তদন্তে প্রমাণিত হলেও ব্যর্থ হয় রাষ্ট্র

জাহাঙ্গীর আলম
জাহাঙ্গীর আলম জাহাঙ্গীর আলম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:০২ পিএম, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

>> বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালে ৭৭০টি মামলার নিষ্পত্তি
>> অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় শাস্তি হয়েছে ২০টি মামলায়
>> খালাস দেয়া হয়েছে ৯৬টি মামলার আসামিদের
>> বাকিগুলো বিভিন্নভাবে নিষ্পত্তি করেছেন ট্রাইব্যুনাল

বর্তমান বিশ্ব তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নির্ভর। এ কারণে মানুষকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হচ্ছে। চলতে গিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন অনেকে। অপরাধ রুখতে তৈরি হয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন।

এ আইনে উপাদান ছাড়াই দায়ের হচ্ছে পিটিশন মামলা। আবার অধিকাংশ মামলার সাক্ষীরা জানেন না মামলার খবর। অন্যদিকে দালিলিক প্রমাণও পাওয়া যায় না। অধিকাংশ মামলার অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তার অভিযোগপত্র প্রমাণ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন রাষ্ট্রপক্ষ। ফলে অপরাধীরা খালাস পেয়ে যাচ্ছেন। দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে অপরাধের সংখ্যাও। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, অধিকাংশ মামলা আপস-মীমাংসার কারণে আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছেন।

মামলাগুলোর খালাসের রায়ে বিচারক উল্লেখ করেন, ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন- ২০০৬ এর ৫৭ ধারার অভিযোগে এজাহার দায়ের করা হলেও রাষ্ট্রপক্ষ ওই ধারায় অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হন নাই। এমতাবস্থায় আসামিদের খালাস প্রদান করা হলো।’

জাগো নিউজের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত (২০১৯ সালের ৩১ জুলাই) ৭৭০টি মামলা নিষ্পত্তি করেছেন বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনাল। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় শাস্তি দেয়া হয়েছে ২০টি মামলার আসামিদের। সাক্ষ্যপ্রমাণে অপরাধ প্রমাণ না হওয়ায় খালাস দেয়া হয়েছে ৯৬টি মামলার আসামিদের। বাকিগুলো বিভিন্নভাবে নিষ্পত্তি করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

বিশ্লেষকরা বলেন, মামলা করার পর যারা আদালতে সঠিক সাক্ষ্য দেন না তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এতে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা করার প্রবণতা কমে আসবে। এছাড়া মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাহলে মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে ত্রুটি থাকবে না। মামলার অভিযোগ প্রমাণ করতেও সহজ হবে। 

খালাস- ১

মামলার আসামি লুৎফর রহমান খান এজাহারকারী শফিকুর রহমানের আপন ছোট ভাই। ২০১৪ সালের ২২ অক্টোবর আসামি লুৎফর রহমান তার সহযোগীসহ একটি অনলাইন পত্রিকায় বাদীকে স্বর্ণ পাচারকারী উল্লেখ করে একটি সংবাদ প্রচার করেন।এতে শফিকুর রহমানের মানহানি হওয়ায় ২০১৫ সালের ১০ জুন নিজ ভাই লুৎফর রহমান খান, ওই অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক ও এক প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে সাইবার আদালতে পিটিশন মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি মতিঝিল থানাকে এজাহার হিসাবে রেকর্ডের নির্দেশ দিলে তা রেকর্ড হয়।

২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বর লুৎফর রহমানকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক মিজানুর রহমান। মামলার অপর দুই আসামিকে অব্যাহতি দানের সুপারিশ করেন। ২০১৬ সালের ১৮ জানুয়ারি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ এর ৫৭/৬৬ (১) (২) ধারায় অভিযোগপত্র আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। মামলার অপর দুই আসামিকে (সম্পাদক ও প্রতিবেদক) অব্যাহতি প্রদান করেন।

২০১৬ সালের ২৭ এপ্রিল আসামি লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। রাষ্ট্রপক্ষ মামলা প্রমাণের জন্য ছয়জন সাক্ষী আদালতে উপস্থাপন করেন। অভিযোগ গঠন ও সাক্ষীর পরীক্ষার সময় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ন্যায় বিচার প্রার্থনা করেন লুৎফর রহমান।

