উনি একজন সচিব, চাকরি দেন সব দফতরে!

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:৩২ পিএম, ১৮ মার্চ ২০১৯

নাম মাহবুব আলম (ছদ্মনাম)। একটি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব! কম-বেশি যতগুলো সরকারি দফতরে নিয়োগের সার্কুলার হয় তার সব কটিতে চাকরি দেয়ার ক্ষমতা আছে তার!

চাকরি দেয়ার জন্য উনি ‘ফি’ চান সাত লাখ টাকা। দুই লাখ ৫০ হাজারের নিচে নামেন না। অগ্রিম এক থেকে দেড় লাখ টাকা নেন। বাকিটা চাকরি হলে। ‘চাকরি না হলে টাকা ফেরত’ বলে প্রত্যাশীদের আশ্বস্ত করেন।

কথা ঠিকই রাখেন এই সহকারী সচিব! চাকরি না হলে আর টাকা চান না। কারণ টাকা নেয়ার পর তাকে আর খুঁজেও পাওয়া যায় না। কখনও এলাকা ছাড়া, কখনও দেশ থেকে পালিয়ে যান তিনি।

সম্প্রতি ডিবির গোয়েন্দা জালে আটকে যান কথিত এই সহকারী সচিব। তার আসল নাম রনি আমিন। বয়স ৪৫। আইনি ভাষায় তার পেশা ‘প্রতারণা’। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ফুলবাড়িয়া সদর দফতরের বাইরে থেকে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি তাকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারের পর অদ্ভূত কিছু তথ্য জানতে পারেন তদন্ত কর্মকর্তারা। কথিত ওই সচিব চাকরির দফতর বুঝে টাকা নেয়ার স্থান নির্ধারণ করেন। যখন বিআরটিএ’তে চাকরির সার্কুলার হয় তখন মিরপুরের বিআরটিএ কার্যালয়ের ভেতর থেকে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে টাকা নেন। যখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্কুলার হয় তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকে টাকা নেন।

এত সহজে তাকে ধরা সম্ভব হয়নি। ঘটনাটাও একটু ভিন্ন। সম্প্রতি ভুয়া অ্যাপয়নমেন্ট লেটার নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হাজির হন তিন যুবক। সরাসরি কথা হয় প্রকৃত সচিবের সঙ্গে। কিন্তু সবকিছুই ভুয়া হিসেবে ধরা পড়ে।

তিন যুবকের সঙ্গে প্রতারণার বিষয়টি ওই সহকারী সচিব (প্রকৃত) ফোন করে ডিবিকে জানান। এরপর ডিবি সদস্যরা চাকরিপ্রত্যাশী ওই তিন যুবকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ডিবি সদস্যদের কথা অনুযায়ী তিন যুবক কথিত সচিবকে টাকা নেয়ার জন্য ফোন করেন। আসতে বলেন ফায়ার সার্ভিসের দফতরের বাইরে।

২৬ ফেব্রুয়ারি টাকা নিতে এলে তাকে হাতেনাতে ধরেন ডিবি সদস্যরা। তবে এ সময় তার সঙ্গে থাকা দুই সহযোগী ফেরদৌস ও রমজান পালিয়ে যান।

কথিত সচিব রনি আমিনের বাবার নাম আব্দুস সাত্তার। গ্রামের বাড়ি নড়াইলের পাঁচুড়িয়ায়। তিনি ঢাকা শহরের শনির আখড়ার ৪২০/এ নূরপুর ভবনে বসবাস করতেন।

রনি আমিন দ্বারা প্রতারিত অপু কুমার মন্ডল খুলনা দৌলতপুরের বিএল কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্র। তিনি জানান, ফেরদৌস (৩০) নামে আমার এলাকার একজন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরে কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি দেয়ার কথা বলে মাহবুব আলম নামে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কথিত ওই সহকারী সচিবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ফেরদৌস ও কথিত সচিব মাহবুব আমার কাছ থেকে চাকরি বাবদ সাত লাখ টাকা দাবি করেন। আমি দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা দিতে রাজি হই। পরে অবশ্য তাদের প্রকৃত পরিচয় জেনে যাই।

কথিত ওই সচিবকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নেয়া হয়। রিমান্ডে ডিবি জানতে পারে, একের পর এক কুকর্ম এবং তার অপকৌশল।

ডিবির এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, প্রতারণার সঙ্গে তিনি একা জড়িত নন। তাদের একটি চক্র আছে। চক্রের সদস্যরা গ্রাম, ইউনিয়ন পর্যায়ে চাকরিপ্রত্যাশীদের টার্গেট করে টাকার বিনিময়ে চাকরি দেয়ার প্রলোভন দেখান। এ চক্রের মূলহোতা চট্টগ্রামের এক ব্যক্তি। এছাড়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করে পরাজিত হওয়া একটি রাজনৈতিক দলের নেতাও এ চক্রের শীর্ষপদে রয়েছেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির উপ-পরিদর্শক (এসআই) খোরশেদ আলম জাগো নিউজকে বলেন, তারা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে তারা বিভিন্ন ব্যক্তিকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে আত্মসাৎ করেন। আসামিরা বিভিন্ন স্থানে নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচয় দেন।

সম্প্রতি তারা মো. নূর ইসলামসহ আরও কয়েকজনের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ নিয়ে ভুয়া ও জাল নিয়োগপত্র ইস্যু করে প্রতারণা করেন। এমনকি চাকরিপ্রত্যাশীদের সার্টিফিকেট না থাকলে জাল সার্টিফিকেটসহ ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করেন। এ চক্রের মূলহোতা ও পলাতকদের গ্রেফতারে চেষ্টা করছে ডিবি।

সবাইকে গ্রেফতার করে চক্রটির কার্যক্রম নিষ্ক্রিয় করা এবং তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত চার্জশিট দেয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেন এ তদন্ত কর্মকর্তা।

এআর/এমএআর/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :