রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে না পারলে বড় ঝুঁকি তৈরি হবে

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৩০ পিএম, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ড. তানজিম উদ্দিন খান। কূটনৈতিক বিশ্লেষক। অধ্যাপনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। আসামের নাগরিকত্ব সংকট, কাশ্মীর পরিস্থিতি, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র

দক্ষিণ এশিয়ার শান্তির জন্য ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে হুমকি মনে করেন তিনি। ভারতের সংবিধান থেকে ৩৭০ অনুচ্ছেদ তুলে দেয়ার ঘটনায় কাশ্মীরিদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করতে পারে বলেও মত দেন। বলেন, ‘ভারত যত বেশি হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত হবে, বাংলাদেশ-পাকিস্তানও তত বেশি মুসলমান রাষ্ট্রে পরিণত হবে।’ যে উপায়ে আসামের ১৯ লাখ বাঙালির নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে তার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এ বিশ্লেষক বলেন, আসাম সীমান্তেও পুশইন হবে, ঠিক রোহিঙ্গাদের মতো

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ‘বহুপাক্ষিক আলোচনার প্রয়োজন’ বলেও মত দেন তিনি। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে শেষটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ : আগের পর্বে বলেছিলেন, ভারতের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় অস্থিরতা বাড়ছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কাশ্মীর-আসাম ইস্যু ভারতের নিজস্ব ব্যাপার। আসলে বাংলাদেশের আওয়াজটা কী হওয়া উচিত?

তানজিম উদ্দিন খান : প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে ভারতের এ নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজটা তোলা আসলে খুব জরুরি। কিন্তু এর আগে আমাদের চিন্তা করতে হবে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো আসলে কোন ধরনের রাজনৈতিক চর্চা করে। বাংলাদেশেই তো গণতান্ত্রিক চর্চা অনুপস্থিত। এ কারণে বাংলাদেশেও একধরনের স্বৈরতান্ত্রিকতা বিরাজ করছে।

ভারত থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিকে ঠিক আলাদা করা যায় না। যে রাজনীতি মানুষকে ধারণ করে না সে রাজনীতি ভারতেই হোক আর বাংলাদেশেই হোক, তা ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয়। রাজনৈতিক চরিত্র একই। কেউ ধর্মকে সামনে নিয়ে আসছে, কেউ জাতীয়তাবাদকে। দিন শেষে তাদের রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নেই।

এ কারণেই একটি দেশের অনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলার নৈতিক সাহস বাংলাদেশেরও নেই। সাহস নেই বলেই বলা হয়, এগুলো ডমেস্টিক (অভ্যন্তরীণ) ইস্যু। অথচ ধর্ম বা জাতীয়তাবাদের মতো ইস্যুগুলো কখনই সীমানা দিয়ে আটকে রাখা যায় না। বাংলাদেশের হিন্দুরা আক্রান্ত হলে ভারতের হিন্দুদের মনে আঘাত লাগবেই। একইভাবে ভারতের মুসলমানরা আক্রান্ত হলে বাংলাদেশের মুসলমানদের ওপর প্রভাব পড়বে।

কথিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে ধরনের রাজনীতি বা সরকার আমরা দেখছি, তাতে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকার তো কথা নয়। যারা ক্ষমতায় যাচ্ছে, তারা যেকোনো উপায়েই ক্ষমতায় থাকতে চাইছে এবং সেটা জনমত উপেক্ষা করে হলেও। এটিই হচ্ছে এখন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির নতুন ধারা।

জাগো নিউজ : কাশ্মীর পরিস্থিতি আড়াল করতে আসামের ঘটনা গুরুত্ব পেল কি-না?

তানজিম উদ্দিন খান : আমি তা মনে করছি না। দুটি আলাদা আলাদা ইস্যু। আধিপত্য ঘটাতে বিজেপিকে হিন্দুত্ববাদ সামনে আনতে হচ্ছে। হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠা দিতেই কাশ্মীর ইস্যু তৈরি করা, আসাম ইস্যুও।

আসামের সমস্যা আশির দশক থেকে শুনে আসছি। এরপরও ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। এখন কিন্তু কাঁটাতারে নিজেদের ঘিরে ফেলছে ভারত। কাঁটাতারের বেড়া দিয়েও সমস্যার সমাধান করতে পারল না। এখন এনআরসি করছে।

এ কারণেই আমাদের এখন বোঝা উচিত যে, ১৯৪৭ সালের আগে দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র ধারণা ছিল কি-না? একসময় সীমানাগত পরিচয় এ অঞ্চলে একেবারেই অনুপস্থিত ছিল। সীমানার মধ্য দিয়ে যে জাতির পরিচয় ঘটছে, সেটাই মূলত সংকটের কারণ। আসামের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল একেবারে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়। সামগ্রিকভাবে ভারত মহাদেশ সবাইকে ধারণ করেছে। অথচ এখন ধর্ম, জাতীয়তাবাদ, সীমানায় মানুষকে আটকে দেয়া হচ্ছে। মূলত রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব তৈরি হওয়ার কারণেই এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

জাগো নিউজ : কাশ্মীরিদের সামনে এখন কী অপেক্ষা করছে?

তানজিম উদ্দিন খান : চরম অনিশ্চয়তা অপেক্ষা করছে। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা দিয়ে ভারতের সংবিধানে ৩৭০ ধারা যুক্ত করা হয়েছিল, বিশেষ প্রেক্ষাপটে। এর মধ্য দিয়ে ভারত রাষ্ট্র হিসেবে ভিন্নভাবে আবির্ভাব হয়েছিল। হিন্দুত্ববাদের কারণে ভারত আগের জায়গা থেকে এখন অনেক দূরে। শুধু ধর্ম নয়, হিন্দি ভাষাকেও আগ্রাসনে রূপ দিয়ে ভারত কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠছে ক্রমশই। পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষা মুছে হিন্দি ভাষায় সাইনবোর্ড লেখা হচ্ছে। ভাষার উগ্রতাও আমরা লক্ষ্য করছি। এমন উগ্রতা শুধু কাশ্মীর বা গোটা ভারত নয়, দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও নেগেটিভ সিগন্যাল।

জাগো নিউজ : এ সংকটের মধ্য দিয়ে কাশ্মীরের স্বাধীনতা ত্বরান্বিত করবে কি-না?

তানজিম উদ্দিন খান : কাশ্মীরের স্বাধীনতার প্রশ্নে আলোচনার আগে ভাবতে হবে। সেই মানের কোনো রাজনৈতিক সংগঠন কাশ্মীরিদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারছে কি-না?

তবে আমি মনে করি, ৩৭০ ধারা তুলে দেয়ার পর কাশ্মীরের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্খা আরও তীব্র হবে। ৩৭০ ধারা থাকার কারণে কাশ্মীরিদের কারও কারও মধ্যে ভারতের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের ব্যাপার ছিল। এখন কিন্তু আনুগত্য প্রকাশের কোনো বিষয়-ই নেই। সবাই স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়ার সুযোগ পেয়েছে।

জাগো নিউজ : রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে বলছিলেন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আটকে গেল ফের। এ সংকটের সমাধান আসলে কোথায়?

তানজিম উদ্দিন খান : আমি প্রথম থেকেই বলেছি, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সহজভাবে হবে না। এর আগে রোহিঙ্গারা ফেরত গিয়েছে, তখন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল এবং চীনের ভূমিকা বাংলাদেশের পক্ষে ছিল। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে চীনের তখন ভালো সম্পর্ক।

এখন চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করতে হয়। ভারতেরও ঠিক তা-ই। বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র থেকে মিয়ানমার এখন অনেকটাই গণতন্ত্রমুখী। এ কারণে বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। মিয়ানমার একধরনের আকর্ষণ তৈরি করে ভারত ও চীনকে পাশে রাখছে।

রোহিঙ্গা ইস্যু যতটুকু আন্তর্জাতিকীকরণ করার কথা ছিল, বাংলাদেশ তা সঠিকভাবে করেনি।

জাগো নিউজ : এ প্রশ্নে বাংলাদেশ ব্যর্থ কি-না?

