নারীর এগিয়ে যাওয়া সত্যিই ঈর্ষণীয়

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:৫৬ পিএম, ১৯ নভেম্বর ২০১৯

অ্যাডভোকেট সালমা আলী। মানবাধিকার আইনজীবী। সাবেক নির্বাহী প্রধান, বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি। নারীর অধিকার ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরে। বিশেষ করে নারী পাচাররোধ এবং প্রবাসী নারী শ্রমিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা রাখছেন এ মানবাধিকার নেত্রী।

সম্প্রতি প্রবাসী নারী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। আলোচনায় গুরুত্ব পায় দেশের নারী উন্নয়নও। তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে শেষ পর্ব। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ : মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নারী শ্রমিক পাঠানোর পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হচ্ছে, আপনি কী মনে করেন?
সালমা আলী : আমি মনে করি, সৌদি আরবে অদক্ষ নারী শ্রমিক না পাঠাতে অনুরোধ করছি। আর সকল প্রকার নির্যাতন বন্ধের জন্য আমাদের নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের দাবি জানাচ্ছি। কারণ, নির্যাতনের শিকার পুরুষ শ্রমিকরাও হচ্ছেন।

জাগো নিউজ : নির্যাতনের মধ্যেও নারী শ্রমিকরা বিদেশ যাচ্ছেন এবং নানা প্রলোভনে পড়েই।
সালমা আলী : এই প্রলোভন অনেকটাই মিথ্যার বেড়াজালে আটকা। বলা হয়, নারীরা অর্থ ছাড়াই বিদেশ যেতে পারছে। আমি দেখেছি, সৌদি আরবের ক্ষেত্রে প্রতিজন নারীকে কোনো না কোনোভাবে টাকা দিতেই হচ্ছে। হয় দালালদের, নইলে জনশক্তি রফতানি ব্যুরোকে।

জাগো নিউজ : আপনার পরামর্শ কী?
সালমা আলী : এই প্রতারণা এবং নির্যাতন বন্ধ করা খুব কঠিন কাজ না। ঢেলে সাজাতে হবে। দূতাবাসের কর্মকর্তারা যদি একটু দায়িত্বশীল হন, তবেই হয়রানি, নির্যাতন অনেকটা কমে যাবে। শ্রমিকের স্বার্থ যদি রক্ষা করতে নাই পারি, তাহলে তাকে বিদেশ পাঠানো কী দরকার?

জাগো নিউজ : যে নারীরা যাচ্ছেন, তাদেরও সচেতনতার ব্যাপার থাকে...
সালমা আলী : অবশ্যই। আপনাকে দেখতে হবে বিদেশে শ্রম দিতে যাচ্ছে কোন পরিবারের নারীরা। যারা পরিবারে অবহেলিত, স্বামীর সংসারে নির্যাতিত, সমাজে নানাভাবে প্রতারিত, তারাই যাচ্ছে সাধারণত।

সামাজিক এবং আর্থিকভাবে অসহায় নারীদের নানা প্রলোভনে পাঠানো হচ্ছে। এ কারণে আমি মাইগ্রেশনের পরিবর্তে অনেকটা নারীপাচার বলে থাকি। মানবপাচার এবং অনিরাপদ অভিবাসনের মধ্যে সূক্ষ্ম একটি মিল আছে। দুটোই প্রলোভনের মাধ্যমে বর্ডার ক্রস করানো হয়। বর্ডার ক্রস করে পতিতাবৃত্তি করানো হলে আমরা পাচার বলে ধরে নেই। অথচ অন্য পেশার জন্যও নারীপাচার করা হয়।

জাগো নিউজ : আপনি দীর্ঘদিন থেকে নারী শ্রমিক এবং পাচার নিয়ে কাজ করছেন। আইনি অভিজ্ঞতায় কী বলবেন?
সালমা আলী : যারা নারী পাচার এবং বিদেশে পাঠায় তারা খুবই সংগঠিত। আমি বেশ কিছু ঘটনা নিয়ে মামলা করেছি। দেখেছি, আমাদের আইনজীবী ভাইরাই পাচারকারীর পক্ষ নিয়ে মিটমাট করে দেন। মানবপাচাররোধে আইন আছে। আইনের প্রয়োগ নেই। মানবপাচার নিয়ে ট্রাইব্যুনাল করা হলো ৭ বছর পর। অথচ আইন করা হয়েছিল ২০১২ সালে।

