পরিবেশবিদ! অথচ পরিবেশ নিয়ে তাদের লেখাপড়াও নেই

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:২৮ পিএম, ০৫ নভেম্বর ২০১৯

শ ম রেজাউল করিম। মন্ত্রী, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের শুদ্ধি অভিযানের প্রসঙ্গ নিয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। দুর্নীতি নির্মূলে সবার অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ছাড়া সমাজের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

সরকারের চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ‘নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত’ উল্লেখ করে ‘যতদিন প্রয়োজন এ অভিযান চলবে’ বলে জানান। ‘দুর্নীতির ভয়াবহতা আমাকে অবাক করেনি’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বালিশ-পর্দার চেয়েও ভয়াবহ দুর্নীতি হয়েছে’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী এতিমের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এর চেয়ে দুর্নীতি আর কী হতে পারে?’ দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে রাজনীতি ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও আলোকপাত করেন। তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে শেষটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ : ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে ফের সমালোচনা। প্রধানমন্ত্রীর সর্বশেষ ভারত সফরের মধ্য দিয়ে যেসব চুক্তি সম্পন্ন হলো, তা একতরফাভাবে ভারতের অনুকূলে বলে কূটনীতিক বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন। কী বলবেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে?

শ ম রেজাউল করিম : প্রধানমন্ত্রী তার ভারত সফর নিয়ে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন সংবাদ সম্মেলনে। আমি মনে করি, ভারতের সঙ্গে যেকোনো সময়ের চেয়ে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন ভালো। ৬৭ বছরের ছিটমহল সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। শান্তিপূর্ণভাবে জলসীমার সমাধান হয়েছে। ভারতের সঙ্গে আমাদের অনেক অমীমাংসিত বিষয় আছে। অদূর ভবিষ্যতে সব সমস্যা দূর করা সম্ভব হবে বলে আশা করি।

জাগো নিউজ : অনেকেই অভিযোগ করছেন, বাংলাদেশ ক্রমশই নতিস্বীকারের সম্পর্কে যাচ্ছে ভারতের সঙ্গে…

শ ম রেজাউল করিম : যে কূটনীতিক বিশ্লেষক এমন মন্তব্য করেন, তারা হচ্ছেন ব্রাকেটবন্দি কূটনীতিক। সমুদ্রসীমার সমাধান, ছিটমহল সমাধান, পানির সমস্যা সমাধান নিয়ে তারা কোনো দিন প্রশংসা করেননি।

জাগো নিউজ : তখন তো প্রশংসাও মিলেছে...

শ ম রেজাউল করিম : না, তারা প্রশংসার সঙ্গে ‘তবে’, ‘কিন্তু’ শব্দগুলো প্রয়োগ করেন। অ্যান্টি আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবীরা কখনও এ সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করেননি। খালেদা জিয়াও ভারত সফর করেছেন। কী এনেছেন?

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কখনই নতজানু পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাস করে না। এটি করলে ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের গ্যাস রফতানির প্রস্তাব মেনে নিয়ে ক্ষমতায় আসতাম আমরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জন কেরি বা বান কি মুনের ফোনে কাদের মোল্লার ফাঁসি বন্ধ করেননি।

rezaul-karim

জাগো নিউজ : গ্যাস রফতানিতে রাজি হয়নি বলে ২০০০ সালে ক্ষমতায় আসতে পারেনি আওয়ামী লীগ। এখন তো ভারতে গ্যাস রফতানির সিদ্ধান্ত হলো!

শ ম রেজাউল করিম : এটি ভুল তথ্য। বাইরে থেকে কাঁচামাল এনে আমরা প্রক্রিয়াজাতকরণ করে ভারতে রফতানি করব। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস আমরা রফতানি করব না।

জাগো নিউজ : বাইরে থেকে কাঁচামাল এনে প্রক্রিয়াজাতকরণ করে ভারতে রফতানি করার বিশেষত্ব কী?

শ ম রেজাউল করিম : বাংলাদেশ থেকে অনেক কিছুই ভারতে রফতানি হয়। আজ আমাদের বিদ্যুৎ উপচে পড়ছে। বিদ্যুৎও আমরা রফতানি করতে পারি। যেখানে লাভ সেখানে আমরা যেতেই পারি।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে সুতা এনে আমরা কাপড় তৈরি করে ফের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাচ্ছি। এটা নিয়ে তো প্রশ্ন তোলা হয় না।

জাগো নিউজ : কাপড় উৎপাদন আর বিদ্যুৎ উৎপাদন কি এক! নদী, বন, মাটি, পানি তথা জনজীবন বিপন্ন করে বিদ্যুৎ-গ্যাস রফতানিতে আসলে সার্থকতা কোথায়?

