ছাত্রদলের কাউন্সিলে কদর বেড়েছে তৃণমূলে

খালিদ হোসেন
খালিদ হোসেন খালিদ হোসেন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:৪৭ পিএম, ৩১ আগস্ট ২০১৯

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ষষ্ঠ কাউন্সিল ঘিরে ভোটারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরিতে দেশের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত ছুটে বেড়াচ্ছেন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থীরা। দীর্ঘ ২৭ বছর পর কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হওয়ায় এসব প্রার্থীর কাছে কদর বেড়েছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কুমিল্লা জেলা ছাত্রদলের দায়িত্বশীল এক নেতা জাগো নিউজকে বলেন, ‘রুহুল কবির রিজভী ও এম ইলিয়াস আলী’ কমিটির পর দীর্ঘ ২৭ বছর পর জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ সময়ে ছাত্রদলের যেসব কমিটি হয়েছে তা ছিল উপর থেকে চাপানো। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক সংগঠনের অগণতান্ত্রিক কমিটি! যে কারণে সিন্ডিকেটের সৃষ্টি।

কমিটিতে অবস্থান নিয়ে ছাত্রদল নেতারা এসব সিন্ডিকেট মেইনটেইন করতেন, ছিল না তৃণমূল নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন। ফলে কমিটি গঠন নিয়ে বিভিন্ন সময় স্বজনপ্রীতি, অর্থ বিনিময়সহ নানা ধরনের অভিযোগ ওঠে। সর্বশেষ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যে কমিটি বিলুপ্ত হলো, ঢাউস ওই কমিটির অনেক কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল নেতাকে সংগঠনের সভাপতি রাজিব আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান চিনতেন না- অভিযোগ ওই নেতার।

তিনি আরও বলেন, এবার কাউন্সিল প্রক্রিয়া শুরুর সময় সংগঠনের ১১০ জন ফরম সংগ্রহ করেন। ফরম সংগ্রহের সময় দেখা যায় বিপত্তি। আকরামুল হাসানের কাছে যখন কোনো প্রার্থী সংগঠনের পরিচয় দেন, তখন তিনি তাকে চিনতে পারেননি। সাধারণ সম্পাদককে সভাপতি রাজিব আহসানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হয়। আবার রাজিব আহসান যাকে চিনতে পারেননি তখন তিনি আকরামুল হাসানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। অথচ কেন্দ্রীয় নেতাদের সবাইকে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের চেনার কথা ছিল।

কুমিল্লা অঞ্চলের ছাত্রদলের অপর এক নেতা বলেন, বিলুপ্ত ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে এমন ঘটনাও দেখা গেছে যে, সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে সালাম দিয়েছেন, তারা সে সালামের উত্তর পর্যন্ত দেননি। হতে পারে তারা চেনেন না অথবা অন্য কোনো সিন্ডিকেটের বলে তাকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। কিন্তু ষষ্ঠ কাউন্সিল প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশীরা বাংলাদেশ চষে বেড়াচ্ছেন। ভোটারদের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন, যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। ছাত্রদলকে গতিশীল করতে যার কোনো বিকল্প নেই।

নওগাঁ জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের রাসেল বলেন, ‘প্রথমে দেশনায়ক তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি যে, একদিনের জন্য ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে কাউন্সিলের মাধ্যমে তৃণমূলের কাছে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করেছেন। কাউন্সিলের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তৃণমূলের সেতুবন্ধ তৈরি হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ প্রার্থী আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, কেউ ফোন করেছেন, কেউ দেখা করছেন আবার কেউবা দেখা করবেন। সব প্রার্থীই বলছেন, তাকে নির্বাচিত করলে ছাত্রদলকে গতিশীল করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন ত্বরান্বিত করতে ছাত্রদল দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।’

আপনারা প্রার্থীদের কোন কোন বিষয়গুলো বিবেচনা করছেন- জানতে চাইলে রাসেল বলেন, ‘আমরা সিন্ডিকেটমুক্ত ছাত্রদল চাই। আমরা কোনো ভাইয়ের লোক চাই না। আমরা চাই শহীদ জিয়ার আদর্শের সৈনিক, আমরা চাই খালেদা জিয়া-তারেক রহমানের বিশ্বস্ত হাতিয়ার।’

কাউন্সিলের প্রার্থিতা নিয়ে প্রচারণা সম্পর্কে সভাপতিপ্রার্থী এস এম সাজিদ হাসান বাবু বলেন, শহীদ জিয়ার আদর্শের একজন কর্মী হিসেবে সবসময়ই আমি বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখি। কাউন্সিলের প্রার্থী হিসেবে এখানে বাড়তি মাত্রা যোগ হয়েছে। যখন কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে তখন তৃণমূল ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গে আমার প্রার্থিতার বিষয়ে কথা হয়েছে। সশরীরে অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে। এখনও বলছি।

‘আগামী ৩ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হবে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত করে সিলেট যাব, সেখানে হযরত শাহজালাল, হযরত শাহপরানের (রা.) মাজার জিয়ারত করব। তারপর দলের প্রয়াত নেতা এম সাইফুর রহমানের কবর জিয়ারত করব। এভাবেই আমার প্রচারণার পরিকল্পনা রয়েছে। ’

অপর সভাপতিপ্রার্থী মাহামুদুল হাসান বাপ্পীও এমন প্রচারণার পরিকল্পনা করেছেন। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনে দেশনায়ক তারেক রহমান আমাকে ভিপি পদে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। সেই থেকে সারাদেশের মানুষের সঙ্গে আমার যোগাযোগ রয়েছে। সবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে। ছাত্রদলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে আমাকে পরামর্শ দিচ্ছেন। আগামী ৩ সেপ্টেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণায় নামব। এজন্য বিশেষ পরিকল্পনাও রয়েছে। সময় হলে জানতে পারবেন।’

অপর সাধারণ সম্পাদকপ্রার্থী মো. হাসান (তানজিল হাসান) বলেন, ছাত্রদলের কর্মী হিসেবে দেশের বিভাগীয় ও জেলা শহরে গিয়েছি। সেখানকার নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা সবাই ছাত্রদলকে গতিশীল দেখতে চায়।

একটি সূত্র জানায়, ছাত্রদলের কমিটি নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে পরিচিত আমানউল্লাহ আমান, ইলিয়াস আলী, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, নোয়াখালী আঞ্চলিক বলয়সহ যেসব সিন্ডিকেট রয়েছে এর মধ্যে বিএনপির নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলী বলয় এবং ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুর বলয় শক্তিশালী। অন্যান্য সিন্ডিকেট এসব বলয়ের মাধ্যমে বিভক্ত হয়ে তৎপর রয়েছে। এসব বলয়সমর্থিত প্রার্থীদের নির্বাচিত করতে ভোটের মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠছেন বড় ভাই হিসেবে পরিচিত নেতারা। তারা কৌশলে আকারে-ইঙ্গিতে কাউন্সিলরদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, আবার কেউ সরাসরি তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেয়ার জন্য বলছেন।

কেএইচ/এমএআর/এমএস