তানজিম উদ্দিন খান : ব্যর্থ বা সফল তার কোনোটিতেই আমি মত দিচ্ছি না। আমি মনে করি, বাংলাদেশের সক্রিয়তার অভাব আছে। বাংলাদেশ ব্যর্থ কি-না, তা বলার সময় এখনও আসেনি।

জাগো নিউজ : ভারত ও চীনের সঙ্গে শেখ হাসিনার সরকারেরও ভালো সম্পর্ক। বাংলাদেশে ভারত-চীনের স্বার্থ আছে…

তানজিম উদ্দিন খান : বর্তমান সরকারের সঙ্গে ভারত ও চীনের ভালো সম্পর্ক- এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, মিয়ানমারে চীন ও ভারতের স্বার্থ বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি। এ কারণেই মিয়ানমারকে সমর্থন দিচ্ছে তারা

আমি মনে করি, বাংলাদেশের পক্ষে বিষয়টি মানবিক আকারে সামনে আনা দরকার এবং নাগরিক ইস্যুটির সমাধান টানা জরুরি। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বুঝতে হলে ১৯৪৭ সালের আগের ভারত মহাদেশকে বুঝতে হবে, যখন এমন রাষ্ট্রধারণা ছিল না। এখন রাষ্ট্রধারণা দিয়ে তাদের রাষ্ট্রহীন করা হচ্ছে। এ বিষয়গুলো সামনে এনে গবেষণা করা উচিত। এ গবেষণায় তো বাংলাদেশের সক্রিয়তার অভাব আছে। দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয় রোহিঙ্গা ইস্যু। বহুপক্ষীয় আলোচনায় এর সমাধান টানতে হবে।

জাগো নিউজ : রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের জন্য বর্তমান চাপ কতটুকু?

তানজিম উদ্দিন খান : শুধু চাপ নয়, রোহিঙ্গা ইস্যু বাংলাদেশের জন্য হুমকিও বটে। এ ধরনের জনগোষ্ঠীর জন্য যেমন মানবিক দিক আছে, তেমনি নিজেদের নিরাপত্তার দিকও আছে।

রোহিঙ্গারা খুবই বঞ্চিত একটি জনগোষ্ঠী। দীর্ঘ সময় ধরে তারা বিপদের মধ্যে থেকেছে। নিজেদের স্বার্থে যেকোনো ঝুঁকি নিতে পারে রোহিঙ্গারা। এ কারণেই বাংলাদেশের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে বলে আমি মনে করি।

রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে না পারলে আমাদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি হবে। তবে মানবিক ইস্যু হিসেবেই এর সমাধান করতে হবে। কারণ, আমাদের সামনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আছে। আমরা জোর করে তাদের বিপদের মুখে ফেলে দিতে পারি না। এ কারণেই সকল পথ খোলা রেখেই সমাধান করতে হবে।

এএসএস/এমএআর/জেআইএম

মিয়ানমারে চীন ও ভারতের স্বার্থ বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি। এ কারণেই মিয়ানমারকে সমর্থন দিচ্ছে তারা

রোহিঙ্গা ইস্যু যতটুকু আন্তর্জাতিকীকরণ করার কথা ছিল, বাংলাদেশ তা সঠিকভাবে করেনি

কাঁটাতারে নিজেদের ঘিরে ফেলছে ভারত। কাঁটাতারের বেড়া দিয়েও সমস্যার সমাধান করতে পারল না। এখন এনআরসি করছে

আধিপত্য ঘটাতে বিজেপিকে হিন্দুত্ববাদ সামনে আনতে হচ্ছে। আর হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠা দিতেই কাশ্মীর ইস্যু তৈরি করা, আসাম ইস্যুও

সাহস নেই বলেই বলা হয়, এগুলো ডমেস্টিক (অভ্যন্তরীণ) ইস্যু। অথচ ধর্ম বা জাতীয়তাবাদের মতো ইস্যুগুলো কখনই সীমানা দিয়ে আটকে রাখা যায় না