শ ম রেজাউল করিম : প্রেস ক্লাবের সামনে কয়েকজন তাত্ত্বিক প্রতিনিয়ত দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন যে, দেশ ধ্বংস হয়ে গেল! সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে গেল! তারা সুন্দরবনের কাছেও যাননি। তারা মহাজ্ঞানী ভাবেন নিজেদের।

বাংলাদেশের প্রখ্যাত পরিবেশ বিজ্ঞানীরা সুন্দরবন নিয়ে কিন্তু প্রশ্ন তোলেননি।

জাগো নিউজ : অনেক পরিবেশবিদ বিরোধিতা করছেন। সুন্দরবনে বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আপত্তি তুলেছিল ইউনেস্কোও…

শ ম রেজাউল করিম : অনেক পরিবেশবিদ আছেন, তারা নিজেদের ‘বিদ’ ঘোষণা করেছেন। পরিবেশবিদ! অথচ পরিবেশ নিয়ে তাদের লেখাপড়াও নেই। প্রেস ক্লাবে বসে তারা পরিবেশবিদ।

জাগো নিউজ : এমন প্রকল্প নিয়ে আওয়ামী লীগেরও বিরোধিতা ছিল। ফুলবাড়ী কয়লা খনির কথা নিশ্চয়ই স্মরণ করবেন…

শ ম রেজাউল করিম : আমরা ক্ষতিকর কোনো প্রকল্প করছি না। পরিবেশের ক্ষতি করলে বাংলাদেশ পরিবেশের ওপর অ্যাওয়ার্ড পেত না। বাংলাদেশের উন্নয়ন হচ্ছে পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়েই।

জাগো নিউজ : রামপালে ভারতের যে কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে যাচ্ছে, সে কোম্পানি ভারতে প্রকল্প করতে পারেনি বলেও অভিযোগ আছে। সেখানে প্রকল্প বন্ধও করতে হয়েছে…

শ ম রেজাউল করিম : এ তথ্যও সঠিক না। বাংলাদেশ থেকে অনেকেই শ্রীলঙ্কায় গিয়ে পোশাক উৎপাদন করছে। তাই বলে কি তাদের বলা হবে যে, বাংলাদেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে? ভারতে তাড়ানো কোম্পানি বাংলাদেশে এসে প্রকল্প করছে না? একজন মন্ত্রী হিসেবে জেনেশুনে এটি বলছি। গণমাধ্যমের সস্তা আলোচনা ধরে সঠিক বিশ্লেষণ পাওয়া যায় না।

rezaul-karim

জাগো নিউজ : যে উন্নয়নের কথা বলছেন, তা এখানকার জনজীবনের জন্য কতটুকু প্রাসঙ্গিক?

শ ম রেজাউল করিম : শতভাগ প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি। মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেই উন্নয়ন। মানুষ আর না খেয়ে থাকছে না। বস্ত্রহীন থাকছে না। টাকার অভাবে গরিব সন্তানদের পড়া বন্ধ হচ্ছে না। সমগ্র বাংলাদেশ এখন ডিজিটালাইজেশনের আওতায়।

বিশ্ব অবাক বাংলাদেশের উন্নয়নে। এরপরও একটি কথা আছে, ‘যাকে দেখতে নারী, তার চলন বাঁকা’। আওয়ামী লীগের কোনো সফল কাজই অনেকে পছন্দ করেন না।

জাগো নিউজ : এ উন্নয়ন বৈষম্যও সৃষ্টি করেছে। কোটিপতির সংখ্যা ৮০ হাজার ছাড়িয়েছে…

শ ম রেজাউল করিম : একটি গ্লাসে অর্ধেক পানি। আপনি ইতিবাচক মনে হলে বলবেন, আধাগ্লাস পানি আছে। নেতিবাচক হলে বলবেন, অর্ধেক গ্লাস খালি।

হাজার হাজার মানুষ কোটিপতি হয়েছে মানে, বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে। এই কোটিপতিরা কিন্তু টাকা কাজেই লাগাচ্ছে। মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

জাগো নিউজ : নেতিবাচক হলেও ‘গ্লাসের অর্ধেক খালি’ কথাটি তো সত্য। সমাজের অধিকাংশ মানুষই বৈষম্যের শিকার- এমন বাস্তবতা তো অস্বীকার করা যায় না…

শ ম রেজাউল করিম : একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, সবাই কিন্তু কোটিপতি হবে বা কোটিপতি হওয়ার প্রক্রিয়ায় নেই। স্তরভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা থাকবেই। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, মানুষ যেন তার সাংবিধানিক জায়গা থেকে বঞ্চিত না হয়।

জাগো নিউজ : ভোলার সহিংসতা প্রসঙ্গ। কী বলবেন?

