জয়-লেখকে আস্থা ফিরলেও জট কাটেনি ছাত্রলীগে

আল সাদী ভূঁইয়া
আল সাদী ভূঁইয়া আল সাদী ভূঁইয়া , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৪১ পিএম, ২৫ নভেম্বর ২০১৯

অপকর্মে জড়িত থাকলেই ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার- এমন নীতি গ্রহণ করেছেন সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। এতে কমে এসেছে অপকর্মের মাত্রা। শুধু তাই নয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অন্যতম নির্দেশনা ‘প্রোটোকল ছাড়া চলা’, মধুর ক্যান্টিনে নিয়মিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে বসা এবং গতানুগতিক জীবনযাপন করায় নেতাকর্মীদের আস্থা অর্জন করেছেন তারা।

তবে প্রতিশ্রুতি দিয়েও কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বিতর্কিতদের বহিষ্কার না করা এবং কমিটির মেয়াদ দেড় বছরে পা দিলেও বিভিন্ন ইউনিটের কমিটি না দেয়ায় জটিলতাও বেড়েছে সংগঠনটিতে। এতে ক্ষুব্ধ বিভিন্ন ইউনিটের শীর্ষপদের প্রার্থীরা। সংগঠনের এমন মন্থর গতিতে কার্যক্রম চালানোয় তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ কেন্দ্রীয় নেতারাও। তাদের অভিযোগ, দেড় মাস দায়িত্ব গ্রহণের পরও কেন্দ্রীয় নেতাদের দায়িত্বভার বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। এমনকি কেন্দ্রীয় কমিটিতে যাদের পদ দেয়া হয়েছে তাদের নামে চিঠিও পাঠানো হয়নি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা নতুন সম্মেলনের দাবি জানিয়েছেন।

গত বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত হয় ছাত্রলীগের ২৯তম সম্মেলন। এতে সভাপতি হিসেবে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে গোলাম রাব্বানীকে মনোনীত করা হয়। কিন্তু দুর্নীতি, সরকারের বড় বড় প্রকল্পে চাঁদাবাজি এবং টাকার বিনিময়ে কমিটি দেয়াসহ নানা অপকর্মের দায়ে তাদের সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। তাদের অব্যাহতির পর নিয়মানুসারে সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পান আল নাহিয়ান খান জয় এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে লেখক ভট্টাচার্য।

ভারপ্রাপ্ত সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার পর ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ে আশার জোয়ার সৃষ্টি হলেও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি। পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ১১১টি সাংগঠনিক জেলা ইউনিটের মধ্যে ১০৮টি কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। এর মধ্যে পাঁচটি ইউনিটের সম্মেলন করলেও তার কোনো কমিটি দিতে পারেনি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি গঠন করলে সেখানে বিতর্কিত ব্যক্তিকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে পদ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে। এছাড়া নড়াইল জেলা কমিটি করলেও সেখানে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি দিতে পারেননি জয়-লেখক।

নড়াইল জেলা ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আল নাহিয়ান খান জয় জাগো নিউজকে বলেন, আমরা জেলা পর্যায়ে কমিটি দিতে গেলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ও তাদের পরামর্শ নিয়ে করতে হয়। সেখানে আমাদের (ছাত্রলীগ) সঙ্গে আওয়ামী লীগের সমঝোতা হয়ে যাওয়ায় সম্মেলন করেনি।

এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি আরিফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি দেয়া ছাত্রলীগের একটি ঐতিহ্য। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সম্মেলনের মাধ্যমে একত্রিত হতে পারে। সম্মেলন ছাড়া ছাত্রলীগের কমিটি করা দুঃখজনক।

নড়াইল জেলা কমিটি প্রেস রিলিজের মাধ্যমে প্রকাশ করা নিয়ে ছাত্রলীগের সাবেক উপ-দফতর সম্পাদক শেখ নকিবুল ইসলাম সুমন বলেন, ছাত্রলীগের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কমিটির জেলা কমিটি করার ক্ষমতা নেই। নড়াইল জেলা ছাত্রলীগের কমিটি মাশরাফি ভাই নেত্রীর (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) সঙ্গে কথা বলে কমিটি করেছেন। বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মাত্র স্বাক্ষর করে প্রেস রিলিজের মাধ্যমে তা প্রকাশ করেছে।

এদিকে ১০৮টি মেয়াদউত্তীর্ণ জেলা কমিটির ২৫-২৭টি কমিটি ৭-১০ বছর ধরে চলছে। এসব জেলায় কমিটি না হওয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান বলেন, ১০৮টি কমিটির সবগুলোই আমরা করে যেতে চাই। কিন্তু আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা চাইলেই দুজনের নাম উল্লেখ করে কমিটি দিতে পারি না। আমাদের অনেক কিছু পর্যবেক্ষণ করতে হচ্ছে। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে যেসব কমিটি দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ সেসব কমিটি আগে করা হবে। ছাত্রলীগের নেতৃত্ব ছাত্রদের হাতেই থাকবে।

জেলা কমিটি করার বিষয়ে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, সামনে আওয়ামী লীগের সম্মেলন। এ উপলক্ষে স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন ইউনিটের কমিটি হচ্ছে। আওয়ামী লীগের সম্মেলনের পর আমরা ধীরে ধীরে সবগুলো কমিটি করার চেষ্টা করব। যেসব জেলা কমিটি বেশি পুরোনো সেগুলোতে আগে কমিটি করব এবং যেসব জেলায় এখনও কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়নি সেসব জেলায় দ্রুত সময়ের মধ্যে করে ফেলব।

চলতি মাসেই বিতর্কিতদের তালিকা প্রকাশ

এ বছরের মে মাসে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ হলে তাতে অনেক বিতর্কিত ব্যক্তিকে পদায়ন করা হয় বলে অভিযোগ করে ছাত্রলীগের পদবঞ্চিত একটি পক্ষ। পদবঞ্চিতরা ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ১০৮ জন বিতর্কিত ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে একটি তালিকা প্রকাশ করে এবং এদের পদায়নের প্রতিবাদে ও তাদেরকে দল থেকে বহিষ্কারের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি ও অনশন করেন পদবঞ্চিত নেতারা।

পদবঞ্চিত নেতাদের তোপের মুখে তখনকার ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ১৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পায়। ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিতর্কিত ব্যক্তিদের অল্পসময়ের মধ্যে দল থেকে বহিষ্কার ও শূন্য পদে যোগ্যতার ভিত্তিতে পূরণ করা ঘোষণা দিলেও ছয় মাসে তার বাস্তবায়ন হয়নি।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, এ মাসের (নভেম্বর) ভেতর বিতর্কিতদের তালিকা প্রকাশ করা হবে এবং শূন্য পদে যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন করা হবে।

তবে পদবঞ্চিতদের মধ্য থেকে কাউকে এসব পদে পদায়ন করা হবে কিনা- এ প্রশ্নের উত্তরে কোনো জবাব দেননি ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক।

৬ মাসেও দায়িত্ব বুঝে পাননি পূর্ণাঙ্গ কমিটির নেতারা

পূর্ণাঙ্গ কমিটির ছয় মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও দায়িত্ব বুঝে পাননি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা। এতে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির নেতারা মধুর ক্যান্টিনে আসা-যাওয়া ছাড়া আর কোনো সাংগঠনিক কাজ করতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেন।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি আরিফ হোসেন বলেন, আমরা ছয় মাস অতিক্রম করার পরও সাংগঠনিক কোনো দায়িত্ব খোঁজে পাইনি। ছাত্রলীগের বর্ধিত সভায় এ বিষয়ে প্রস্তাব তোলা হলেও তার কোনো জবাব দেননি তৎকালীন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। সাধারণত কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের দু-একটি জেলা নির্দিষ্ট করে কর্মবণ্টন করা হয়ে থাকে। কেন্দ্র থেকে জেলা শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়ে থাকে এবং তাদের মধ্যে কোনো সমস্যা হলে তা নিজেরা সমাধান করার চেষ্টা করা হয়ে থাকে বা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকে জানিয়ে সমাধান করা হয়ে থাকে কিন্তু শোভন-রাব্বানী কমিটির মতো তারাও আমাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেবে বলে ঘুরাচ্ছে।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, এ মাসে বিতর্কিতদের বাদ দেয়া হবে। তারপরই আমরা সবাইকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেব। বিতর্কিতদের যেন কোনো দায়িত্ব না পায় সে জন্য আমাদের দেরি হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই সবার যার যার দায়িত্ব বুঝে পেয়ে যাবে।

সম্মেলন চায় ছাত্রলীগের একাংশ

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার পর থেকে সংগঠনের তৎকালীন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আসতে থাকে। তারপর সেপ্টেম্বর মাসের শুরুর দিকে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর হয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে পদচ্যুত হন। তখন জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আল নাহিয়ান খান জয় ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে মনোনীত করা হয়।

তাদের প্রতি অনেকের আস্থা ফিরলেও পদবঞ্চিতরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ছাত্রলীগের বিতর্কিত মুক্ত আন্দোলনের মুখপাত্র রাকিব হোসেন এ বিষয়ে বলেন, বর্তমান কমিটি ছাত্রলীগের কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিতদের দল থেকে বহিষ্কার করার জন্য আমরা দাবি-দাওয়া করে আসছি কিন্তু তারা আমাদের দাবি আমলে নিচ্ছে না। বিভিন্ন জেলা ইউনিটের কমিটি করতে পারছে না। ছাত্রলীগের এ কমিটি গঠন হওয়ার পরে ছাত্রলীগের সকল কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। ছাত্রলীগ এভাবে চলতে পারে না। আমরা অবিলম্বে দলীয় হাইকমান্ডের মাধ্যমে সম্মেলনের দাবি জানাচ্ছি।

সম্মেলনের বিষয়ে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় জাগো নিউজকে বলেন, নেত্রী আমাদেরকে কঠিন সময়ে নেতৃত্ব তুলে দিয়েছেন। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে কাজ করছি। বুয়েটে আবরার খুন হওয়ার পর ছাত্রলীগের ইমেজে ব্যাপক ধাক্কা লাগে। আমরা তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। কমিটির মেয়াদ এখনও আরও আট মাসের বেশি সময় আছে। তবে নেত্রী আজ বললে আজই আমরা সম্মেলন করতে প্রস্তুত। আমরা সবসময় আমাদের নেত্রীর যেকোনো নির্দেশনা মাথা পেতে নেব।

বিএ/পিআর