আজও চালু হলো না ‘নগর’ অ্যাপটি

আবু সালেহ সায়াদাত
আবু সালেহ সায়াদাত আবু সালেহ সায়াদাত , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:১৯ এএম, ১৯ মে ২০১৯

>>মেয়র আনিসুল হক মারা যাওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় অ্যাপটির সেবা
>>নগর সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান পাওয়া যেত অ্যাপটির মাধ্যমে

২০১৬ সালের ২ আগস্ট চালু হওয়া একটি অ্যাপের সেবার কথা ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) এলাকাবাসীর মনে জায়গা করে রেখেছে আজও। অ্যাপটির মাধ্যমে এলাকার রাস্তা, সড়কবাতি, বর্জ্য, ড্রেনেজ, মশা, অবৈধ দখলসহ নানা বিষয়ে অভিযোগ বা মতামত সরাসরি পাঠানো যেত। মোবাইলে ছবি তোলার পর তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যেত। সিটি কর্পোরেশনের প্রধান কার্যালয়সহ বিভিন্ন জোনে থাকা বড় পর্দায় প্রতিটি অভিযোগ ও মতামত দেখা যেত। অভিযোগের প্রকার বিশ্লেষণ করে সিটি কর্পোরেশন সমাধানের যে উদ্যোগ নিত, সেটিও জানা যেত। সমস্যার সমাধান হলে অভিযোগকারীও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নোটিফিকেশনের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারতেন।

বলছিলাম ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) ডিজিটাল মোবাইল অ্যাপ ‘নগর’ অ্যাপের কথা। উদ্বোধন পর মোবাইল অ্যাপটি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ব্যাপক সাড়া জাগায়। নাগরিক সেবাবিষয়ক তথ্য ছাড়াও নগর অ্যাপে বিভিন্ন ফিচার সংযুক্ত ছিল। অ্যাপটির মাধ্যমে এলাকার রাস্তা, সড়কবাতি, বর্জ্য, ড্রেনেজ, মশা, অবৈধ দখল, ঘুষ ও দুর্নীতি অভিযোগ বা মতামত সরাসরি সিটি কর্পোরেশনে পাঠানোর সুযোগ ছিল।

ডিএনসিসি সূত্র জানায়, নগরবাসীর সমস্যাগুলো সরাসরি শুনতে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক অ্যাপটি চালু করার সিদ্ধান্ত নেন। তার নির্দেশনায় তৈরি অ্যাপটি ২০১৬ সালের ২ আগস্ট উদ্বোধন হয়। একই দিনে গুগল প্লে-স্টোরে যুক্ত করা হয় এটি। কিন্তু মেয়র আনিসুল হকের প্রয়াণে অ্যাপটির কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। অ্যাপটি সচল রাখতে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ এরপর নেয়নি ডিএনসিসি। স্পন্সর না পাওয়া এবং এর জন্য সংস্থাটির নিজস্ব অর্থ বরাদ্দ না থাকায় এই সেবা কার্যক্রম চালু রাখতে পারেনি তারা। এরপর থেকে বন্ধ রয়েছে অ্যাপটির সেবা।

২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর ডিএনসিসির মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুতে মেয়র পদটি শূন্য হয়। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুসারে, গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ডিএনসিসির মেয়র পদে উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। একই বছরের ১৪ জানুয়ারি নির্বাচন স্থগিতাদেশের ব্যাপারে দুটি আলাদা পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি নায়মা হায়দার ও বিচারপতি জাফরের দ্বৈত বেঞ্চ ডিএনসিসির মেয়র পদে উপ-নির্বাচন ছয় মাসের জন্য স্থগিতাদেশ দেন।

গত ১৬ জানুয়ারি হাইকোর্ট জানান, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) উপ-নির্বাচনে আর কোনো বাধা নেই। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়রপ্রার্থী আতিকুল ইসলাম মেয়র নির্বাচিত হন। মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকেই প্রতিটি নির্বাচনী জনসভা, জনসংযোগ, সেমিনারে বর্তমান মেয়র আতিকুলে ইসলাম বলেছেন, ‘নির্বাচিত হলে আনিসুল হকের চালু করা অ্যাপটির সেবা তিনি ফের চালু করবেন। নাগরিকদের সেবা দিতে, নাগরিকদের সমস্যা সমাধান করতে টেকনোলজি ব্যবহার করতে চাই। যেখানে সমস্যা চিহ্নিত এবং সমাধান হবে অ্যাপটির মাধ্যমে।’

‘স্মার্ট ঢাকা’ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়ে আতিকুল ইসলাম আরও বলেছিলেন, ‘আপনারাই (নাগরিকরা) মেয়রের ভূমিকা পালন করবেন। যেখানে ময়লা, আবর্জনা, ম্যানহলের ঢাকনা নেই, সঙ্গে সঙ্গে ছবি তুলে নগর অ্যাপে দেবেন। তখন সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বরত কর্মকর্তা তা সমাধানের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সেই সমস্যা যদি সংশ্লিষ্টরা সমাধান না করেন সঙ্গে সঙ্গে মেয়রের কাছে এই বিষয় নোটিফিকেশন-ঘণ্টা বেজে উঠবে। মেয়র সেসব কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসবেন। সেই অ্যাপটির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞরা অ্যাপটি উন্নয়নের কাজ করছেন। সবমিলিয়ে আমি নির্বাচিত হলে সিটি কর্পোরেশনকে একটি জবাবদিহিতামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলব।’

কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি উপ-নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তিন মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। তারপরও চালু হয়নি নগর অ্যাপটি।

সূত্র জানায়, প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের উদ্যোগে অ্যাপটি তৈরি করে ‘টেক ভিশন’ নামে একটি কোম্পানি। কিন্ত এটি দেখভালের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ ও জনবল না থাকায় সেবাটি পরবর্তীতে চালু রাখা সম্ভব হয়নি। কোনো স্পন্সর না পাওয়ায় এবং অ্যাপটি ক্রাশ করার পর আর চালু হয়নি। গুগল প্লে-স্টোর থেকে বিনামূল্যে অ্যাপটি ডাউনলোড ও ইনস্টল করে রেজিস্ট্রেশন করার মাধ্যমে যে কেউ এটি ব্যবহার করতে পারতেন। অ্যাপটি ব্যবহার করতে অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ থাকতে হতো। এ ছাড়া নিরাপত্তাজনিত কোনো সমস্যা হলে জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি তার অবস্থানস্থল ও পাশের মানুষ সম্পর্কে পরিবারের কাছে তথ্য পাঠাতে পারতেন। পাওয়া যেত হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, ক্লিনিক, পুলিশ স্টেশনসহ অন্যান্য সেবা সংস্থার তথ্য। যাত্রার শুরুতেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া এই অ্যাপটি গুগল প্লে-স্টোরে যাওয়ার পর ১০ হাজার বার ডাউনলোড হয়েছিল সে সময়।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন আওতাধীন মিরপুর এলাকার বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেন, ‘একজন নাগরিক হিসবে সেবাবিষয়ক অভিযোগ জানাতে কার্যকরী একটি মাধ্যম ছিল নগর অ্যাপটি। কোথাও রাস্তায় ময়লা-অবর্জনা, ড্রেনেজ সিস্টেমের কারণে জলবদ্ধতা, সড়কবাতি, মশার অত্যাচার-এসব বিষয়ে ছবিসহ অভিযোগ জানানো হলে তাৎক্ষণিক এগুলো সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হতো। কিন্তু নাগরিকবান্ধব এমন একটি অ্যাপ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা নাগরিকরা আসলেই খুবই কষ্ট পেয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘নতুন যিনি মেয়র হয়েছেন তিনি নির্বাচিত হওয়ার আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি এই অ্যাপ আবার চালু করবেন। সে কারণে আমরা ডিজিটাল যুগের সাধারণ নাগরিক হিসেবে অপেক্ষায় আছি কবে অ্যাপটি চালু হবে।’

তবে আশার কথা, অ্যাপটিতে আরও নতুন নতুন ফিচার যুক্ত করে সার্বিকভাবে কাজ করাতে উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন। বর্তমান মেয়রের তত্ত্বাবধানে নতুন নতুন ফিচারসহ অ্যাপটি চালু করতে যাচ্ছে ডিএনসিসি। কাজ শেষে খুব শিগগিরই অ্যাপটি চালু করবে তারা।

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সিস্টেম অ্যানালিস্ট মোহাম্মাদ আবুল কাশেম জাগো নিউজকে বলেন, ‘অ্যাপটি কার্যকর করতে বর্তমান মেয়রের তত্ত্বাবধানে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। মেয়রের নির্দেশে অ্যাপটি আরও নতুন নতুন ফিচার, সেবা চালু করতে কাজ চলছে। ইতোমধ্যে এ বিষয় নিয়ে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে। আশা করা যায়, খুব শিগগিরই আমরা এই অ্যাপটি চালু করতে পারব।’

এএস/এসআর/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :