বালিশ-পর্দার চেয়েও ভয়াবহ দুর্নীতি হয়েছে

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:০২ পিএম, ০৪ নভেম্বর ২০১৯

শ ম রেজাউল করিম। মন্ত্রী, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের শুদ্ধি অভিযানের প্রসঙ্গ নিয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। দুর্নীতি নির্মূলে সবার অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ছাড়া সমাজের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

সরকারের চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ‘নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত’ উল্লেখ করে ‘যতদিন প্রয়োজন এ অভিযান চলবে’ বলে জানান। ‘দুর্নীতির ভয়াবহতা আমাকে অবাক করেনি’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে রাজনীতি ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও আলোকপাত করেন। তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে দ্বিতীয়টি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

জাগো নিউজ : আগের পর্বে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন। দুর্নীতির কারণে সরকার বিপর্যস্ত কি-না, যে কারণে অভিযান পরিচালনা করতে হলো?

শ ম রেজাউল করিম : না। বালিশ-পর্দার চেয়ে ভয়াবহ দুর্নীতি হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী এতিমের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এর চেয়ে দুর্নীতি আর কী হতে পারে?

রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে গ্রেনেড হামলা করা হয়। এর চেয়ে ভয়াবহ ঘটনা আর কী হতে পারে! এটিও দুর্নীতি। পুলিশ দিয়ে সেদিনের আলামত ধ্বংস করার নির্দেশ দেয়া হলো। জজ মিয়ার ঘটনা দুর্নীতির অংশ। বিচারপতি জয়নুল আবেদিনকে দিয়ে বলানো হলো, পাশের দেশ দিয়ে এটি করানো হয়েছে। ১০ ট্রাক অস্ত্র কী দুর্নীতির মধ্যে পড়ে না?

জাগো নিউজ : এসব ঘটনার জবাব খালেদা জিয়ার সরকার পেয়েছে ২০০৮ সালের নির্বাচনে। শেখ হাসিনার সরকারের দুর্নীতি নিয়ে কী ভাবছে মানুষ?

শ ম রেজাউল করিম : মানুষ শেখ হাসিনার সরকারে ভরসা রাখছে। ক্যাসিনো বড় অপরাধ নয়। অনেক দেশেই আছে। অথচ আমরা ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িতদেরও পাকড়াও করেছি। ছোট-বড় সব দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

জাগো নিউজ : ক্যাসিনো ঘটনার মধ্য দিয়ে আসলে কী বের হলো?

শ ম রেজাউল করিম : ক্যাসিনোর মধ্য দিয়ে বের হয়েছে অনৈতিকতা। অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনের মধ্য দিয়ে ভোগ-বিলাসের চিত্র বেরিয়েছে।

জাগো নিউজ : ‘ক্যাসিনো’ ঘটনায় রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্ত হলো, না-কি লাভবান হলো?

শ ম রেজাউল করিম : আওয়ামী লীগ ক্যান্টনমেন্ট থেকে তৈরি হওয়া কোনো দল নয়। আওয়ামী লীগ জনগণের কল্যাণ করেই আজকের এ অবস্থানে এসেছে। চলমান অভিযান নিয়ে আমরা তৃপ্ত। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ লাভবান হয়েছে।

rezaul-karim

বাংলাদেশ দেখাতে পেরেছে যে, একটি দেশ স্বাধীন করা যায়। আওয়ামী লীগ দেখাতে পেরেছে যে, দুর্নীতি করলে দলের লোকও ছাড় পায় না।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ উপকৃত হচ্ছে।

জাগো নিউজ : জে কে শামীম নামের একজন ঠিকাদার ১৫০০ কোটি টাকার ঘুষ দিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেল। কোটি কোটি টাকা পাচারের খবরও মিলছে এমন অভিযানে। নেতিবাচক প্রভাব তো পড়ছে জনমনে…

শ ম রেজাউল করিম : দেখুন, সব তথ্য সঠিক নয়। ঘুষ দিতে আপনি দেখেননি। আদালতে এখনও প্রমাণ হয়নি।

জাগো নিউজ : অভিযোগ তো উঠছে এবং অভিযান চলছে তার ভিত্তিতে…

শ ম রেজাউল করিম : সব অভিযোগ সঠিক নয়। ১৫০০ কোটি টাকা ঘুষের নির্ভরযোগ্য তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে ঘুষের কথা অস্বীকার করছি না।

দলের মধ্য থেকেই সরকার অভিযান শুরু করেছে। অন্যকে শুধরাতে হলে নিজেকে আগে শুধরাতে হয়। প্রধানমন্ত্রী দলের মধ্যে শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে সেটাই প্রমাণ করছেন।

জাগো নিউজ : অভিযান লোক দেখানো বলেও প্রচার রয়েছে। যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট, খালিদ বা জে কে শামীমদের আটক করলেও রাঘববোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরে…

শ ম রেজাউল করিম : যারা এমন অভিযোগ করছেন, তারা রাঘববোয়ালদের নামের তালিকা দিক, প্রমাণ দিক। সরকার ব্যবস্থা নেবে।

জাগো নিউজ : এ সরকারের টানা ১১ বছর যাচ্ছে। মন্ত্রী, এমপি বা সচিবদের জানার বাইরে কি ইসমাইল হোসেন সম্রাটদের কর্মকাণ্ড?

