক সপ্তাহ বাকি। তবে সময় যতটুকুই থাকুক, আমরা সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছি। এবার নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে জনগণ আর মানবে না।

জাগো নিউজ : ৫ জানুয়ারির নির্বাচন দিয়েই তো সরকার পাঁচ বছর টিকে থাকলো…

কামাল হোসেন : কিন্তু ফলাফল তো ভালো হয়নি। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশে হিংসা বেড়েছে। রাজনৈতিক কলহ সর্বত্র। মানুষে মানুষে আস্থা কমেছে।

আজ আওয়ামী লীগের লোকজনই মনে করছে, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে মহাজোট ১৫ বা ১৬ ভাগের বেশি ভোট পাবে না। সরকারের নিজেদের লোকই তো ভরসা পাচ্ছে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো একটি সাজানো নির্বাচন না করলে আওয়ামী লীগকে আজ এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না।

জাগো নিউজ : ঐক্য নিয়ে বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে?

কামাল হোসেন : আমরা আলোচনা করছি নির্বাচনকালীন সব ব্যবস্থা নিয়ে। কীভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে- তা নিয়ে এখন আমাদের ভাবনা। আবার একটি নির্বাচনে আটকা থাকলে হবে না। সংসদ কীভাবে চলবে- তারও আলোচনা করতে হবে।

আলোচনা অনেক বাকি। গত এক দশকে বড় বড় ঘটনা ঘটেছে। অথচ সংসদ অকার্যকর। কিছুই করতে পারেনি। পাশের দেশ মিয়ানমার থেকে সাত লাখ মানুষ প্রবেশ করলো, আটকাতে পারলো না। এটি তো আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকি। অবাক হয়ে দেখেছি। সরকারের অবস্থান দুর্বল বলেই কিছু করতে পারেনি। রোহিঙ্গা প্রশ্নে সরকার টোটালি ব্যর্থ।

জাগো নিউজ : নির্বাচন সুষ্ঠু হবে- এমন আশা কি করছেন? যদি আশাবাদী হন, তা কিসের ভিত্তিতে?

কামাল হোসেন : আশা তো রাখতেই হয়। তবে সরকারের ওপর নির্ভর করে এমন আশাবাদ ব্যক্ত, বোকামি-ই হবে।

kamal-03

জাগো নিউজ : তাহলে কিসের ওপর নির্ভর করে আশা রাখছেন?

কামাল হোসেন : জনগণের ওপর নির্ভর করে আশা রাখছি। সুষ্ঠু নির্বাচনের তো দাবি উঠেছে। তত্ত্বাবধায়ক না হলেও অন্য ফরমেটের বিধান আসতে পারে। যারা নির্বাচন পরিচালনা করবেন, তারাই প্রার্থী হলে তো সুষ্ঠু হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না।

জাগো নিউজ : নির্বাচিত সরকারের অধীনেই নির্বাচন হওয়ার বিধান রয়েছে…

কামাল হোসেন : সে বিধান তো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। নির্বাচিত সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি বলেই ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলেছিল আওয়ামী লীগ। দাবি পূরণের মধ্য দিয়েই ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসেছিল তারা। ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তো সবার সামনেই পরিষ্কার। ঠিক ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনও।

জাগো নিউজ : সংবিধানের প্রণেতা আপনি। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা তো সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল?

কামাল হোসেন : প্রয়োজনেই এসেছিল তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা। সরকার তার নিজের স্বার্থে এই ব্যবস্থা বাতিল করলো। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা তুলে রাষ্ট্রের বড় ক্ষতি করেছে সরকার।

সরকারের উচিত ছিল নিজে থেকেই আদালতে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নেয়া। তত্ত্বাবধায়ক শব্দ বাদ দিয়ে আপনি ভিন্ন নামে কিছু করতে পারতেন। নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য কিছু একটা করার দায় ছিল সরকারেরই। তা না করে তারা সব ব্যবস্থা ধ্বংস করলো।

জাগো নিউজ : এই পরিস্থিতির শেষ কোথায়?

কামাল হোসেন : জনগণ এর শেষ নির্ধারণ করবে। এভাবে চলতে পারে না। আমরা ভেবেছিলাম, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যে জালিয়াতি হলো তার প্রতিবাদে মানুষ মাঠে নামবে। হয়তো মানুষ সাহস বা কারও ওপর ভরসা পায়নি। কাউকে না কাউকে তো ভরসা দিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

এএসএস/এমএআর/পিআর

তত্ত্বাবধায়ক না হলেও অন্য ফরমেটের বিধান আসতে পারে

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা তুলে রাষ্ট্রের বড় ক্ষতি করেছে সরকার

পেশিশক্তির কাছে নির্বাচন কমিশন জিম্মি