মেয়াদ বাড়ে প্রকল্পের, থেকে যায় নিরক্ষরতা

প্রদীপ দাস
প্রদীপ দাস প্রদীপ দাস , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৫২ পিএম, ২৫ আগস্ট ২০১৯

দেশে তিন কোটি ৩৫ লাখ মানুষ এখনও নিরক্ষর। নিরক্ষর এসব মানুষ টেকসই উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বাধা। তারাই জিইয়ে রাখে দরিদ্রতা। ছয় বছর আগে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, দেশের কোনো মানুষ নিরক্ষর থাকবে না। এ লক্ষ্যে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প (৬৪ জেলা)’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়।

ওই প্রকল্পের আওতায় চার বিভাগের ২৫০ উপজেলায় ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৪৫ লাখ নিরক্ষর মানুষকে মৌলিক সাক্ষরতা ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকল্পটি ২০১৮ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্দিষ্টসংখ্যক মানুষকে শিক্ষার আওতায় আনতে ব্যর্থ হন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। বাড়ানো হয় এক বছর মেয়াদ। গত জুনে সেই মেয়াদও শেষ হয়। এ সময় অর্থাৎ ছয় বছর পার হলেও প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৩৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রথমবার মেয়াদ বাড়ানোর পরও ওই জনগোষ্ঠীর বড় অংশই নিরক্ষর থেকে গেল।

সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় দ্বিতীয় ধাপে অর্থাৎ ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত (ব্যয় না বাড়িয়ে) এ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে বলে জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক তপন কুমার ঘোষ। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) গত মে মাসে এ প্রকল্পের ওপর এক নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রদান করে। এতে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৩৬ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং ২৬ শতাংশ আর্থিক অগ্রগতির তথ্য জানানো হয়।

এতে আরও বলা হয়, ‘সাক্ষরতা কার্যক্রমে ২৩ লাখ ৫৯ হাজার ৪৪১ শিক্ষার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও মাঠ পর্যায়ের জরিপ থেকে সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে বিশেষ কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।’

literacy-02

এ বিষয়ে কথা বলতে প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলামকে দুদিনে একাধিকবার কল দেয়া হয়। কিন্তু তিনি কল রিসিভ করেননি।

‘প্রকল্পে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে’ উল্লেখ করে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক তপন কুমার ঘোষ গতকাল শনিবার (২৪ আগস্ট) বলেন, ‘এটা একটা ত্রুটিপূর্ণ প্রকল্প। এ প্রকল্পে শিক্ষকদের বেতন মাত্র ১২০০ টাকা। একজন শিক্ষকের ১২০০ টাকা বেতন হলে সে কী পড়াবে? এ প্রকল্পে এটার সমাধান হবে না। আমরা চেষ্টা করেছি, কিন্তু সরকার বাড়াতে রাজি হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এখন নতুন একটা প্রোগ্রাম করছি, প্রকল্প নয়। এর নাম হচ্ছে নন-ফর্মাল এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম। এতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। এখানে ২০৩০ সালের মধ্যে তিন কোটি ২৫ লাখ মানুষকে সাক্ষরতার আওতায় আনা হবে।’

নতুন এ কর্মসূচিতে নিরক্ষরতা সমস্যার সমাধান হবে বলে দাবি করেন তপন কুমার। তবে চলমান প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রকল্প পরিচালক কিংবা এর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতদের দুর্বলতা দেখেন না বলেও জানান তিনি।

৬ বছরে যা সম্ভব হয়নি, এক বছরে তা কি সম্ভব?

৪৫২ কোটি ৫৮ লাখ ৬২ হাজার টাকা ব্যয়ে দেশের চার বিভাগে (২৫০ উপজেলা) ‘মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প (৬৪ জেলা)’ নামে প্রকল্পটি ২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন দেয়া হয়।

প্রকল্প সূত্র জানায়, প্রকল্পটি দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে ২৫০টির মধ্যে ১৩৪টি উপজেলার ২৩ লাখ ৫৯ হাজার ৪৪১ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ শুরু হয়। কিন্তু ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ তো দূরের কথা, প্রথম ধাপের কাজ ভালোভাবে শেষ করতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

literacy-04

এ বিষয়ে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক তপন কুমার বলেন, ‘আমি আসার পর বহু কষ্টে প্রথম ধাপটা শেষ করতে পেরেছি। আশা করছি, দ্বিতীয় ধাপ সুন্দরভাবে সমাপ্ত করব। দ্বিতীয় ধাপের কাজ হয়তো আগামী অক্টোবরের দিকে শুরু করতে পারব। এজন্য প্রাথমিক কাজগুলো চলছে। দ্বিতীয় ধাপে ছয় মাসের কোর্স, আমরা বিশ্বাস করি তা সুন্দরভাবে শেষ করতে পারব।’

আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ‘মাঠ পর্যায়ের জরিপ থেকে সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে বিশেষ কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি’- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা আরেকটি পরিকল্পনা করছি, প্রথম ধাপের মধ্য থেকে অন্তত পাঁচ লাখ জনগোষ্ঠীকে বেছে নিয়ে বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দেব, তখন অগ্রগতি পাওয়া যাবে। তখন তারা নিজেরাই স্বাবলম্বী হতে পারবে।’

পুরো প্রকল্পের কাজ ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু পারেননি। এরপর এক বছর সময় বাড়ানো হয়েছে, তারপরও পারেননি। আপনি বলছেন, প্রথম ধাপের কাজ শেষ করেছেন। দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন। যেখানে এ প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ শেষ করতে ছয় বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেল, সেখানে দ্বিতীয় ধাপের কাজ এক বছরে শেষ করতে পারবেন?

জবাবে মহাপরিচালক বলেন, ‘এখন কী করব বলেন? আমি তখন ছিলাম না। এটা বন্দি ছিল একদম। আমি ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে আসি। এসে দেখি কিছুই নাই। তারপর শিক্ষক নিয়োগ, বইপত্র কেনা, ছাপানো- সব কাজ অনেক কষ্টে অক্টোবরে শুরু করে একটা অংশ শেষ করেছি। দ্বিতীয় অংশ শুরু হতে যাচ্ছে। এটা প্রথম অংশের চেয়ে ভালো হবে, এটা বলতে পারি।’

প্রকল্পের যত সমস্যা

প্রকল্পে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে- মহাপরিচালক তপন কুমার ঘোষের এমন মন্তব্যের বাস্তবতা পাওয়া যায় আইএমইডির প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়েছে, এ প্রকল্পের ৩৬ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় বা মাদরাসায় শিখন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হলেও অনেক শিখন কেন্দ্রের জন্য নির্দিষ্ট ও স্থায়ী অবকাঠামো বা জায়গা নেই। যেমন- ৬৩ দশমিক ২৫ শতাংশ শিখন কেন্দ্র স্থানীয় লোকের বাসস্থান বা খোলা জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের বসার ব্যবস্থাসহ অন্যান্য উপকরণ যেমন- মাদুর, ব্ল্যাকবোর্ড, খাতা, কলম ইত্যাদি পর্যাপ্ত নয়। যদিও এসবের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ ছিল, কিন্তু তা খরচ করেনি বা করতে পারেনি বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানটি।

প্রকল্প পর্যবেক্ষণ, বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনা ইউনিটের অস্থায়িত্ব, এ প্রকল্পের অন্যতম দুর্বল দিক। বিশেষ করে প্রকল্পের পরিচালক ভারপ্রাপ্ত, উপ-পরিচালক পদসহ সহকারী পরিচালকদের একাধিক পদ শূন্য। জাতীয় পর্যায়ে ২৬ প্রকল্প কর্মকর্তার মধ্যে ২১ জন এবং কোনো উপজেলায় প্রকল্প কর্মকর্তা এখনও নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি।

শিক্ষকরা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) উল্লিখিত তাদের স্বল্প বেতন ও বেতন পাওয়ার পদ্ধতি নিয়ে অসন্তুষ্ট। যা শিক্ষকদের মাঝে নিয়মিত ক্লাস নেয়ায় অনিচ্ছা তৈরি করে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিটের সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হয় না। এতে প্রকল্প কার্যক্রমের পরিবীক্ষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।

প্রকল্পে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়।

মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নকারী এনজিওগুলোর কর্মদক্ষতা, ব্যবস্থাপনা ও জনবল পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, বেশির ভাগ এনজিওর প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা থাকলেও অপেক্ষাকৃত কম সক্ষমতাসম্পন্ন বাস্তবায়নকারী এনজিওগুলো (১৬টি বাস্তবায়নকারী এনজিওর মধ্যে অন্তত দুটি) তাদের দায়িত্ব পালনে কতটুকু সামর্থ হবে, তা বিবেচনা করতে হবে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রকল্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় পুরুষ শিক্ষার্থীরা শিখন কেন্দ্রে আসতে চান না।

পিডি/এমএআর/পিআর