কোথাও নেই ধানের শীষ!

আবু আজাদ আবু আজাদ , নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০৩:৩৫ পিএম, ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮

গতকাল শনিবার সকাল সোয়া ৮টা। চট্টগ্রামের সর্ব উত্তর-পূর্ব প্রান্তের জনপদ রানীর হাটবাজার। সাত সকালেই নৌকার সমর্থকদের একটি মোটরসাইকেল র‌্যালি চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। রানীর হাটবাজারে মহাসড়কের ওপরেই আড়াআড়িভাবে টাঙানো হয়েছে চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনের নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগপ্রার্থী হাসান মাহমুদ চৌধুরীর বেশ কিছু পোস্টার। পাশে রানীর হাট কলেজ এলাকায় টাঙানো ডিজিটাল ব্যানার, কিছু দূর এগোলেই চোখে পড়ে নৌকার নির্বাচনী কার্যালয়।

কিন্তু আশপাশের বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে এ আসনের বাকি পাঁচ প্রার্থী-২০ দলীয় জোটের ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী এলডিপি নেতা মোহাম্মদ নুরুল আলম, ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকে মওলানা নেয়ামতউল্লাহ আশরাফী, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) আম প্রতীকের জিয়াউর রহমান, ইসলামী ফ্রন্টের মোমবাতি প্রতীকের আবু নওশাদ নঈমী ও জেএসডির মশাল প্রতীকে মাহবুবর রহমানের কোনো পোস্টার বা ডিজিটাল ব্যানার কিছুই চোখে পড়লো না।

chittagong

সকাল সাড়ে ৯টা; চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের কেন্দ্রীয় এলাকা রাউজান পৌরসভা। কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন নেই। এখানে রাস্তার দুই পাশে বেশকিছু তোরণ রয়েছে। প্রতিটি তোরণের মুখে এ আসনের আওয়ামী লীগপ্রার্থী ফজলে করিম চৌধুরীর নৌকা প্রতীকের একটি করে ডিজিটাল ব্যনার ও পাশে পোস্টার রয়েছে। পুরো বিষয়টিতে একটি পরিকল্পনার ছক লক্ষ্য করা যায়। এর বাইরে বিক্ষিপ্তভাবে কোনো ব্যানার কিংবা পোস্টার সাঁটাতে বা দড়িতে ঝুলতে দেখা যায়নি।

অথচ এ আসনে আরও দুজন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন- বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী জসীম উদ্দিন সিকদার ও ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী আবদুল আলী। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, দেশের ২৯৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের পোস্টারে চট্টগ্রাম শহরসহ বিভিন্ন উপজেলা ভরে গেলেও রাউজান পৌরসভা বা গহিরার কোথাও তাদের পোস্টার দেখা যায়নি। এছাড়া পুরো এলাকা ঘুরে যে কারও মনে হতে পারে, এ আসনে বিএনপি হয়তো নির্বাচনই করছে না।

chittagong

রাউজান অতিক্রম করে হালদা ব্রিজের রাউজান অংশে দেখা গেলো, নৌকা প্রতীকের বিশাল তোরণ। হালদা পার হওয়ার পর অবস্থার অনেকটা পরিবর্তন হলো। এখানে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে মহাজোটের প্রার্থী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ চৌধুরীর লাঙ্গল প্রতীকের পাশাপাশি ইসলামি ঐক্যজোটের মিনার প্রতীকের প্রার্থী মঈন উদ্দিন রুহী, খেলাফত আন্দোলনের বটগাছ প্রতীকের প্রার্থী মীর ইদরীস, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের চেয়ার প্রতীকের প্রার্থী ছৈয়দ হাফেজ আহমদ, ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মোহাম্মদ রফিক, ইসলামি ফ্রন্টের মোমবাতি প্রতীকের প্রার্থী নঈমুল ইসলাম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের খেজুর গাছ প্রতীকের প্রার্থী নাসির উদ্দিন ও খেলাফত মজলিসের দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকের প্রার্থী শিহাবুদ্দীনের পোস্টার-ব্যানারের দেখা মিললো। কিন্তু নেই শুধু ২০ দলীয় জোটের ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের কোনো পোস্টার বা ব্যানার।

বেলা সাড়ে ১০টায় হাটহাজারী ডাকবাংলো এলাকায় পৌঁছে প্রথমবারের মতো চোখে পড়লো ধানের শীষের বিক্ষিপ্ত কিছু পোস্টার, যার অধিকাংশই ছিঁড়ে দড়িতে ঝুলছে। হাটহাজারী (চট্টগ্রাম-৫) আসনে মাহাজোট-বিএনপির চাইতে প্রচার-প্রচারণায় বেশ এগিয়ে আছে ইসলামী দলগুলো। বিশেষ করে ইসলামি ফ্রন্টের মোমবাতি ও ইসলামি ঐক্যজোটের মিনার প্রতীকের প্রার্থী মঈন উদ্দিন রুহীর প্রচারণা ছিল চোখে পড়ার মতো। পুরো হাটহাজারী বাজার এলাকায় খুব কম সংখ্যক, অপরিকল্পিতভাবে লাগানো কিছু ধানের শীষের পোস্টার চোখে পড়ে। অথচ হাটহাজারীকে মনে করা হয় বিএনপির ঘাঁটি!

chittagong

বেলা সাড়ে ১১টা; চট্টগ্রাম নগরের অক্সিজেন মোড়। এখানে এসে দেখা যায়, মোড়ের উত্তর-পশ্চিম অংশ পড়েছে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে, দক্ষিণ-পূর্ব অংশ চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চাদগাঁও) ও বায়েজিদ থানার কিছু অংশ পড়েছে চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং) আসনে। মোড়ের চারদিক বিভিন্ন আসনের বিভিন্ন প্রার্থীর পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে গেছে। কিন্তু এখানেও অনুপস্থিত তিনটি আসনের তিন বিএনপি প্রার্থীর পোস্টার।

দুপুর ১২টা; চট্টগ্রাম নগরের মির্জারপুল এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শন। পুলের পূর্বপাড়ের পুলের উত্তর অংশ চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চাদগাঁও) ও দক্ষিণ অংশ চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং) আসনের আওতাধীন। এখানে পুলের দুই পাশ দিয়ে দুটি রাস্তা চলে গেছে শুলকবহর আবাসিকে। দুই রাস্তার মুখেই চোখে পড়ে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চাদগাঁও) আসনের বিএনপিপ্রার্থী আবু সুফিয়ান ও চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং) আসনের বিএনপিপ্রার্থী আব্দুল্লাহ আল নোমানের ধানের শীষ প্রতীকের বেশকিছু পোস্টার ও ডিজিটাল ব্যনার। পাশেই রয়েছে তাদের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী মহাজোটের মহিউদ্দিন খান বাদল ও আওয়ামী লীগের ডা. আফছারুল আমীনের নৌকা প্রতীকের পোস্টার ও ডিজিটাল ব্যানার।

chittagong

পরের এক ঘণ্টা চট্টগ্রাম নগরের সবচেয়ে প্রেস্টিজিয়াস আসন কোতোয়ালির বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে দেখা যায়, সেখানে আওয়ামী লীগপ্রার্থী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের নৌকা প্রতীকের পোস্টার ও ডিজিটাল ব্যনারে একপ্রকার ছাড়াছড়ি অবস্থা। এছাড়া সিপিবির কাস্তে প্রতীকের প্রার্থী মৃণাল চৌধুরী ও ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী শেখ আমজাদ হোসেনের বেশকিছু পোস্টারও লক্ষ্য করা যায়।

বেলা ২টার দিকে নগরের ব্যস্ততম এলাকা নিউমার্কেটে জাতীয় পার্টির (জেপি) বাইসাইকেল প্রতীকের প্রার্থী মোরশেদ সিদ্দিকীর কিছু পোস্টার চোখে পড়ে। অবাক করা বিষয় হলো, নগরের নূর আহমদ সড়কে বিএনপির কার্যালয়। সেখানে ধানের শীষের চাইতে নৌকা প্রতীকের ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের পোস্টারই বেশি। এ আসনে বিএনপিপ্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনের কিছু পোস্টার ও ডিজিটাল ব্যানার দেখা গেলেও তা ছিল একেবারেই নগণ্য ও বিক্ষিপ্ত। তবে চট্টগ্রামের আদালত পাড়ায় বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টপ্রার্থীদের বেশকিছু প্রচারণা চোখে পড়ে। যা মূলত আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে করা হয়েছে।

chittagong

মিরসরাই (চট্টগ্রাম-১) আসনের ভোটার জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনের ধুমঘাট ব্রিজ থেকে বারইয়ারহাট, জোরারগঞ্জ, মস্তাননগর, মিঠাছড়া হয়ে মিরসরাই সদর পর্যন্ত ঘুরেছি। সর্বত্রই নৌকা প্রতীকের হাজার হাজার পোস্টার। ভোর থেকে গভীর রাত অবধি আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও নেতাদের প্রচারণা চলে। অন্যদিকে, বিএনপির কোনো তৎপরতাই চোখে পড়েনি। কোথাও ধানের শীষ প্রতীকের একটি পোস্টারও নেই।’

