প্রকল্পের মধ্যে উগান্ডা সফরও রাখা হয়েছে, আজব!

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:৫৪ পিএম, ৩০ অক্টোবর ২০১৯

রাশেদ খান মেনন। সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। মহাজোটের অন্যতম নেতৃত্ব এবং সাবেক মন্ত্রী। সম্প্রতি বরিশালের এক সমাবেশে নির্বাচন, ভোট প্রসঙ্গ তুলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন বামপন্থী এ রাজনীতিক। তার ওই বক্তব্যের জেরে কৈফিয়ত চাওয়া হয় জোটের পক্ষ থেকে।

জাগো নিউজ-কে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বরিশালের সমাবেশে ল্যাঙ্গুয়েজে গন্ডগোল হয়ে যেতে পারে।’ এছাড়া নির্বাচন, ভোট ও গণতন্ত্রের প্রসঙ্গ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। দীর্ঘ আলোচনায় উন্নয়ন, দুর্নীতির প্রসঙ্গও গুরুত্ব পায়। সমালোচনা করেন ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে সরকারের যোগসাজশের বিষয়ে।

রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাজনীতি তো সন্ন্যাসী ব্যবস্থা নয়। রাজনীতি হয় কৌশলের মধ্য দিয়ে। বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে কৌশল নিতে হয়।’ মাঠের খেলায় গায়ে কাদা লাগবে না, তা হতে পারে না- বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে শেষটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

জাগো নিউজ : ক্যাসিনোকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সরকারের শুদ্ধি অভিযান চলছে। এ অভিযান নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

রাশেদ খান মেনন : আমি প্রশ্ন তুলব, এসব থাকল কী করে! এতগুলো সংস্থা কাজ করে অথচ কেউ বলল না। এটি অবাক করেছে। যেখানে ক্যাসিনো সেখান থেকে মতিঝিল থানার দূরত্ব ১০০ গজের মধ্যে। অথচ ডিএমপি কমিশনার বললেন, তিনি ক্যাসিনোর ‘ক’ জানতেন না। তার মানে, ক্যাসিনোকাণ্ডে গোয়েন্দাদের ব্যর্থতা প্রমাণ করে।

জাগো নিউজ : গোয়েন্দাদের এ ব্যর্থতার কথা সচেতনভাবে বলছেন?

রাশেদ খান মেনন : হ্যাঁ, আমি একেবারে সচেতনভাবেই বলছি। নইলে এমন ঘটনা ঘটে কী করে? ২০০৮ সালে আমি মতিঝিল সংসদীয় এলাকায় নির্বাচনে বিজয়ী হই। এর আগে বরিশালে নির্বাচন করেছি। ২০০৮ সালে জয়ী হওয়ার পর দেখলাম, বিভিন্ন জায়গায় দেহব্যবসা আর জুয়া খেলা হয়। জুয়া আর দেহব্যবসা বন্ধের অনুরোধ করেছিলাম পুলিশকে। আমি পুলিশের সহায়তায় দেহব্যবসা বন্ধ করলাম। হোটেলগুলোতে আর কিন্তু দেহব্যবসা দেখতে পাবেন না।

জাগো নিউজ : জুয়া?

রাশেদ খান মেনন : মুক্তিযুদ্ধ ক্লাবের নেতৃত্ব নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যে দ্বন্দ্ব হলো। আমি দেখলাম, ক্লাবে হাউজি ও ওয়ান টেন খেলা হয়। আমি বন্ধ করার নির্দেশ দিলাম। পরে তারা উচ্চ আদালতে গেল। উচ্চ আদালত রায় দিলেন ‘ওয়ান টেন হচ্ছে সুনিপুণ একটি অভ্যন্তরীণ ক্রীড়া’।

রায় পেয়ে তারা আমার কাছে আসল। আমি বললাম, অনুমতি দিতে পারব না। তারা পুলিশ কমিশনারের কাছে গেলেন। কমিশনার বললেন, এমপি অনুমতি না দিলে আমরা অনুমতি দিতে পারি না।

তখন তারা পুলিশ কমিশনারকে গালিগালাজ করতে শুরু করলেন।

জাগো নিউজ : এরা কারা?

রাশেদ খান মেনন : আমি তাদের নাম বলছি না।

জাগো নিউজ : আপনি নাম বলছেন না, কিন্তু ক্যাসিনোকাণ্ডে তো আপনার নাম বলছেন অনেকে…

রাশেদ খান মেনন : আমার নাম বলা নিয়ে কিছুই আসে যায় না। উচ্চ আদালতের রায়, পুলিশ সবই জানল। তারই ধারাবাহিকতায় ক্যাসিনো এলো।

জাগো নিউজ : আপনি ক্লাব এলাকার সংসদ সদস্য। দায় আপনার ওপরও বর্তায়…

রাশেদ খান মেনন : ক্যাসিনোর সংযোজন হয়েছে গত দেড় বছরে। মূলত নির্বাচনকালীন এটি ঘটেছে।

আমি ক্লাবে তো যাইনি। একবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কারণে একটি ক্লাবে গিয়েছি। আমি তো আমার মতিঝিলের সব খবর রাখতে পারি না। অনেক খুন হচ্ছে। মিল্কি খুন হলেন। আন্ডারওয়ার্ল্ডের অনেকেই এখানে আছে। আমি তো সব খবর রাখি না।

জাগো নিউজ : তাহলে এর দায় জনগণ কাকে দেবে?

রাশেদ খান মেনন : পদক্ষেপ তো নেয়া হয়েছে। এজন্য প্রশংসার দাবি রাখে সরকার। কেন ক্যাসিনো, সে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। কিন্তু বন্ধ হওয়া নিয়ে তো ইতিবাচক মন্তব্য করতে হবে।

জাগো নিউজ : ক্যাসিনোকাণ্ডে আপনার নাম আসার কোনো কারণ থাকতে পারে কি-না?

রাশেদ খান মেনন : বন্দুক যখন ঘুরানো হয়, সবচেয়ে দুর্বল লোকটির দিকে তাক করানো হয়।

আমি আগেই বলেছি, এ সংসদীয় আসন আমার না। এটি বিএনপির ছিল। আমি এসে উদ্ধার করেছি। আমাকে নির্ভর করতে হচ্ছে আওয়ামী লীগের ওপর। আমার দল এখানে ছোট একটি অংশ মাত্র। আওয়ামী লীগকে তো নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। তারা খুশি ছিল যে, আমি তাদের প্রতিপক্ষ কোনো বাহিনী দাঁড় করিনি। অন্য জায়গায় হলে সংঘাত হয়ে যেত।

জাগো নিউজ : নিজেকে দুর্বল ভাবছেন?

রাশেদ খান মেনন : আমি ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে দুর্বল ভাবছি না। বলছি, আমাকে বিতর্কিত করা তাদের জন্য সহজ হয়।

জাগো নিউজ : ১০ বছরে নয় লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। এর ভিত্তি কী?

রাশেদ খান মেনন : সাবেক অর্থমন্ত্রী (আবুল মাল আবদুল মুহিত) সংসদে দাঁড়িয়ে পাঁচ বছর আগে বলেছেন, ‘পাঁচ বছরে চার লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে, যা দিয়ে একটি বাজেট করা যেত’। পরের পাঁচ বছরে আরও সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে তাহলে। এটি অর্থনীতির হিসাব। আমার কথা নয়।

জাগো নিউজ : এমন হিসাবে কোথায় যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি?

রাশেদ খান মেনন : পুঁজির অর্থই হচ্ছে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করা। এখন তা-ই হচ্ছে। এটি দুনিয়াব্যাপী হচ্ছে।

আমি সমাজতন্ত্রের কথা বলছি না। একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের কথা মাথায় রাখলে, এ দুর্নীতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। সুইডেন, সুইজারল্যান্ড একটি পুঁজিবাদী দেশ। কিন্তু সেখানে তো দুর্নীতি নেই বললেই চলে।

আমরা নীতি দাঁড় করাতে পারিনি। হাজার কোটি টাকা ব্যাংকে জমা। অথচ রাষ্ট্র ট্যাক্স আদায় করতে পারে না তার কাছ থেকে। উন্নয়ন প্রক্রিয়া যদি কিছু মানুষের হাতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে দুর্নীতি হবেই।

জাগো নিউজ : তার মানে বালিশ ও পর্দাকাণ্ড এমন উন্নয়নেরই ফল?

