আ.লীগের ইশতেহারে জামায়াত ‘ছাড়’!

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:২৪ পিএম, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮

মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধিতাকারী ধর্মভিত্তিক সংগঠন জামায়াতে ইসলামী প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষনেতা ড. কামাল হোসেন ‘খামোশ’ বলে হুমকি দেন সাংবাদিককে। এর জবাবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘খামোশ বললেই কি মানুষের মুখ খামোশ হয়ে যাবে? খামোশ বললে জনগণ খামোশ হয়ে যাবে না, মানুষকে খামোশ রাখা যাবে না।’ প্রধানমন্ত্রী ড. কামালকে প্রশ্নকারী ওই সাংবাদিককে ডেকে অভয়ও দেন।

নির্বাচন আর জামায়াত প্রসঙ্গ এখনও যেন সমান্তরালে চলছে রাজনীতির মাঠে। ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গ এলেও বিএনপির ১৯ দফা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে স্থান পায়নি জামায়াত প্রসঙ্গ। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে দাবি করা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গ এলেও পরবর্তীতে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ বা অন্যকোনো পদক্ষেপ নেয়া হবে কিনা- সে বিষয়েও কিছু বলা হয়নি।

মহাজোট এবং ঐক্যফ্রন্ট উভয় শিবিরে ‘জামায়াত’ যেন একটি অমীমাংসিত ফ্যাক্টর। অভিযোগ রয়েছে, জমায়াত ইস্যুতে ভর করেই উভয় জোটের রাজনীতি। এক জোট জামায়াতের বিরোধিতা করে, অপর জোট জামায়াতের পৃষ্ঠপোষকতা করে। অথচ নিষিদ্ধের দাবি উঠলেও জামায়াতের বিরোধিতাকারী আওয়ামী লীগ তাদের ইশতেহারে এ ব্যাপারে কিছুই রাখেনি।

নির্বাচন কমিশন জামায়াতের নিবন্ধন এবং প্রতীক বাতিল করলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে দলটিকে নিষিদ্ধ করবে কিনা- তা নিয়ে একটি অক্ষরও লেখা হয়নি ৮০ পৃষ্ঠার ইশতেহারে। অথচ জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি করে বক্তব্য রেখেছেন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিরাও। সংসদেও জামায়াত নিষিদ্ধের প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন মহাজোটের এমপিরা।

স্বাধীনতার পরপরই আওয়ামী লীগ জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসলে জামায়াতের ভাগ্য খুলে যায়। জিয়াউর রহমান সরকারের আমলেই জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলো মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করতে থাকে। এরপর আরেক সামরিক শাসক এরশাদও ইসলামের নাম ভাঙিয়ে রাজনীতিতে বিশেষ ফায়দা নিতে থাকে।

যার ফলশ্রুতিতে জামায়াতও বিশেষ সুবিধা পেতে থাকে। এই সময়ে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন শিবির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একক আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে। তবে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ-বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ কর্মসূচিতে অংশ নেয় জামায়াত। এই সময়ে জামায়াতের পত্তন শক্ত হতে থাকে।

১৯৯১ সালে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় জামায়াতের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। বিএনপি সরকারের বিশেষ আনুকূল্য পেয়ে জামায়াত রাজনীতির ভিত্তি আরও শক্ত করতে থাকে। তবে ১৯৯৬ সালে খালেদা জিয়া সরকারের পতনে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি জামায়াতও আন্দোলন করে। এই সময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করলেও জামায়াত ইস্যুতে অনেকটা নীরবই ছিল আওয়ামী লীগ। ২০০১ সাল বিএনপির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে জামায়াত রাজনীতির মাঠে বিশেষ নিয়ামক হয়ে ওঠে। এই সময়ে সরকারে থেকে রাজনৈতিক এবং সামাজিক ভিত আরও মজবুত করে দলটি।

তবে চারদলীয় জোট সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে গণজোয়ার সৃষ্টি হলে বিপাকে পড়ে জামায়াত। যদিও ১/১১ –এর পর জামায়াত কৌশলী অবস্থান নিয়ে নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। তবে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের বিজয়ের মধ্য দিয়ে জামায়াতের সব কৌশলে ভাটা পড়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণহারা হয় জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরও।
যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ ২০১৩ সালে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার যাবজ্জীবনের সাজায় বিশেষ চাপে পড়ে। সৃষ্টি হয় গণজাগরণ মঞ্চের। তীব্র আন্দোলনের মুখে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সর্বোচ্চ সাজা দেয় সরকার। দাবি ওঠে জামায়াত নিষিদ্ধেরও।

ফের ক্ষমতায় গেলে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয় আওয়ামী লীগ। ২০১৪ সালে ফের ক্ষমতায় এসে পাঁচ বছর পার করেছে আওয়ামী লীগ। জামায়াত প্রশ্নে দফারফা করতে পারিনি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী সংগঠনটি। নির্বাচন কমিশন বাতিল করেছে জামায়াতের নিবন্ধন। দাড়িপাল্লা প্রতীকও হারিয়েছে সংগঠনটি। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে জামায়তকে সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করা হবে কিনা- তার কোনো প্রতিশ্রুতি মেলেনি আওয়ামী লীগের ইশতেহারে।

ক্ষমতায় গেলে জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির প্রতি সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা থাকলেও জামায়াত প্রশ্নে কী অবস্থান থাকবে তার কোনো ইঙ্গিত মেলেনি ক্ষমতাসীন দলটির ইশতেহারে।

জামায়াত নিষিদ্ধের প্রসঙ্গে মতামত জানতে চাওয়া হয় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফের কাছে। তিনি বলেন, ‘জামায়াত ইস্যুতে আওয়ামী লীগের অবস্থান পরিষ্কার। এ নিয়ে ইশতেহারে লেখার কিছু নেই। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে বলেই যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সাজা হয়েছে। এ সাহস আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কেউ দেখাতে পারতো না।’

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে জামায়াত নিষিদ্ধ করবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ প্রশ্নটি ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের করুন। যারা জামায়াতের সঙ্গে রাজনীতি করছেন। আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলমান রেখেছি। এ বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্নের মধ্য দিয়েই জামায়াতের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সঙ্গে। বলেন, ‘জামায়াত ইস্যুতে বিএনপি যেমন রাজনীতি করছে, আওয়ামী লীগও তাই করছে। মূলত জামায়াতকে নিষিদ্ধ না করে আওয়ামী লীগ বিশেষ অনুকম্পা পেতে চাইছে। তাতে লাভ হবে না। জামায়াতের রাজনীতি জিইয়ে রেখে আওয়ামী লীগ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে গোটা জাতিও।

এএসএস/এমএআর/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :