মাঠের খেলায় গায়ে কাদা লাগবে না, তা হতে পারে না

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:০৫ পিএম, ২৯ অক্টোবর ২০১৯

রাশেদ খান মেনন। সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। মহাজোটের অন্যতম নেতৃত্ব এবং সাবেক মন্ত্রী। সম্প্রতি বরিশালের এক সমাবেশে নির্বাচন, ভোট প্রসঙ্গ তুলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন বামপন্থী এ রাজনীতিক। তার ওই বক্তব্যের জেরে কৈফিয়ত চাওয়া হয় জোটের পক্ষ থেকে।

জাগো নিউজ-কে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বরিশালের সমাবেশে ল্যাঙ্গুয়েজে গন্ডগোল হয়ে যেতে পারে।’ এছাড়া নির্বাচন, ভোট ও গণতন্ত্রের প্রসঙ্গ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। দীর্ঘ আলোচনায় উন্নয়ন, দুর্নীতির প্রসঙ্গও গুরুত্ব পায়। সমালোচনা করেন ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে সরকারের যোগসাজশের বিষয়ে। তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে দ্বিতীয়টি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

জাগো নিউজ : ভোট ডাকাতির সাক্ষ্য দিয়ে বরিশালে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা গণমাধ্যমে যথাযথভাবে উপস্থাপন হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন আগের পর্বে। ‘আপনি এবার মন্ত্রী হতে পারেননি বলে এমন ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন’- এমন অভিযোগ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের। শরিক দলের অন্যরাও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন…

রাশেদ খান মেনন : আমার বক্তব্য তাদের ক্ষুব্ধ করেছে। অপ্রস্তুত, বিব্রত করেছে। ভোটের বক্তব্যে আমি দুঃখ প্রকাশ করেছি।

একটি বাক্য দিয়ে সামগ্রিক ধারাবাহিকতা বাতিল করে দেয়া ঠিক নয়। আমি এখনও বলছি, আমার বক্তব্যের কারণে যে রঙ মেসেজ গেছে, তার জন্য দুঃখিত।

জাগো নিউজ : ভোট নিয়ে বক্তব্য দিয়ে এখন আপনি দুঃখ প্রকাশ করছেন। কিন্তু জনগণ তো গত দুটি নির্বাচনে আসলেই ভোট দিতে পারেনি। এ প্রশ্ন তো সর্বত্রই…

রাশেদ খান মেনন : আমি সংসদে বলেছি, উপজেলা নির্বাচন থেকে যে অভিজ্ঞতা হচ্ছে, তাতে মানুষ তার ইচ্ছায় ভোট দিতে পারছে না। এ অভিজ্ঞতা গণতন্ত্রের জন্য শুভকর নয়। আমি বলেছি, নির্বাচন ব্যবস্থা তার যথাযোগ্য মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

জাগো নিউজ : জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই এ অভিজ্ঞতার সৃষ্টি, যার দায় সরকার এড়াতে পারে কি?

রাশেদ খান মেনন : সরকার নয়, নির্বাচনের আয়োজন করে কমিশন। আমি বলেছি, সব ক্ষমতা থাকার পরও কেন নির্বাচন কমিশন তা প্রয়োগ করতে পারে না? উপজেলা নির্বাচনের পরিস্থিতি নিয়ে আমি প্রধান নির্বাচন কমিশনের কাছে গেলাম। তিনি বললেন, ‘আমরা তো বলে দিয়েছি। এখন মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব।’

অথচ মাঠের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করে না। ডিসিরা না করুক, নির্বাচন কর্মকর্তরাও করেন না।

জাগো নিউজ : বরিশালের সমাবেশে দেয়া বক্তব্য নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করছেন এখন। বিশেষ কোনো চাপ বা ভয়ের জায়গা থেকে অবস্থান পরিবর্তন কি-না?

রাশেদ খান মেনন : ভয়ের কোনো কারণ নেই। আমি মনে করি, ভোট নিয়ে আমার বক্তব্য সরকারের অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আমার এ বক্তব্য ড. কামালকে খুশি করেছে। সেখানে আমি ড. কামালের সমালোচনা করেও টানা বক্তব্য দিয়েছি কিন্তু তা নিয়ে কোনো খবর হয়নি। বক্তব্যের খণ্ডাংশ প্রকাশ করা হয়েছে যার যার ইচ্ছা মতো।

জাগো নিউজ : বরিশালের ওই সমাবেশে বক্তব্য কি আপনি সচেতনভাবে দিয়েছিলেন?

রাশেদ খান মেনন : আমি তো বলেছি, ৪০ মিনিটের বক্তব্যের কিছু খবরে এসেছে। আর আমার বক্তব্য নিয়ে ড. কামাল সাহেবরা কী মনে করল, তাতে যায় আসে না। জনগণ কী ভাবল, তা আমলে নেয়া রাজনীতিকের কাজ।

জাগো নিউজ : ভোট নিয়ে যে অভিজ্ঞতার কথা বলছেন, সেই অভিজ্ঞতা দেশকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

রাশেদ খান মেনন : নির্বাচন নিয়ে যে প্রশ্ন তা দূর করতে হবে আমাদেরই। এজন্য নির্বাচন কমিশনকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। নির্বাচনে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।

জাগো নিউজ : প্রতিটি সরকারই নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার কথা বলে। কিন্তু দিন যাচ্ছে, প্রশাসনের হস্তক্ষেপও বাড়ছে…

রাশেদ খান মেনন : আমি বারবার বলেছি, রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে ক্ষমতায় আসা গণতন্ত্রের জন্য শুভকর নয়। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করলে রাজনৈতিক দলগুলোও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

জাগো নিউজ : স্বাধীনতার অর্ধশত বছরে এসে আমাদের গণতন্ত্র হুমকির মুখে কি-না?

রাশেদ খান মেনন : বিশ্ব রাজনীতি ব্যবস্থার দিকেও আমাদের নজর দিতে হবে। আমরা তো এই বিশ্বের বাইরে না। গত কয়েক বছরে বিশ্বে নির্বাচন ব্যবস্থায় কী কী পরিবর্তন ঘটল, তা খেয়াল রাখতে হবে।

জাগো নিউজ : কিন্তু আপনারা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করছেন- এমন গল্প তো শোনান…

রাশেদ খান মেনন : আমাদের লড়াইটা অব্যাহত রাখতে হবে। এ প্রচেষ্টা থেকে সরে আসার উপায় নেই।

জাগো নিউজ : কিন্তু জনগণের অভিযোগ, লড়াই ছেড়ে আপনারা এখন আপস করছেন...

রাশেদ খান মেনন : বামপন্থীদের নিয়ে এমন অভিযোগ আগে থেকেই আছে। এমনকি দলের মধ্যেও আছে। আমাদের দলের অন্যতম প্রবীণ নেতা বিমল বিশ্বাস এমন অভিযোগ করেই পদত্যাগ করে চলে গেছেন।

তিনি অভিযোগ করেছিলেন, আমরা আপস করে চলছি। প্রশ্ন হচ্ছে, কোন বিষয়ে আপস করেছি আমরা? আমরা যুদ্ধাপরাধসহ সব হত্যার বিচার চেয়েছি। আমরা অসাম্প্রদায়িক ও সত্যিকার অর্থে উন্নয়নমুখী একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াই করে যাচ্ছি।

জাগো নিউজ : আপনি অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলছেন। অথচ সরকার হেফাজতের মতো ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে বোঝাপড়া করছে…

রাশেদ খান মেনন : হ্যাঁ, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমাদের দেশের শাসকরা ক্ষমতার স্বার্থে এমন গোষ্ঠীর সঙ্গে আপস করেন। কিন্তু এর পরিণতি কখনই ভালো হয় না। একসময় জামায়াতের সঙ্গেও আওয়ামী লীগ আপস করেছে। তার পরিণতি কী হয়েছে, তা সবারই জানা।

জাগো নিউজ : আপনারাও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছেন এখন। আপনাদের পরিণতি কী হতে পারে?