রাশেদ খান মেনন : বালিশ দুর্নীতি কোনো বিষয়ই না। বালিশ-পর্দার চেয়ে ভয়ঙ্কর দুর্নীতির খবর আছে। সাংবাদিকরা ভয়ে সে খবর বের করছেন না। একটি প্রকল্প নয় মিলিয়ন ডলারে শেষ হওয়ার কথা। তা বাড়িয়ে ১৩ মিলিয়ন ডলার করা হচ্ছে। প্রকল্পের অতিমূল্যায়ন হচ্ছে। প্রকল্পের মধ্যে উগান্ডা সফরও রাখা হয়েছে, আজব! প্রকল্প শুরু না হতেই শত শত গাড়ি কেনা হয়। বিদেশে যাওয়া হয়!

উন্নয়ন হচ্ছে না, তা বলছি না। কিন্তু দুর্নীতি সব ম্লান করে দিচ্ছে।

জাগো নিউজ : ভোট নিয়ে আপনার মন্তব্যের পর অনেকে জোটের ভাঙন নিয়ে কথা বলছেন। আপনি কী বলবেন?

রাশেদ খান মেনন : সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কিন্তু জোট ভাঙবে এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি।

জাগো নিউজ : বিমল বিশ্বাস আপনার দল ছেড়ে চলে গেলেন। সামনে ওয়ার্কার্স পার্টির কংগ্রেস। দল ভাঙার কোনো আশঙ্কা?

রাশেদ খান মেনন : দল ভাঙবে না। বিমল বিশ্বাস চলে গেছেন তার অবস্থান থেকে। জোটে যাওয়ার সব সিদ্ধান্ত তার পরামর্শে হয়েছে। নৌকা প্রতীক পাওয়া, আমাদের মন্ত্রী হওয়া- সব বিষয়ে তার সম্মতি আছে। তিনিও নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছেন। কিন্তু হেরে গেছেন। তার আসনে মাশরাফিকে মনোনয়ন দেয়ার পরই তিনি বিরাগভাজন হন।

তবে এমন একজন ব্যক্তি চলে যাওয়ার কারণে দলে ধাক্কা লাগবেই। কিন্তু তার কারণে দল ভাঙবে- এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। হয়তো তিনি অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এমনটি করলেন।

জাগো নিউজ : পার্টির আসন্ন কংগ্রেস নিয়ে কী বলবেন?

রাশেদ খান মেনন : পার্টির গঠনতন্ত্র আছে। সে অনুযায়ী কংগ্রেস হবে। আলোচনায় ভিন্ন মত আসছে। সে আলোচনা গুরুত্ব পাবে কংগ্রেসে। ভোট হবে। ভোটের মাধ্যমেই নেতা নির্বাচিত হবে।

এএসএস/এমএআর/পিআর

বালিশ দুর্নীতি কোনো বিষয়ই না। বালিশ-পর্দার চেয়ে ভয়ঙ্কর দুর্নীতির খবর আছে। সাংবাদিকরা ভয়ে সে খবর বের করছেন না

হাজার কোটি টাকা ব্যাংকে জমা। অথচ রাষ্ট্র ট্যাক্স আদায় করতে পারে না তার কাছ থেকে

আমাকে নির্ভর করতে হচ্ছে আওয়ামী লীগের ওপর। আমার দল এখানে ছোট একটি অংশ মাত্র। আওয়ামী লীগকে তো নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না

কেন ক্যাসিনো, সে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। কিন্তু বন্ধ হওয়া নিয়ে তো ইতিবাচক মন্তব্য করতে হবে

ডিএমপি কমিশনার বললেন, তিনি ক্যাসিনোর ‘ক’ জানতেন না। তার মানে, ক্যাসিনোকাণ্ডে গোয়েন্দাদের ব্যর্থতা প্রমাণ করে

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]