যন্ত্রণায় শুধু কাঁদছে শাহাদত

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:০৭ পিএম, ১০ নভেম্বর ২০১৮

মা অন্য কাজে ব্যস্ত। তাই নিজেই রান্না ঘরে গিয়েছিল ডিম ভাজতে। কিন্তু গ্যাসের চুলা জ্বালাতেই মুহূর্তেই গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফরণে ঝলসে যায় ১৬ বছর বয়সী শাহাদত হোসেনের শরীর। গলা থেকে পেট পর্যন্ত দগ্ধ হয় তার।

এ দুর্ঘটনাটি ঘটে গত ১৯ অক্টোবর গাজীপুরের টঙ্গীতে। এরপর থেকেই সে চিকিৎসা নিচ্ছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে।

বার্ন ইউনিটের পাঁচতলায় অতিরিক্ত ১৮ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছে সে। পোড়া শরীরে যন্ত্রণায় সব সময় ছটফট করে এবং অঝরে কাঁদে শাহাদত। পাশেই বসা তার দাদি। মা-বাবাও সন্তানের আর্তনাদে আড়ালে চোখের পানি মুছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে গেলে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। কারণ চাহিদার জোগানে বাজারে সরবারহ বেড়েছে মানহীন এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাসের। এতে দিন দিন বাড়ছে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা। সেই সঙ্গে আগুনে পুড়ে মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে হরহামেশা।

শাহাদত হোসেনের দাদি জানান, তার নাতি শাহাদাত ১০ম শ্রেণির মেধাবি ছাত্র। তাদের বাড়ি গাজীপুরের টঙ্গীতে। স্কুল থেকে এসে সে ডিম ভাজতে গিয়ে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে এমন মর্মান্তিকভাবে আহত হয়। এরপর থেকেই ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নিচ্ছে। প্রথমে কিছু দিন আইসিইউতে থাকতে হয়। এখন বেডে নিয়ে আসা হয়েছে। সারাদিন সে শুধু পোড়ার যন্ত্রণায় ছটফট করে, আর কাঁদে। ফ্যান দিয়ে বাতাস দিতে হয় সব সময়। ঠিকমতো শরীর নড়া-চড়া করতে পারে না।

কাঁদতে কাঁদতে শাহাদত বলে, আমার পরীক্ষা আর দেয়া হলো না। এসএসসির মডেল টেস্ট হচ্ছিল। তার মধ্যেই এমন দুর্ঘটনা। ঝলসে যাওয়া শরীর নিয়ে ঠিকমতো শুতে বসতেও পারি না।

শাহাদতের বাবা ওলিউর রহমান বলেন, ‘আমি কারেন্টের কাজ করি। একবার দুর্ঘটনায় আমার এক হাত অচল হয়ে গেছে। অভাবের সংসার। এরমধ্যে ছেলের এ অবস্থা। ধার দেনা করে চিকিৎসা চালাচ্ছি। গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ যে এত ভয়াবহ তা বুঝলাম ছেলের পরিনতি দেখে। সারাদিন শুধু যন্ত্রণায় কান্নাকাটি করে। তার কষ্ট দেখে আমরাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না।’

জানতে চাইলে মা শাহিদা বেগম শুধুই চোখের পানি ফেলেছেন। তেমন কিছু বলতে পারেননি।

রান্না করতে গিয়ে তীব্র গ্যাস সঙ্কট বা যেসব এলাকায় গ্যাস সংযোগ নেই সেসব এলাকায় সিলিন্ডার গ্যাসই একমাত্র ভরসা। ভরসা করতে গিয়ে প্রায়ই ঘটছে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা। দগ্ধ হয়ে কেউ কেউ প্রাণ হারাচ্ছেন। আর যারা আহত হচ্ছেন তাদের চিৎকার-আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠছে হাসপাতালের পরিবেশ।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে গ্যাসে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে ১৫৬টি। এর মধ্যে রাজধানীতে দুর্ঘটনা ঘটছে ৩৭টি আর ঢাকার বাইরে দুর্ঘটনা ঘটেছে ১১৯টি। এসব দুর্ঘটনার মধ্যে গ্যাস লাইনে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে ৭৬টি আর গ্যাস সিলিন্ডারে অগ্নিকাণ্ড ৮০টি। এসব অগ্নিকাণ্ডে আহত হন ৩৬ জন। পরের বছরই গ্যাস দুর্ঘটনা বেড়েছে। ২০১৬ সালে গ্যাসে অগ্নিকাণ্ড বেড়ে দাঁড়ায় ১৯৬টি। এর মধ্যে রাজধানীতে দুর্ঘটনা ঘটে ৪০টি আর ঢাকার বাইরে দুর্ঘটনা হয় ১৫৬টি। এসব দুর্ঘটনার মধ্যে গ্যাস লাইনে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে ৬৫টি আর গ্যাস সিলিন্ডারে অগ্নিকাণ্ড ১৩১টি। অগ্নিকাণ্ডে আহত হন ৪১ জন। আর মারা যান ৪ জন। ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্তু গ্যাস লাইনে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে ৫৮টি, গ্যাস সিলিন্ডারে অগ্নিকাণ্ড হয় ৭৯টি। অগ্নিকাণ্ডে আহত হন ৮ জন। আর মারা যান একজন।

এদিকে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের তথ্যমতে, ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে চুলা থেকে সৃষ্ট দুর্ঘটনার সংখ্যা ২৩৮টি, আর গ্যাস লিকেজের জন্য ঘটেছে ৬৫০টি দুর্ঘটনা।

এসব বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আলী আহম্মেদ খান বলেন, ‘পাইপ লাইনে গ্যাস সরবারহ সঙ্কটের কারণে সিলিন্ডারের ব্যবহার বাড়ছে। চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানহীন সিলিন্ডারও বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। এ কারণেই সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও দুর্ঘটনা বাড়ছে। এ ছাড়া সিলিন্ডার ব্যবহারে আমাদের সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতারও অনেক ঘাটতি রয়েছে-এটাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।’

এএস/এনডিএস/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :