আমাদের এখন নতুন করে শুরু করতে হবে

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:০২ পিএম, ০৮ আগস্ট ২০১৯

অধ্যাপক মলয় ভৌমিক। বিশিষ্ট নাট্যকার, রাজনীতিক ও সমাজ বিশ্লেষক। অধ্যাপনা করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগে। লিখছেন সমাজের নানা প্রসঙ্গ নিয়েও। সম্প্রতি রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতির মতো বিষয় নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। বলেন, ক্ষমতার বলয়কে কেন্দ্র করেই হিংসা, সহিংসতা প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে মানুষের মননে। সামাজিক অস্থিরতার জন্য অসহিষ্ণু রাজনীতিকেও দায়ী করেন এ বিশ্লেষক। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে শেষটি।

জাগো নিউজ : কোনো প্রতিবাদ নেই। মানুষ হত্যা হয়, অন্যরা দাঁড়িয়ে দেখেন। তার মানে, সমাজ ক্রমশই নিষ্ক্রিয়তার দিকে যাচ্ছে?

মলয় ভৌমিক : নিষ্ক্রিয়তা সব জায়গাতেই। মানুষ নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে, অথচ সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, ভিডিও করছেন। একজন মানুষকে বাঁচানোর পরিবর্তে ছবি তুলে ঘটনার সাক্ষী থাকতে চাইছেন। মানুষের মধ্যকার চিন্তার অবদমন কত নিচে গেলে এমন ঘটনা ঘটতে পারে! অথচ মানবিকতার ঊর্ধ্বে কিছুই থাকতে পারে না।

আমি নিষ্ক্রিয় থেকে বিচারের জন্য অন্যের মুখোমুখি হচ্ছি। অথচ, রাষ্ট্র, সমাজে বিচার ব্যবস্থা নিয়ে যে নানা প্রশ্ন উঠেছে, তা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা নেই বলেই অন্যায় বাড়ছে।

কিন্তু আমরা সবাই যদি মুখ বুঁজে থাকি তাহলে বাঁচার তো আর পথ থাকবে না। ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে আবুল ফজলের মতো লেখকরা সাহস করে প্রশ্ন তুলেছেন, একজন ধার্মিক বড়, না-কি একজন শিক্ষিত মানুষ বড়? ধার্মিক তার বিশ্বাস থেকে যেকোনো মুহূর্তে মানুষ হত্যা করতে পারে। কিন্তু একজন শিক্ষিত মানুষ আরেকজন মানুষকে হত্যা করতে পারে না। সমাজে কিন্তু কথিত ধার্মিকের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। ধর্মের অপব্যাখ্যা তারাই সৃষ্টি করছেন।

লেখক মোতাহার হোসেন, আবুল ফজলরা কিন্তু ধর্মের বিরুদ্ধে বলেননি। ধর্ম নিয়ে যারা অতি বাড়াবাড়ি করে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে, তাদের বিরুদ্ধে লিখেছেন।

এবারের বিশ্বকাপ ক্রিকেট ঘিরে সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশ দেখে আঁতকে উঠেছি। একটি খেলাকে ঘিরে এমন ভাষা, শব্দের প্রয়োগ সভ্য সমাজের হতে পারে না।

সম্প্রতি প্রিয়া সাহা নামের এক নারী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে যে নালিশ করেছেন, তাতে বাংলাদেশকে চরমভাবে খাটো করা হয়েছে। কিন্তু প্রিয়া সাহাকে নিয়ে ভাষার যে ব্যবহার দেখলাম, তাতে সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশও তীব্র হয়েছে। একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে এক ধর্মের মানুষ আরেক ধর্মের মানুষকে আক্রমণ করে যে ভাষা প্রয়োগ করছেন, তা দেড় দশক আগেও ছিল না।

জাগো নিউজ : আসলে গলদটা কোথায় ছিল?

মলয় ভৌমিক : মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি সংবিধান রচনা করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের পর থমকে গেল। এরপর তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কোনো চর্চা হয়নি। বরং পাকিস্তানের ভাবধারাকে উসকে দেয়া হয়েছে। একটি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তো সবসময়ই তৎপর থাকে। সাধারণ মানুষ ধর্ম, সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে মাথা ঘামায় না। কিন্তু বিশেষ সময় এবং ইস্যুকে কেন্দ্র করে উসকে দিলে তার প্রভাব ভয়ঙ্কর হয়। ৭৫-এর পর আমরা তা-ই দেখেছি।

এ সময়ে বিশ্বে কিছু ঘটনাও ঘটল। পুঁজিবাদের বিস্তার সর্বত্রই দেখতে পেলাম। আশির দশকের পর থেকে বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে টালমাটাল অবস্থা শুরু হলো। এরপরই বিশ্ব ভারসাম্য হারিয়ে ফেললো। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়া অথবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের দ্বন্দ্ব আছে এখনও। কিন্তু সে দ্বন্দ্ব কোনো আদর্শের নয়, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব মাত্র।

কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় কখনো ধর্ম, কখনো জাতীয়তাবাদ অথবা ভূখণ্ডের দখল নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে। আল-কায়েদা, আইএস কারা তৈরি করেছিলেন, তা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে। সাম্রাজ্যবাদ, অস্ত্রের ব্যবসা আপনাকে আমলে নিতে হবে।

এসবের প্রভাব তো প্রতিটি রাষ্ট্র, সমাজের ওপরই পড়ে। বঙ্গবন্ধু তার আত্মজীবনীতে বারবার একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন। যদিও বিশ্ব বলয় থেকে বেরিয়ে এসে এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। কিন্তু চেষ্টা তো হতে পারত। এখন মানুষের মধ্যে সেই আকাঙ্ক্ষাও নেই। এ আকাঙ্ক্ষা তরুণ-যুব সমাজের মধ্যেও ঘোলাটে।

জাগো নিউজ : দীর্ঘ সময় তো মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দলও ক্ষমতায় থাকছে…

মলয় ভৌমিক : এগুলো খুবই আপেক্ষিক কথা।

জাগো নিউজ : আপেক্ষিক বলছেন কেন? তারা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেই ক্ষমতায় আসে…

মলয় ভৌমিক : সমাজের পরিবর্তন সময় ধরে আসে না। কিন্তু ক্ষমতায় থাকার জন্য আপস করে ভারসাম্য সৃষ্টি করলে, তাহলে গোড়াতেই ভুল। ক্ষমতায় থাকার জন্য বা ভোট বাড়ানোর জন্য ভিন্ন পথে, ভিন্ন মতের সঙ্গে আপস করলে ফলাফল ভালো হয় না এবং সেটি যে কোনো দলের জন্যই।

আসলে দলগুলো সমাজের পরিবর্তন চায় কি-না, সেটা আগে দেখতে হবে। কারণ তারা মূলত ক্ষমতায় যেতে এবং থাকতে মরিয়া। এজন্য যে কোনো পন্থাই অবলম্বন করতে পারে তারা। ১৯৭৫ সালের পর এ ধারা খুবই পরিষ্কার হয়েছে। ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে পরিবর্তনের কথা বলেছিল। কিন্তু বাস্তবে রূপ দেয়নি। আওয়ামী লীগের সময় কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি বটে। যুদ্ধাপরাধের মতো বিচার তো আওয়ামী লীগের সময়ই দেখতে পেলাম। কিন্তু যারা যুদ্ধাপরাধীদের আদর্শ লালন করে, তাদের বিরুদ্ধে আসলে জনমত গড়ে তোলা যায়নি। কয়েক জন অপরাধীকে ফাঁসি দিলেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একেবারে বিকাশ ঘটবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই।

জাগো নিউজ : তাহলে এ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি কোথায়?

মলয় ভৌমিক : আমি তত্ত্বের চেয়ে বাস্তবের সঙ্গে মিশে চলতে চাই। এ কারণে আমি মনে করি, আজকের যে সংকট তার কোনো সহজ সমাধান নেই। কিন্তু তা-ই বলে কি সমাধানের পথ কিছুই নেই?

জাগো নিউজ : কী সে সমাধান?

মলয় ভৌমিক : ভালো কিছু আসবে হয়তো। সমাজ যেভাবে তৈরি হয়, নেতৃত্বও সেভাবে তৈরি হয়। এ কারণে সামাজিক জাগরণটা তৈরি করতে হবে। এজন্য শিক্ষা-সংস্কৃতির ব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি। সংস্কৃতির মধ্যে সবই এসে যায়। আমরা তো এখন সংস্কৃতির মধ্যে কোনো আদর্শ দেখি না।

আমরা যদি সবকিছুর মধ্যেই বাজার ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেই, তাহলে আদর্শ বলতে আর কিছু থাকে না। এ কারণে আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির মূলে গিয়ে আলোচনা করতে হবে।

জাগো নিউজ : এজন্য নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ গুরুত্ব পায় আপনার কাছে…

মলয় ভৌমিক : আমার কাছে মনে হয়, তত্ত্বের কোনো ঘাটতি আছে। নতুন সংকট মোকাবিলায় পুরনো তত্ত্ব সমাধান দেবে, আমি ঠিক তা মনে করি না। আরও তত্ত্ব চাই। বাজার অর্থনীতি, সমাজতন্ত্রের বাইরেও তত্ত্ব থাকতে পারে। এখন ভাবার সময় এসেছে।

প্রয়োজনের তাগিদেই পৃথিবীতে নতুন নতুন তত্ত্ব এসেছে। শিল্প বিপ্লবের সময়ও আমরা নানা নতুন তত্ত্ব দেখেছি। বাজার দখলের চিন্তা তো তখন থেকেই। পুঁজিবাদের চিন্তা কিন্তু তখন প্রগতিশীল ছিল। অর্থাৎ চিন্তার অগ্রসর যাকে বলে।

চল্লিশের দশকের সমাজতান্ত্রিক চিন্তাও যে সমাধান দেবে, তা হলফ করে বলা যাবে না।

জাগো নিউজ : এসব চিন্তাকে বাতিল বলবেন?

মলয় ভৌমিক : না। কোনো চিন্তাকেই বাতিল বা ঠুনকো বলা যাবে না। মানুষ তার প্রয়োজনেই চিন্তার বিকাশ ঘটিয়েছে। কিন্তু পুরনো চিন্তার ওপর দাঁড়িয়ে নতুন কিছু ভাবাই হচ্ছে প্রগতিশীল চর্চা। আমাদের নতুন চিন্তার অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

জাগো নিউজ : সমাজ পরিবর্তন নিয়ে আপনি কি আশাবাদী?

মলয় ভৌমিক : আমি নিশ্চিতভাবে আশাবাদী। বিবর্তনের ইতিহাস জানা থাকলে আশাবাদী না হওয়ার কোনো কারণ নেই। মানুষ যেখানে ঠেকেছে, সেখান থেকেই মুক্তির উপায় বের করেছে। এটিই মানুষের ইতিহাস।

মানুষ হতাশ হয়, মহাকালকে মনে রাখে বলে। মহাকালের কাছে আমাদের ইতিহাস খুবই ছোট। ধৈর্য ও চেষ্টাতে ভর করেই মানুষকে এগিয়ে যেতে হয়। সমাজ পরিবর্তনের জন্য আমাদের আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। অনেকেই চিন্তার বিকাশ ঘটিয়ে পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেটা এলোমেলোভাবে। মানুষ তাতে আস্থা পাচ্ছে না। ‘কেঁচে গণ্ডুষ’ বলে একটি শব্দ আছে। এর মানে হচ্ছে, নতুন করে শুরু করা। আমাদের এখন নতুন করে শুরু করতে হবে, তবে পুরনো চিন্তার ওপর ভর করেই।

এএসএস/এমএআর/জেআইএম

এবারের বিশ্বকাপ ক্রিকেট ঘিরে সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশ দেখে আঁতকে উঠেছি

বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা নেই বলেই অন্যায় বাড়ছে

কিন্তু প্রিয়া সাহাকে নিয়ে ভাষার যে ব্যবহার দেখলাম, তাতে সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশও তীব্র হয়েছে

শিক্ষা-সংস্কৃতির ব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি। আমরা তো এখন সংস্কৃতির মধ্যে কোনো আদর্শ দেখি না

মানুষ যেখানে ঠেকেছে, সেখান থেকেই মুক্তির উপায় বের করেছে