শ ম রেজাউল করিম : ভোলার ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। একটি ব্লেড সেভ করার জন্য ব্যবহার করা যায়, আবার কারও গলা কাটার জন্যও ব্যবহার করা যায়। ফেসবুক অবশ্যই ভালো কিছু দিচ্ছে। কিন্তু এর অপব্যবহারও আছে। ভোলার ঘটনা তেমনই অপব্যবহার।

জাগো নিউজ : এ অপব্যবহারের মধ্য দিয়ে সমাজ কোথায় যাচ্ছে?

শ ম রেজাউল করিম : সমাজ কোথাও যাচ্ছে না। মনে রাখতে হবে, বিপ্লব মানে তাণ্ডবলীলা নয়, সৃষ্টির প্রসব বেদনামাত্র। ভালো কিছু সৃষ্টির আগে এমন দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। হয়তো ভালো কিছু অপেক্ষা করছে।

জাগো নিউজ : ভোলার সহিংসতা জনমনের ক্ষোভের প্রকাশও বলে মনে করছেন অনেকে…

শ ম রেজাউল করিম : তৌহিদী জনতা নামকরণটিই আপত্তিকর। আমরা কি তৌহিদী না? অনেকেই বলেন দেশপ্রেমিক। তার মানে অন্যরা দেশপ্রেমিক না। অনেকেই তৌহিদী শব্দটির অর্থও জানে না।

তবে বাংলাদেশে একটি ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট আছে। আমি এ সেন্টিমেন্টকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু অনেকেই ‘ঘর পোড়ার মধ্যে আলু পোড়া’ দেয়ার মতো করে এ সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগাতে চায়।

জাগো নিউজ : ‘সেন্টিমেন্ট’ কাজে লাগানোর ঘটনা বাড়ছে কি-না?

শ ম রেজাউল করিম : না। আমি তা মনে করি না। ৫ মে হেফাজতের সমাবেশেও আমরা তা-ই দেখলাম। পরে কিন্তু তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে।

জাগো নিউজ : মহাজোটের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ভোট ডাকাতির সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন, ‘গত নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেননি’। তার এমন বক্তব্য কীভাবে দেখছেন?

শ ম রেজাউল করিম : রাশেদ খান মেনন বরিশালের সমাবেশে ভোট ডাকাতির কথা বলেননি। মানুষ ভোট দিতে পারেননি- কথাটি মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে, এমনটি পরে উল্লেখ করেছেন তিনি। মুখ ফসকে অনেক কথাই বলা হয়। তাই বলে গোটা আলোচনার ধারাবাহিকতা এমন হয়ে যায় না। অসতর্কতার কারণে অনেক শব্দই বেরিয়ে যায়।

রাশেদ খান মেনন দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ১৪ দলের কাছে লিখিতভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এ কারণে আমি আর কিছু বলতে চাই না।

জাগো নিউজ : জোটের মধ্যে কোনো টানাপোড়েন?

শ ম রেজাউল করিম : অনেকেই আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গেছে। জোট থেকেও চলে যায়। তাতে আওয়ামী লীগ বা জোটে কোনো সমস্যা হয়নি। ড. কামাল হোসেনরা আলাদা দল করেছেন আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে। হালে পানি পায়নি। বাইরে থেকে কে কী বলল, তাতে কিছু যায়-আসে না। আওয়ামী লীগ মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে।

এএসএস/এমএআর/জেআইএম

অনেকেই ‘ঘর পোড়ার মধ্যে আলু পোড়া’ দেয়ার মতো করে এ সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগাতে চায়

হাজার হাজার মানুষ কোটিপতি হয়েছে মানে, বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে। এই কোটিপতিরা কিন্তু টাকা কাজেই লাগাচ্ছে। মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে

এরপরও একটি কথা আছে, ‘যাকে দেখতে নারী, তার চলন বাঁকা’। আওয়ামী লীগের কোনো সফল কাজই অনেকে পছন্দ করেন না

প্রেস ক্লাবের সামনে কয়েকজন তাত্ত্বিক প্রতিনিয়ত দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেয় যে, দেশ ধ্বংস হয়ে গেল! সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে গেল! তারা সুন্দরবনের কাছেও যায়নি

যুক্তরাষ্ট্র থেকে সুতা এনে আমরা কাপড় তৈরি করে ফের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাচ্ছি। এটা নিয়ে তো প্রশ্ন তোলা হয় না

অ্যান্টি আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবীরা কখনও এ সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করেনি। খালেদা জিয়াও ভারত সফর করেছেন। কী এনেছেন?