রাশেদ খান মেনন : হেফাজতের সঙ্গে আপস করা হয় যখন, আমি মন্ত্রী হয়ে তার বিরোধিতা করেছি। আমার দল মাঠে থেকে আন্দোলন করছে।

আসলে সঙ্গে সঙ্গেই সব সমাধান হয়ে যাবে না। আপনারা সাংবাদিকদের একটি সমস্যা হচ্ছে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ উত্তরের দিকে যেতে চান। সাদা ও কালোর মধ্যে এক অস্পষ্ট এলাকা থাকে। এ এলাকায় অবস্থান করে ক্রমাগত আলোর দিকে যাওয়ার নামই আন্দোলন।

জাগো নিউজ : আপসের এমন আন্দোলনে অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে…

রাশেদ খান মেনন : ‘আমার যেমন বেণী তেমনি রবে, চুল ভেজাব না’- এ নীতিতে রাজনীতি হয় না। আপনাকে মনে রাখতে হবে, আমরা জোট করেছি বুর্জোয়া দলের সঙ্গে। তাদের সঙ্গে মাঠে খেলতে নেমেছি। এমন খেলায় গায়ে কাদা লাগবে না, তা হতে পারে না।

জাগো নিউজ : কাদা তো সর্বত্রই। পরিষ্কার কি সম্ভব?

রাশেদ খান মেনন : হিটলারকে ঠেকানোর জন্য স্টালিনকে আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি করতে হয়েছিল। রাজনীতি তো সন্ন্যাসী ব্যবস্থা নয়। রাজনীতি হয় কৌশলের মধ্য দিয়ে। বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে কৌশল নিতে হয়। আপনি একটি বিশুদ্ধ জিনিস চাইছেন। অথচ সার্বিক বিশুদ্ধ বলতে কোনো বিষয় নেই। ভুল হতেই পারে।

জাগো নিউজ : আপনারা কৌশলী অবস্থান নিয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনার লড়াইয়ের কথা বলছেন, আবার ভোলার ঘটনাও দেখতে হচ্ছে…

রাশেদ খান মেনন : সাম্প্রদায়িকতা তো সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন। এই বাঙালি উদার ইসলামি ধারণায় বিশ্বাসী ছিল। সে বিশ্বাস থেকে মানুষ সরে আসছে। জামায়াতিরা দেড় দশক ধরে ওহাবি মতবাদ প্রচার করে আসছে। ইসলামিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দখলে চলে গেছে। লাখ লাখ ডলার ব্যয় হচ্ছে সমাজতন্ত্র ঠেকানোর জন্য। এ বাস্তবতা তো অস্বীকার করার উপায় নেই।

আগে আমাদের দেশের মেয়েরা শাড়ি পরে মাথায় ঘোমটা দিত, তাতে পর্দায় অসুবিধা হয়নি। এখন সবাই মিলে হিজাব পরাচ্ছি। আর আমরা কেউ ধর্ম অবমাননার ভয়ে হিজাবের বিরুদ্ধে কথা বলছি না।

এ লড়াই তো একটি চলমান প্রক্রিয়া। আগামী প্রজন্মকে আরও বেগবান হতে হবে। বিশ্ব যে সংঘাতের জায়গায় চলে গেছে, সেখান থেকে মুক্তি পেতে হলে নতুন প্রজন্মকেই এগিয়ে আসতে হবে।

জাগো নিউজ : ওহাবি রাজনীতির প্রসঙ্গ তুললেন। অথচ প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলছেন, মদিনা সনদের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করছেন…

রাশেদ খান মেনন : মদিনা সনদ হচ্ছে সকল ধর্মের মানুষকে সুরক্ষা দেয়ার চুক্তি। ইহুদিরাও সমধিকার ভোগ করেছেন। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, এ সনদে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম লেখা ছিল না।

১৪শ বছর আগে তখনকার বাস্তবতায় নবী মুহাম্মদ সমস্ত মতবাদ এক জায়গায় নিয়ে এসে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

জাগো নিউজ : মদিনা সনদ গুরুত্ব পেলে সংবিধানের দরকার কী?

