সংঘাত এড়াতে প্রয়োজন ‘দৃশ্যমান ব্যবস্থা’

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:১৮ এএম, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘাত, সহিংসতা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সরকার ও কমিশনের পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণে নির্বাচনী মাঠে বিরোধীপক্ষের অবস্থান দূরহ হতে পারেও বলে মনে করছেন তারা।

নির্বাচন কমিশন যথাযথ ব্যবস্থা নিতে না পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে বলেও শঙ্কা কারও কারও। এজন্য এখনই ‘দৃশ্যমান ব্যবস্থা’ গ্রহণের দাবি সমাজের বিশিষ্টজনদের।

নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ১৫ দিন। দিন যাচ্ছে, রাজনীতির উত্তাপ তত বাড়ছে। গত ১০ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংহিসতার খবর আসছে। গত ক’দিনে সংহিসতার পাশাপাশি বেশ কয়েকজন নিহতও হয়েছেন। সরকারি দলের সঙ্গে বিরোধী জোটের নেতাকর্মীদের এহেন সংঘাতের ঘটনা ঘটলেও নিজ নিজ দলের মধ্যকার অন্তঃকোন্দলের জেরেও অস্থিরতা বাড়ছে।

এমন পরিস্থিতিতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের দাবি জোরালো হলেও বিরোধী পক্ষের জন্য মাঠ ক্রমশই অমসৃণ হয়ে পড়ছে। অভিযোগ উঠেছে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে প্রতিদিন। রাজনৈতিক মামলা হচ্ছে এখনও। ধানের শীর্ষ প্রতীকের প্রার্থীদের পর্যন্ত গ্রেফতার করার অভিযোগ উঠেছে। হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে ঐক্যফ্রন্ট প্রধান ড. কামাল হোসেন এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়িবহরেও।

নির্বাচনের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে মতামত জানতে চাওয়া হয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ঢাবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ, আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এবং সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের কাছে।

অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ বলেন, পরিস্থিতি নির্ভর করছে সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনের ওপর। দুঃখজনক এ তিনটি পক্ষই এখন এক হয়ে কাজ করছে। সরকার সহিষ্ণু হবে বলে আপাতত মনে করার কোনো কারণ নেই। নইলে ড. কামালের গাড়িবহরে এভাবে হামলা হতে পারে না। আওয়ামী লীগ প্রধানের গাড়ি বহরে হামলা যেমন কাম্য হতে পারে না, তেমনি ড. কামাল হোসেনের গাড়ি বহরেও নয়।

‘নির্বাচন সুষ্ঠু হোক, সরকার তা চাইছে না’- উল্লেখ করে বিএনপি ঘরোনার এ বিশ্লেষক বলেন, পরিস্থিতি যে দিকে গড়াচ্ছে, তাতে সংঘাত আরও বাড়তে পারে। পুলিশ বিরোধী পক্ষকে হয়রানি করতে বেপরোয়া। নির্বাচন কমিশন দেখেও না দেখার ভান করছে। এভাবে চলতে থাকলে কিছুই নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।

সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য কমিশনকে এখনই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেন অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তিনি বলেন, ‘যা করার নির্বাচন কমিশনই করবে। সব কিছুই এখন কমিশনের অধীনে থাকার কথা। কেন সংঘাত হচ্ছে, কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না- তার দায় কমিশনের।’

তিনি বলেন, ‘মানুষ এখন নির্বাচনমুখী। সারাদেশে ভোটের আমেজ বিরাজ করছে। এ পরিবেশ কোনোভাবেই নষ্ট করা ঠিক হবে না। সহিংসতার সঙ্গে প্রার্থী বা তৃতীয় কোনো শক্তি জড়িত থাকলে কমিশনকে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে না পারলে অস্থিরতা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছি।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘নির্বাচন ঘিরে যা ঘটছে, তা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। বল এখন নির্বাচন কমিশনের কোর্টে। কিন্তু কমিশন তার দায়িত্ব নিয়ে উদাসীন বলে মনে হচ্ছে।’

‘শত অভিযোগ আসছে, অথচ কোনো প্রকার ব্যবস্থা নিতে দেখছি না এখন পর্যন্ত। সরকার দায় নেবে না- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নির্বাচন কমিশন তো দায় এড়াতে পারে না। প্রার্থীরা সুরক্ষা পাচ্ছে না। প্রার্থীদের গ্রেফতারে অবাক হচ্ছি।’

‘নির্বাচন সুষ্ঠু করা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নির্বাচন সুষ্ঠু করার। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না- এ অভিযোগ পুরনো। অথচ সেই অভিযোগ খণ্ডানোর দায়িত্ব নিলো সরকার। এটিকে টেস্ট কেস মনে করা যেতেই পারে। কিন্তু ভোট সুষ্ঠু না হলে সাধারণ মানুষ আর দলীয় সরকারের ওপর আস্থা রাখবে না। এতে সহিংসতা আরও ছড়িয়ে পড়বে।’

সুজন সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘প্রশাসন আর পুলিশ একটি পক্ষ হয়ে সরকারের সঙ্গে মিলে গেছে। আর নির্বাচন কমিশন তাতে সহায়তা করছে। নির্বাচনী মাঠে মূলত দুটি পক্ষ এখন। একটি বিরোধী পক্ষ, আরেকটি পক্ষ হচ্ছে- সরকার, পুলিশ, প্রশাসন আর নির্বাচন কমিশন। এভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না।’

‘বিরোধীদের মাঠছাড়া করে সহিংসতা কমানোর চেষ্টা হতে পারে’- উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জনমত উপেক্ষা করে পরিস্থিতি দীর্ঘদিন সামাল দেয়া যায় না। এতে সংঘাত আরও স্থায়ী হয়। আমরা এখন সেই সংকেত-ই পাচ্ছি।’

এএসএস/এএইচ/এমবিআর

আপনার মতামত লিখুন :