কর্ণফুলি (চট্টগ্রাম-১৩) এলাকারা বাসিন্দা মিজানুর রহমান জানান, তার এলাকাতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে।

chittagong

এদিকে নির্বাচনের বাকি যখন আর মাত্র ছয়দিন, তখন বিএনপি বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বড় ধরনের বা পরিকল্পিত কোনো প্রচার-প্রচারণা দেখতে না পেয়ে কিছুটা চিন্তায় আছেন খোদ আওয়ামী লীগ নেতারা। এটি বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্টের কৌশল না দুর্বলতা- সে প্রশ্ন ভাবিয়ে তুলছে তাদের।

আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গণমাধ্যমে বিএনপি একতরফা ভাবে অভিযোগ করে যাচ্ছে যে, তারা প্রচারণা চালাতে পারছে না। কিন্তু তাদের মাঝে প্রচারণার চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে না। ব্যানার-পোস্টার লাগালে তা ছিঁড়বে আবার লাগাবে- এটাই তো আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কিন্তু এবার বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট আসলে কী চাচ্ছে তা বোঝা কঠিন হয়ে উঠেছে।

chittagong

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিএনপি মূলত নির্বাচনে এসেছে নিজেদের দলীয় নিবন্ধন বাঁচানোর জন্য। তারা জানে ভোটের লড়াইয়ে পারবে না। তাই শুরু থেকেই নির্বাচন কমিশনসহ পুরো নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে উঠেপড়ে লেগেছে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট। তারা তো পোস্টারই লাগাচ্ছে না, ছেঁড়ার প্রশ্ন আসে কীভাবে!’

প্রচারণায় না থাকা কি বিএনপির কৌশল- এমন প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম আমিন বলেন, ‘হতে পারে ...বোঝা যাচ্ছে না। তবে তারা বারবার যে হামলার কথা বলছে, তা নিছক অভিযোগই নয়। নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করতে পরিকল্পিতভাবে তারা এ অপপ্রচার চালাচ্ছে। অথচ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অফিসে হামলার ঘটনা ঘটছে। সর্বপ্রথম তারাই আমাদের দুই নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে।’

chittagong

চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের প্রচার সম্পাদক মাহবুবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা কীভাবে প্রচারণায় নামবো, পোস্টার-ব্যানার লাগাবো? এখন পর্যন্ত আমাদের (চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপিপ্রার্থী) প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে দু’দফা হামলার ঘটনা ঘটেছে। অথচ পুলিশের ভূমিকা দর্শকের চাইতে বেশিকিছু নয়। সকালে পোস্টার লাগালে বিকেলে তা থাকছে না। মাইকিংয়ে গিয়ে ছেলেরা মারধরের শিকার হচ্ছে। সর্বশেষ গতকালের হামলায় দুজন আহতসহ প্রচারে ব্যবহৃত ১০টি মোটরসাইকেল ও তিনটি গাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।’

chittagong

এদিকে, চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-চন্দনাইশ) আসনে ধানের শীষের প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্ট জাফর সাদেক অভিযোগ করেন, প্রতিদিন পুলিশ গিয়ে বিনা ওয়ারেন্টে নিরীহ কর্মীদের গ্রেফতার করছে। ধানের শীষের কর্মীদের বাড়িতে পুলিশ ও সন্ত্রাসী পাঠিয়ে প্রকাশ্যে হুমকি দেয়া হচ্ছে। এওচিয়া ইউনিয়নে ধানের শীষের মাইকিংয়ের সময় কর্মী ও ড্রাইভারকে মারধর করে গাড়ি আটকে রেখেছে। এ কারণে কৌশলের অংশ হিসেবে ধানের শীষের প্রচারণা চলছে ‘ম্যান বাই ম্যান’ ও ‘ডোর টু ডোর’পদ্ধতিতে।

chittagong

তবে চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী দাবি করেন, ‘প্রশাসন তার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। তাই ধানের শীষ কেন, প্রতিযোগিতায় আছে এমন কাউকেই ক্ষমতাসীনরা প্রচার-প্রচারণার সুযোগ দিতে নারাজ। বাঁশখালীতে লাঙ্গল প্রতীক নৌকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, এ কারণে সশস্ত্র ক্যাডাররা প্রকাশ্য দিবালোকে মিছিলে-সভায় গুলি করছে।’

আবু আজাদ/এমএআর/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :