দখলদারের নিষ্ঠুর নিয়মের বলি ৯ তাজা প্রাণ

আবু আজাদ
আবু আজাদ আবু আজাদ , নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০৩:৪৮ পিএম, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

কর্ণফুলী বাঁচাতে চলতি মাসের ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে সদরঘাট এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে জেলা প্রশাসন। এরপর থেকে চাক্তাই এলাকার বস্তিবাসীরা অনত্র চলে যাওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করেন। কিন্তু দখলদার ওয়ার্ড যুবলীগের সহ-সভাপতি আকতার ওরফে কসাই আকতারের নিয়োগ করা তথাকথিত জমিদাররা বস্তিবাসীদের যেতে বাধা দেয়। বাসাছাড়ার জন্য জুড়ে দেয় নানা শর্ত। সেই নিষ্ঠুর নিয়মের মারপ্যাঁচে সপ্তাহের ব্যবধানে পুড়ে অঙ্গার হয় নয়টি তাজা প্রাণ।

সোমবার সকালে পুড়ে যাওয়া বস্তিতে গিয়ে দেখা যায়, এখনও কেউ কেউ পুড়ে যাওয়া ভিটেতে খুঁজে ফিরছেন জীবনের শেষ সম্বলটুকু। কেউ বলছেন, কম্বলের ভাঁজে টাকা ছিল, কেউ আবার খুঁজছেন মাটির ব্যাংকটি। শেফালী নামের এক অষ্টাদশী জানান, নিজের বিয়ের জন্য গত মাসেই গড়িয়েছিলেন সোনার গলার হার। সেটাই খুঁজছেন, যদি পাওয়া যায়!

সহায়-সম্বল হারানো বস্তিবাসীদের অধিকাংশই পাশের বস্তি বা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে ছিলেন গত রাত। কেউ কেউ আবার পোড়া ভিটের ওপরে ছাপড়া টেনে রাত কাটিয়েছেন। সেই ছাপড়াতে সকালে বসে নাস্তা করছিলেন শাহিনুর-সোনিয়ারা। পাশেই তখন লুডু খেলায় ব্যস্ত কিশোরী তামান্না-নার্গিস। জানা গেল, তাদের সবাই পোশাক শ্রমিক। বস্তিতে বাসাভাড়া নিয়ে থাকতেন।

jagonews

কসাই আখতারের ‘জমিদারি ব্যবসা’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৯-২০০০ সালের দিকে কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী রাজাখালী খালের চর দখল করে গড়ে তোলা হয় নতুন বস্তি। সে সময় এ বস্তি গড়ে তোলায় নেতৃত্ব দেন যুবলীগের ক্যাডার আকতার ওরফে কসাই আকতার। যিনি বর্তমানে ৩৫নং বকশিরহাট ওয়ার্ড যুবলীগের সহ-সভাপতি। পরে বিএনপি সরকারের আমলে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ম্যানেজ করে চলে কসাই আকতারের দখল বাণিজ্য। গত ১০ বছরে আরও ফুলে-ফেঁপে ওঠে কসাই আকতারের ‘জমিদারি’ ব্যবসা।

সূত্র জানান, ভেড়া মার্কেট বস্তিতে কসাই আখতার ব্রিটিশ আমলের ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘জমিদারি প্রথা’। স্থানীয় সাত্তার, হেলাল, ফরিদ, বেলালসহ কয়েকজনকে বস্তির ভাড়াটিয়াদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেন। তাদের নাম জমিদার! সেই নামেই বিশাল নদীর চরে গড়ে উঠেছে ফরিদ কলোনি, সাত্তার কলোনির মতো বস্তি।

কর্ণফুলী নদীর তীর থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য যেসব জায়গা চিহ্নিত হয়েছে এর মধ্যে চাক্তাইয়ের ভেড়া মার্কেট সংলগ্ন বস্তিও আছে। উচ্ছেদ অভিযানের তৃতীয় ফেইজে পড়েছে এ এলাকা। কর্ণফুলীতে উচ্ছেদ শুরুর পর জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা গিয়ে একাধিকবার বস্তির বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

বাসা ছাড়তে লাগে দুই মাসের অগ্রিম ভাড়া

বস্তিবাসীরা জানান, এ মাসের শুরুতে সদরঘাট এলাকায় জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলে বস্তিবাসীরা চলে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তথাকথিত জমিদার তথা কসাই আখতারের এজেন্টরা তাদের জানান, এ জায়গার ওপর হাইকোর্টের ‘স্টে অর্ডার’ আছে। তাই এ বছর বস্তি ভাঙছে না। তাদের কথার সমর্থনে বস্তির পাশেই বিদ্যুতের খুঁটিতে টাঙানো হয় তথাকথিত ‘স্টে অর্ডার’ নোটিসের কপি।

jagonews

এরপরও বস্তিবাসী বাসা ছাড়তে চাইলে জমিদাররা তাদের কাছে দুই মাসের অগ্রিম ভাড়া জমা দিতে বলেন। এ অবস্থায় তারা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মারধরের হুমকি দেন তারা।

বেলাল কলোনির বাসিন্দা ছিলেন মাহিনুর। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘সবাই যখন বলাবলি করছিল বস্তি ভেঙে ফেলবে, তখন আমরা চলে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু জমিদার বেলাল আমাদের যেতে দেয়নি। তার উদ্দেশ্য ছিল ১০ তারিখের পর দুই মাসের ভাড়া নিয়ে আমাদের বের করে দেবে। আমি এক মাসের ভাড়া দিয়ে মালপত্র গুছিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু গত শুক্রবার জমিদার আমাদের জানায়, তিনি হাইকোর্টে মামলা করেছেন, বস্তি ভাঙছে না। আমরা আবারও ঘর পাতলাম শনিবার দুপরে, কিন্তু রাতের আগুনে সব শেষ।’

ছিল বহিরাগতদের উৎপাত

বস্তিবাসীদের অভিযোগ, রাত-বিরাতে বস্তিতে নানা ধরনের মানুষের আনাগোনা ছিল। সঙ্গে ছিল চোরের ভয়। তাই জমিদারের কথায় রাতে দরজায় তালা দিয়ে ঘুমাতো বস্তিবাসীরা। অগ্নিকাণ্ডের রাতে যখন ঘরে আগুন লাগে তখন সবাই গভীর ঘুমে ছিলেন। তাড়াহুড়া করে বের হতে গিয়ে দরজায় লাগানো তালার কারণে অনেকে ঘরে আটকা পড়েন। জীবন্ত দগ্ধ হয় নয়টি তাজা প্রাণ।

রোববারের আগুনে মারা যান নাসির কলোনির বাসিন্দা সুফিয়া বেগমের দেবরের স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময় পোশাকে-সাদাপোশাকে পুলিশ আসতো কলোনিতে, পার্টির ছেলেরাও আসতো। নানা সময় নানা ঘটনা ঘটতো। তাই জমিদাররা আমাদের বলেছিল, রাতে যেন ঘরে তালা দিয়ে ঘুমাই। রহিমা ভাবিও তালা দিয়ে ঘুমিয়েছিল কিন্তু তালা দেয়া দরজা না খুলতে পেরে ভেঙে ফেলেন পাশের বেড়া। ছোট্ট জায়গা দিয়ে সবাইকে বের করা সম্ভব হয়নি। পরে দুই সন্তানকে আনতে গিয়ে নিজেই পুড়ে মারা যান।

jagonews

আমাদের লুঙ্গি-শাড়ি-টাকা কই?

‘টিভিতে দেখাচ্ছে, মেয়র আর কোন বড় মন্ত্রী নাকি আমাদের একটা করে লুঙ্গি, শাড়ি আর পাঁচশ করে টাকা দিছে। কিন্তু আমরা তো কিছুই পাই নাই। আমাদের লুঙ্গি-শাড়ি-টাকা কই’- ক্ষোভের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন যুবক মো. হেলাল। নিজের পরনের নতুন লুঙ্গি-শার্ট দেখিয়ে বলেন, ‘এ শার্ট-লুঙ্গি কেউ দেয় নাই, নিজের টাকায় কিনছি। রাতে কোথায় থাকি কেউ খোঁজ নেয় নাই। আত্মীয়র বাসায় ছিলাম। রাতে কারা যেন এক পোটলা করে বিরানি দিছে, আমারা খাই নাই।’

সাংবাদিক দেখে বস্তিবাসী সাবরিনা এক পোটলা বিরিয়ানির প্যাকেট হাতে এগিয়ে এলো। বললো, ‘সারাদিনই ভুখা। রাত সাড়ে ১১টার দিকে পাঁচজনের জন্য দুই পোটলা বিরানি দিছে। আমরা খাই নাই। এই দেহেন হেই বিরানি এহনো আছে। আমরা পাউরুটি খাইয়া খোলা আকাশে রাত কাটাইছি।’

স্ত্রী-সন্তান হারানো সুরুজ মিয়া জানান, তিনি জেলা প্রশাসনের দেয়া অর্থ পেয়েছেন।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম নগরের চাক্তাই এলাকার ভেড়া মার্কেট বস্তিতে গত শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে আগুন লাগে। এতে প্রায় ২০০ ঘর পুড়ে যায়। আগুনে পুড়ে মারা রহিমা আক্তার (৫০), তার মেয়ে নাজমা (১৪), ছেলে মো. জাকির (৯), মেয়ে নাসরিন (৪), আয়েশা আক্তার (৩৭), তার বোনের ছেলে মো. সোহাগ (১৮), হাসিনা আক্তার ও অজ্ঞাত দুজন। ধারণা করা হচ্ছে অজ্ঞাত একজনের লাশ আয়েশা আক্তারের মেয়ের।

গতকাল অগ্নিকাণ্ডের ওই ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেন জেলা প্রশাসক। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাশহুদুল কবীরকে আহ্বায়ক ও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা আলী আকবরকে সদস্য সচিব করে চার সদস্যের এ কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া নিহতদের দাফনের জন্য ২০ হাজার টাকা করে সহায়তার ঘোষণা দেন জেলা প্রশাসক।

আবু আজাদ/এমএআর/আরআইপি