শ ম রেজাউল করিম : আমি সবার দায়িত্ব নিয়ে কথা বলতে চাই না। আমার নিজের জায়গা থেকে শক্ত অবস্থান নিয়ে বলছি, সততাকে ধারণ করতে পারলে দেশ অনেক দূর এগিয়ে যেত। দেশপ্রেমকে ধারণ করলে অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

তবে এটিও সত্য যে, আমাদের বিদ্যমান ব্যবস্থা হঠাৎ করে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এ ব্যবস্থা দীর্ঘদিনের। একটি প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি হয় নিম্ন পর্যায়ের এক প্রকৌশলী দ্বারা। ৩০ কোটি টাকার নিচে একটি কাজ হলে মন্ত্রণালয় তো দূরের কথা, প্রধান প্রকৌশলীর কাছেও আসে না।

rezaul-karim

আমি মনে করি, সমাজব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন দরকার। একজন মানুষের আসলে কত টাকা দরকার! কবরে তো এক টাকাও নিতে পারবে না। একজন মানুষের আসলে কয়টা বিল্ডিং দরকার? অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মানুষ মরিয়া।

জাগো নিউজ : এ অসুস্থ প্রতিযোগিতা তো রাজনীতিই সুযোগ করে দিচ্ছে…

শ ম রেজাউল করিম : ১৯৭৫ সালের পর অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা দিয়েই সর্বনাশ করা হয়েছে। যদি সত্যিকার রাজনীতিকদের হাতে দেশ পরিচালনার ধারাবাহিকতা থাকত, তাহলে এমনটি হতো না।

জাগো নিউজ : আওয়ামী লীগও দীর্ঘ সময় ক্ষমতায়। সমাজ পরিবর্তনে ভরসা দিতে পারলেন কি?

শ ম রেজাউল করিম : ১৯৪৭ সালের পর দুর্নীতিবিরোধী এমন অভিযান কোনো সরকার দেখাতে পারেনি। আমরা নিজ দলের মধ্যে অভিযান পরিচালনা করছি। এ কারণেই মানুষ ভরসা পাচ্ছে।

জাগো নিউজ : এ অভিযানের শেষ কোথায়?

শ ম রেজাউল করিম : এ অভিযান অনন্তকাল চলবে, আমি তা মনে করি না। যতদিন দুর্নীতি থাকবে ততদিন অভিযান চলবে।

জাগো নিউজ : প্রশাসন, পুলিশ দিয়ে অভিযান চালানো হচ্ছে। দুর্নীতির অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধেও। এমন অভিযানে সত্যিকারের সুফল আসবে কি?

শ ম রেজাউল করিম : প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শুধু রাজনীতিক নয়, অনেকেই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। অপেক্ষা করুন, সব দেখতে পাবেন

জাগো নিউজ : আপনার উপলব্ধি কী?

শ ম রেজাউল করিম : আমলা বা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধেই শুধু অভিযোগ নয়। সাংবাদিকরাও মাসোহারা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ এমপি, রাজনীতিকদের বিরুদ্ধেও। দুর্নীতির দুষ্টচক্রে অনেকেই জড়িত।

মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। আত্মশুদ্ধি আনতে হবে। যারা বেশি পচে গেছে, তাদের ছেঁটে ফেলতে হবে।

এএসএস/এমএআর/এমএস

সাবেক প্রধানমন্ত্রী এতিমের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এর চেয়ে দুর্নীতি আর কী হতে পারে

মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। আত্মশুদ্ধি আনতে হবে। যারা বেশি পচে গেছে, তাদের ছেঁটে ফেলতে হবে

১৯৭৫ সালের পর অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা দিয়েই সর্বনাশ করা হয়েছে

একজন মানুষের আসলে কত টাকা দরকার! কবরে তো এক টাকাও নিতে পারবে না

অন্যকে শুধরাতে হলে নিজেকে আগে শুধরাতে হয়। প্রধানমন্ত্রী দলের মধ্যে শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে সেটাই প্রমাণ করছেন

ক্যাসিনো বড় অপরাধ নয়। অনেক দেশেই আছে। অথচ আমরা ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িতদেরও পাকড়াও করেছি