মামলার এজাহারকারী শফিকুর রহমান খান সাক্ষ্যতে বলেন, ‘২০১৪ সালের ২২ অক্টোবর একটি পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে তার ছবিসহ তাকে স্বর্ণ পাচারকারী উল্লেখ করে মিথ্যা সংবাদ প্রচার করে। এ ঘটনায় তিনি ওই পত্রিকার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। সাক্ষ্য শেষে তাকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী। তিনি জেরায় বলেন যে, আসামির বিরুদ্ধে তার কোনো অভিযোগ নেই।’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের উপ-পরিদর্শক মিজানুর রহমান সাক্ষ্যতে বলেন, ‘আসামি লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় অভিযোগপত্র দাখিল করিয়াছি।’

সাক্ষ্য শেষে তাকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী। জেরায় তিনি বলেন, ‘তিনি পত্রিকার কাউকে সাক্ষী হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ করেননি। মামলার অপর চার সাক্ষী আসামিকে সম্পৃক্ত করে কোনো বক্তব্য প্রদান করেননি।’

২০১৯ সালের ১৯ মে আসামি লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস প্রদান করেন ট্রাইব্যুনাল।

যেসব কারণে বেকসুর খালাস লুৎফর

রায়ের পর্যালোচনায় বিচারক বলেন, ‘এ মামলার একমাত্র আসামি লুৎফর রহমান, তিনি মামলার বাদী শফিকুর রহমান খানের আপন ছোট ভাই। বাদী তার সাক্ষ্যে বলেননি যে, আসামি লুৎফর রহমান তার বিরুদ্ধে সংবাদটি পত্রিকায় প্রচার করেছেন। আদালতে সংবাদটি উপস্থাপনও করেননি। তিনি তার সাক্ষ্যে বলেন যে, মামলার আসামির বিরুদ্ধে তার কোনো অভিযোগ নেই। মামলার অপর সাক্ষীরা আসামিকে সম্পৃক্ত করে কোনো বক্তব্য প্রদান করেননি।’

‘মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সংবাদের কোনো কপি জব্দ এবং তা প্রমাণের জন্য আদালতে উপস্থাপন করেননি। তাই সংবাদটি কে প্রচার করেছেন এবং কোন পত্রিকায় প্রচারিত হয়েছে- বিষয়টি রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে সক্ষম হননি। উপযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ, পারিপার্শ্বিকতা ও নথিতে তথ্যাদি পর্যালোচনায় বিচারক এ সিদ্ধান্ত পোষণ করেন যে, রাষ্ট্রপক্ষ আসামি লুৎফর রহমান খানের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই আসামি লুৎফর রহমান খানের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ২০০৬ সালের ৫৭ ধারায় আনিত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে নির্দোষ সাব্যস্তক্রমে অভিযোগ হতে খালাস প্রদান করা হলো।’

খালাস- ২

২০১৭ সালের ১৯ জুন কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানায় সাজ্জাদ হোসেন তার মেয়ের নগ্ন ছবি ছড়িয়ে দেয়ায় একই এলাকার সারেকের নামে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে একটি মামলা করেন।

মামলার অভিযোগে সাজ্জাত বলেন, ২০১৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে আসামি সারেক আমার মেয়ে ঈশিতা পারভীন নিপাকে (ছদ্মনাম) স্থানীয় একটি স্কুলের দক্ষিণে অবস্থিত এক ব্যক্তির বাসায় নিয়ে মোবাইল ফোনে ছবি তোলে। ২০১৭ সালের ১৬ জুন আসামি সারেক ঈশিতার স্বামী তরিকুল ইসলামকে মোবাইলে গালাগালি করেন এবং ঈশিতার অশ্লীল ছবি ফেসবুকের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। এ ঘটনায় সাজ্জাদ হোসেন দৌলতপুর থানায় তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০১৬ এর ৫৭ ধারায় মামলা করেন।

২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দৌলতপুর থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক শরীফুল ইসলাম আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০১৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি অভিযোগপত্র আমলে নেয় বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনাল। ২০১৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগ গঠনের সময় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ন্যায় বিচার প্রত্যাশা করেন আসামি সারেক।

রাষ্ট্রপক্ষ মামলার ১৪ সাক্ষীর মধ্যে চারজনকে আদালতে উপস্থাপন করেন। সাক্ষীদের জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আসামিকে ৩৪২ ধারায় পরীক্ষা করা হয়। নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ন্যায় বিচার প্রার্থনা করেন আসামি।

মামলার বাদী সাজ্জাত হোসেন সাক্ষ্যতে বলেন, ‘ঈশিতা পারভীন নিপা (ছদ্মনাম) আমার মেয়ে। তার ছবি কে বা কারা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়, তিনি তা জানেন না। আসামি এসব ছবি পোস্ট করেনি। ভুল বোঝাবুঝির কারণে এ মামলা করেছেন।’

ঈশিতা পারভীন নিপা সাক্ষ্যতে বলেন, ‘কে বা কারা তার অশ্লীল ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয় তিনি জানেন না। আসামি এসব ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেননি।’

স্বামী তরিকুল ইসলাম তার সাক্ষ্যতে বলেন, ‘ভিকটিম ঈশিতা পারভীন তার স্ত্রী। ফেসবুকে কে বা কারা তার স্ত্রীর অশ্লীল ছবি প্রচার করে, তা তিনি জানেন না।’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে আমি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করি।’ চলতি বছরের ২৭ মার্চ আসামি সারেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস প্রদান করেন বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনাল।

যেসব কারণে খালাস পেলেন সারেক 

রায়ের পর্যালোচনায় বিচারক বলেন, ‘মামলার আসামি সারেকের বিরুদ্ধে ভিকটিম ঈশিতার অশ্লীল ভিডিও ইন্টারনেটে প্রচারের অভিযোগ গঠন করা হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে সাক্ষ্যপ্রমাণাদি পর্যালোচনায় দেখা যায়, মামলার বাদী, ভিকটিম ও ভিকটিমের স্বামী বলেন যে, কে বা কারা বর্ণিত অশ্লীল ভিডিও ইন্টারনেটে প্রচার করেছে তা তারা জানেন না।’

‘যদিও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তার দাখিল করা অভিযোগের সমর্থনে সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। মামলার এজাহারকারী, ভিকটিম ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের সাক্ষ্য দ্বারা মামলার ঘটনা প্রমাণিত না হলে শুধুমাত্র তদন্তকারী কর্মকর্তার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আসামিকে শাস্তি প্রদান সমীচীন নয়। এছাড়া ঘটনার দীর্ঘ নয় মাস পর মামলা দায়ের করাটা ঘটনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।’

এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ মামলার চার্জশিটভুক্ত ১৪ সাক্ষীর মধ্যে এজাহারকারী ভিকটিম ও তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ চারজনকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করেন। রাষ্ট্রপক্ষ মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী আইটি ফরেনসিক এক্সপার্টসহ অবশিষ্ট ১০ সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

‘উপযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণসহ নথি পর্যালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় যে, রাষ্ট্রপক্ষ পর্যাপ্ত নিরপেক্ষ সাক্ষ্য দ্বারা আসামি সারেক ভিকটিম ঈশিতা পারভীন নিপার অশ্লীল ছবি প্রচারের বিষয়টি প্রমাণ করতে সক্ষম হননি। আসামি সারেকের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ এর ৫৭ ধারার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে নির্দোষ সাব্যস্তক্রমে অভিযোগ হতে খালাস প্রদান করা হলো।’

খালাস- ৩

বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আসামি শফিউর রহমান ফারাবী বিভিন্ন ভিআইপি ব্যক্তিকে হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এসব হুমকির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ১৪ মার্চ রাজধানীর রমনা থানায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে মামলা করেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক (রমনা জোন) ফজলুর রহমান।

২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় পুলিশ। ২০১৬ সালের ৫ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। মামলায় বিভিন্ন সময় সাতজন সাক্ষ্য দেন।

চলতি বছরের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আ স সামশ জগলুল হোসেন এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ফারাবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে বেকসুর খালাস দেন। 

রায়ে বিচারক বলেন, ‘ফারাবীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ যে অভিযোগ এনেছেন তা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সাক্ষ্যপ্রমাণে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় তাকে খালাস প্রদান করা হলো।’

রায় ঘোষণার পর ফারাবী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিআইপি ব্যক্তিদের হুমকি দিয়ে অপরাধ করেছি। কিন্তু যারা মূলহোতা তাদের কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে না? এ ধরনের মামলা যেন দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়- এ অনুরোধ রইল।’

ফারাবীকে কেন খালাস দেয়া হলো- এ বিষয় জানতে চাইলে বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নজরুল ইসলাম শামীম বলেন, ‘ফারাবী তার বক্তব্য কোথায় প্রচার করেছেন তা কেউ প্রমাণ করতে পারেননি। কোনো পুলিশ আদালতে এসে বলেননি যে, ফারাবী প্রচার করেছেন।’

বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালে যেসব মামলায় আসামিদের খালাস দেয়া হয়েছে সেগুলোর প্রায় সবগুলোতেই একই দশা! কোনোটার অভিযোগপত্রের ভিত্তি দুর্বল, তো কোনোটার আপস-মীমাংসা করা হয়েছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক এ প্রসঙ্গে জাগো নিউজকে বলেন, ‘মামলা করার পর যারা আদালতে সঠিক সাক্ষ্য দেন না তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এতে মিথ্যা ও হয়রানি মামলা করা অকেকটা কমে আসবে।’
  বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নজরুল ইসলাম শামীম বলেন, বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মামলাগুলোর ক্ষেত্রে আপসের সংখ্যা বেড়ে গেছে। মামলার বাদী, বাদীর বাবা-মা আদালতে এসে বলেন, ভুল বোঝাবুঝির কারণে মামলা করেছি। মামলার আসামির বিরুদ্ধে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। সে খালাস পেলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আদালত ন্যায় বিচারের স্বার্থে আসামিকে খালাস দিয়ে দেন।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মামলাগুলো আপসযোগ্য কি-না, এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিপি বলেন, এ মামলাগুলো আপসযোগ্য নয়। বাদী ও সাক্ষীরা আদালতে এসে বলেন, আমরা ভুল বুঝে মামলা করেছি। বড়জোর আমরা সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণা করতে পারি। কিন্তু ওই সাক্ষীর ওপর তো আসামিকে শাস্তি দেয়া যায় না।

এ বিষয়ে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের উপ-কমিশনার (ডিসি) আ ফ ম আল কিবরিয়া জাগো নিউজকে বলেন, আইসিটি আইনে বেশির ভাগ মামলা করেন নারীরা। তাদের ছবি প্রচার হওয়ায় অনেকে মামলা করেন। মামলা করার পর তারা মনে করেন যে, সামাজিকভাবে তো তাদের বাঁচতে হবে। বিষয়টা যত প্রচার কম হবে তত ভালো। তাই তারা বিভিন্নভাবে আপস-মীমাংসা করে নেন।

‘আরেকটা দিক হচ্ছে, সময় মতো মামলা না করার কারণে মামলার তথ্যপ্রমাণ সঠিকভাবে সংগ্রহ করতে পারেন না তদন্তকারী কর্মকর্তারা। ফলে অনেক তথ্যপ্রমাণ নষ্ট হয়ে যায়। তথ্যপ্রমাণ সঠিকভাবে সংগ্রহ করতে না পারায় মামলা প্রমাণ করা সম্ভব হয় না।’

ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল্লাহ আবু বলেন, অনেক সময় সাক্ষীরা আদালতে এসে উল্টাপাল্টা সাক্ষ্য দেন। তাদের এ ধরনের সাক্ষ্যের কারণে মামলাগুলো প্রমাণ করা সম্ভব হয় না। সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রমাণিত না হলে তো কাউকে শাস্তি দেয়া যায় না। এ ধরনের মামলার অভিযোগকারী ও সাক্ষীদের বিষয়ে আদালতকে আরও কঠোর হতে হবে। তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত কুমার কর্মকার বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনটি নতুন। এ আইনের বিষয়ে অনেকে জানেন না। এছাড়া মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা রয়েছে। সাইবার ক্রাইম সম্পর্কে সাধারণ মানুষ ও তদন্ত কর্মকর্তার অজ্ঞতা রয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সাইবার ক্রাইম সম্পর্কে বিশেষ কোনো প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের মামলাগুলো দালিলিকভাবে প্রমাণ করতে হয়। বর্তমানে ভিডিও এডিটিংয়ের জন্য নিখুঁত সফটওয়্যার বের হয়েছে, যার মাধ্যমে একটা ছবি থেকে একজন মানুষকে কেটে আরেকটা ছবিতে লাগিয়ে দেয়া যায়। এটা ধরার মতো আমাদের তদন্ত সংস্থার বিশেষ কোনো প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না এবং এ ধরনের প্রযুক্তিও দেশে নেই। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষ মামলা প্রমাণ করতে সক্ষম হন না। 

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ গাফফার হোসেন বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মামলাগুলো তদন্তের ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তাদের আরও সচেতন হতে হবে। তাদের এ বিষয়ে উন্নতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া যারা মিথ্যা ও হয়রানির জন্য মামলা করেন তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

জেএ/এমএআর/এমকেএইচ