জাগো নিউজ : এই ট্রাইব্যুনাল নিয়ে আশাবাদী আপনি?
সালমা আলী : দেশে অনেক কিছুই প্রতিষ্ঠা করা হয়। আইনের পরিবর্তন হয়। কিন্তু প্রয়োগ হয় না। সিস্টেম করে লাভ নেই, যদি তার ব্যবহার না হয়। জবাবদিহিতার আওতায় এনে দ্রুত বিচার করলেই রিক্রুটিং এজেন্ট, ট্রাভেল এজেন্টগুলো তাদের দায়ের বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবে।

salma

প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রাইব্যুনাল পরিচালনা করবে কারা? যারা এ নিয়ে কাজ করছেন, তাদের দায়িত্ব না দিলে সিস্টেম কাজ করবে না। শিশুশ্রম, গৃহকর্মী, নারী পাচার, প্রবাসী শ্রমিক নিয়ে অনেকেই কাজ করছেন। তাদের সঙ্গেও সরকার আলোচনা করতে পারে। সচেতনতার জন্যও তো আলোচনা হতে পারে। মানুষ সচেতন হলে অনেক নির্যাতনই কমে আসবে।

লাশ আসছে প্রতিনিয়ত! এর চেয়ে ভয়াবহ কথা আর কী হতে পারে? নির্যাতন বন্ধে সরকারের মধ্য থেকে আগে কমিটমেন্ট দরকার। দায় সরকারেরই। নানা কথা বলে সেই দায় এড়াতে পারে না। সৌদি আরবের মতো রাষ্ট্রে রাজনৈতিকভাবে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ হয়। অথচ, অনেক ভালো আমলা আছেন, যারা আন্তর্জাতিক ফোরামে দায়িত্ব পালন করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। দক্ষ আমলারা যেভাবে আলোচনা করতে পারবেন, একজন রাজনৈতিক নেতা সেটা পারবেন না। সব কিছু রাজনৈতিক বিবেচনায় নিলে ফল ভালো হবে না।

রাষ্ট্রদূত সব সুবিধা ভোগ করছেন। আর নারী শ্রমিকরা নরকে থাকছেন, এটি হতে পারে না। আমি এখানে সরকারের নজরদারি বাড়াতে জোর দাবি জানাচ্ছি।

জাগো নিউজ : বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে উন্নয়নের সড়কে। নারী উন্নয়ন কেমন দেখছেন?
সালমা আলী : নারীর এগিয়ে যাওয়া সত্যিই ঈর্ষণীয়। নারী উন্নয়নে নীতিমালা হয়েছে ২০১০ সালে। নারী পাচাররোধে আইন হয়েছে। নারীর অধিকারে সরকার কাজ করছে। মানুষও এখন অনেক সচেতন। নারী ঘর থেকে বের হচ্ছেন, এটিই বড় আশার কথা। নারীরা তালাক দেয়ার ক্ষমতা রাখছেন। নারী নিজে থেকে তালাক দিয়ে দেনমোহরের অর্থ দাবি করতে পারছেন। স্বামী ছাড়াও নারী অনেক পরিবারে কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

জাগো নিউজ : এর বিপরীতে নির্যাতনে ভয়াবহতার গল্পও আছে।
সালমা আলী : হ্যাঁ। সভ্যতার উন্নয়নে নির্যাতনের মাত্রাও বদলে গেছে। প্রযুক্তির কারণে নারী প্রতিনিয়ত হয়রানি শিকার হচ্ছেন। পর্নোগ্রাফির শিকার হচ্ছেন। বর্বরতাও বেড়ে গেছে। যখন যেটার প্রয়োজন সরকার সেটা তখন করে না। প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ শুরু থেকে করতে পারলে এত নির্যাতন হতো না। আমরা সরকারের সঙ্গে থেকে কাজ করতে চাই। চাপে রেখেও কাজ করতে চাই। কিন্তু সরকার সেটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়।

বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, গণতন্ত্রের অভাব, পুলিশ প্রশাসনের দুর্নীতির কারণেই নারীর ওপর নির্যাতন কমছে না বলে বিশ্বাস করি। মানুষের ভোটের অধিকার নেই বলেও অন্য অধিকার খর্ব হচ্ছে। জাতীয় সংসদের প্রতিনিধিরা জনগণের কাছে আর জবাবদিহি করেন না। কারণ, তিনি মনে করেন জনগণের ভোট ছাড়াই সংসদ সদস্য হয়েছেন। সংসদ সদস্যদের মধ্যে যখন জবাবদিহিতা থাকে না, তখন সমাজের সব জায়গাতেই পচন ধরে। আমরা বিচার বিভাগ, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় এখন তাই দেখতে পাচ্ছি। এ কারণেই টেকসই গণতন্ত্র এবং জবাবদিহিতার বিকল্প নেই। আর এটি হলেই নারীবান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠা পাবে।

এএসএস/আরএস/জেআইএম

নারীদের নানা প্রলোভনে পাঠানো হচ্ছে, যা নারীপাচার বলে থাকি। মানবপাচার এবং অনিরাপদ অভিবাসনের মধ্যে সূক্ষ্ম একটি মিল আছে

সৌদি আরবে অদক্ষ নারী শ্রমিক না পাঠাতে অনুরোধ করছি। আর সকল প্রকার নির্যাতন বন্ধে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় দরকার

দেশে অনেক কিছুই প্রতিষ্ঠা করা হয়, আইনের পরিবর্তন হয় কিন্তু প্রয়োগ হয় না