রাশেদ খান মেনন : আপনার এ প্রশ্ন আমাকে অবাক করে দিচ্ছে। মদিনা সনদ হয়েছিল সেই সময়ের বাস্তবতায়। আমাদের সংবিধানে অনেক কিছুই আছে, এখনকার বাস্তবতায়।

জাগো নিউজ : তার মানে রাজনীতির জন্যই ‘মদিনা সনদ’র মতো প্রসঙ্গ তোলা?

রাশেদ খান মেনন : যারা ধর্মীয় রাজনীতি করেন, তারা মদিনা সনদ পড়েছেন কি-না, আমার সন্দেহ আছে। আমি স্কুল-কলেজের শিক্ষক নিয়োগের বোর্ডে থেকে মদিনা সনদ, বিদায় হজ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছি। ইসলামি শিক্ষা নিয়েও তারা বলতে পারেননি। এই হলো শিক্ষা!

জাগো নিউজ : বাংলাদেশে বাম রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী?

রাশেদ খান মেনন : আমি বাংলাদেশে বাম রাজনীতির ভবিষ্যৎ খারাপ দেখি না। কারণ, যে হারে বৈষম্য বাড়ছে তাতে সমাজতন্ত্র ছাড়া মুক্তি মিলবে না। প্রেক্ষাপটও বদলে যাচ্ছে। কিন্তু পুঁজির চরিত্র একই আছে। এ কারণেই বিশ্বব্যাপী বাম রাজনীতির উত্থান ঘটছে ফের। পর্তুগালের নির্বাচনে তা-ই প্রমাণ হলো।

জাগো নিউজ : বাম রাজনীতির নেতৃত্ব নিয়ে কী বলবেন?

রাশেদ খান মেনন : মুক্তিযুদ্ধ এবং এর পরবর্তী সময়ে বামপন্থীরা এমনভাবে বিভক্ত হয়েছেন যে, সংকট এখনও তীব্র। বামরা আণবিক বোমা হওয়ার কথা বলে বিচ্যুতি ঘটায়। অথচ, পরে বেলুন হয়ে চুপসে যায়। এখনও তা-ই দেখছি।

এএএস/এমএআর/এমএস

বামরা আণবিক বোমা হওয়ার কথা বলে বিচ্যুতি ঘটায়। অথচ, পরে বেলুন হয়ে চুপসে যায়। এখনও তা-ই দেখছি

যে হারে বৈষম্য বাড়ছে তাতে সমাজতন্ত্র ছাড়া মুক্তি মিলবে না। প্রেক্ষাপটও বদলে যাচ্ছে

সাম্প্রদায়িকতা তো সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন। এই বাঙালি উদার ইসলামি ধারণায় বিশ্বাসী ছিল। সে বিশ্বাস থেকে মানুষ সরে আসছে

রাজনীতি তো সন্ন্যাসী ব্যবস্থা নয়। রাজনীতি হয় কৌশলের মধ্য দিয়ে। বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে কৌশল নিতে হয়

একসময় জামায়াতের সঙ্গেও আওয়ামী লীগ আপস করেছে। তার পরিণতি কী হয়েছে, তা সবারই জানা

আমার বক্তব্য তাদের ক্ষুব্ধ করেছে। অপ্রস্তুত, বিব্রত করেছে। ভোটের বক্তব্যে আমি দুঃখ প্রকাশ করেছি