তদন্তে স্পষ্ট নয় ‘আইএস টুপি’র রহস্য

জসীম উদ্দীন
জসীম উদ্দীন জসীম উদ্দীন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৪৭ পিএম, ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯

আদালত পাড়ায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও হলি আর্টিসান হামলা মামলার দণ্ডিত দুই আসামির মাথায় ‘আইএসের চিহ্ন-সংবলিত টুপি’ কীভাবে এলো, তা দুই কমিটির তদন্তেও স্পষ্ট হয়নি। ওই ঘটনায় কারা অধিদফতর ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। দুই কমিটির তদন্তেই অজানা রয়ে গেছে ‘আইস টুপি’র রহস্য।

এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘আইএস টুপি’র বিষয়টি হালকাভাবে দেখে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। আইএস মতাদর্শী জঙ্গিরা প্রচারণার বড় কৌশল হিসেবে এটিকে বেছে নিয়েছিল। সঠিক তদন্তে টুপি রহস্য উদ্ঘাটন করা উচিত। তদন্তে যারা অভিযুক্ত প্রমাণিত হবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

কারাগারে থাকা কোনো আসামিই আন-অথরাইজড কিছুই ব্যবহার করতে পারেন না। তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অন্যদের চেয়ে জঙ্গি আসামিরা আলাদা, সেটাও স্পষ্ট হওয়া উচিত। এ আসামিদের কারাগার থেকে আদালতে নেয়ার ক্ষেত্রে চরম ব্যত্যয় ঘটেছে বলেও মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

গত ২৭ নভেম্বর (বুধবার) আলোচিত হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। সে সময় আদালতে উপস্থিত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রাকিবুল হাসান রিগ্যানের মাথায় আইএস’র টুপি দেখা যায়। এ টুপি কীভাবে জঙ্গিরা পেল তা তদন্তে কারা অধিদফতর ও ঢাকা মহানগর পুলিশ পৃথক দুটি কমিটি গঠন করে।

কারা অধিদফতর কর্তৃক গঠিত তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন অতিরিক্ত আইজি প্রিজন কর্নেল আবরার হোসেন। অপর দুই সদস্য হলেন- ঢাকা বিভাগীয় ডিআইজি (প্রিজন) টিপু সুলতান ও এআইজি প্রিজন (ট্রেনিং) আমিরুল ইসলাম। তারা গত ৩০ নভেম্বর তদন্ত শেষে কারা মহাপরিদর্শকের (আইজি প্রিজন) কাছে প্রতিবেদন জমা দেন।

holi

কারা অধিদফতরের ডিআইজি টিপু সুলতান জাগো নিউজকে বলেন, ‘সেদিন আইএসের চিহ্ন সংবলিত টুপি কারাগার থেকে যায়নি। এ টুপির বিষয়ে কারা কর্মকর্তাদের গাফিলতিও নেই।’ তবে কীভাবে ‘আইএস টুপি’ আসল, তা স্পষ্ট করে কিছু বলেননি তিনি।

অন্যদিকে ঘটনার পর তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করে ডিএমপি। এ কমিটির প্রধান হলেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম। অন্য সদস্যরা হলেন ডিবির উপ-কমিশনার (উত্তর) মশিউর রহমান ও ডিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহাদাৎ হোসেন।

বৃহস্পতিবার (৫ ডিসেম্বর) দুপুরে ডিএমপি’র তদন্ত কমিটির প্রধান মাহবুব আলম বলেন, ‘আমরা ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করেছি। কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় তল্লাশি করা হয়েছে। তবে তাদের কাছে যে টুপি ছিল, তা রেখে দেয়া হয়নি। বরং নির্বিঘ্নে টুপি নিয়ে আসতে দেয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘মোট তিনটি টুপি এসেছিল, এর মধ্যে দুটি সাদা ও একটি কালো। তবে কোনো লোগো ফুটেজে ধরা পড়েনি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কর্মরত কারারক্ষীরা হয়তো বুঝতেই পারেননি, এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ (সিগনিফিকেন্স)। টুপি তো নামাজের অংশ। তা-ই হয়তো তারা ছেড়ে দিয়েছেন।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জঙ্গিদের কাছে এভাবে একাধিক টুপি আসতে পারে। লোগো থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। তবে আমাদের তদন্তে ধরা পড়েনি। এমনও হতে পারে, তারা যে টুপি কারাগার থেকে এনেছিল, আদালতে রায় শোনার পর তা তারা উল্টে পড়েছে।’

তবে এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রাকিবুল হাসান রিগ্যানের কাছে গত ৩ ডিসেম্বর বিচারক মজিবুর রহমান আইএস’র টুপি পাওয়ার বিষয়ে জানতে চান। তিনি সে সময় বলেন, ‘আদালতে ভিড়ের মধ্যে কেউ একজন আমাকে আইএস’র টুপি দিয়েছিল।’

এ বিষয়ে ডিএমপি’র যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, ‘আইএস টুপি বিতর্কের পর তদন্তের স্বার্থে তাকে অনেক সংস্থাই জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। রিগ্যান কারাগারে এক ধরনের বক্তব্য দিয়েছে, গোয়েন্দা পুলিশের কাছে আরেক বক্তব্য দিয়েছে। আবার আদালতে গিয়ে ভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিয়েছে। তবে সিসি ক্যামেরার ফুটেজে এরকম কোনো চিত্র পাওয়া যায়নি।’

আদালতে নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সেদিন আদালতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল। পুলিশ, সাংবাদিক আর আইনজীবী ছাড়া কেউ ছিলেন না। সাংবাদিক ও আইনজীবীর বিষয়টি আদালতে একটা ফ্রেমে আনা দরকার। এমন কোনো সিস্টেম দাঁড় করানো দরকার, যাতে আইনজীবী তার পেশায় থাকতে পারেন আর সাংবাদিক যাতে তার রিপোর্ট কাভার করতে পারেন। পুলিশ নিরাপত্তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেন।’ দু-একদিনের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন কমিশনারের কাছে জমা দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. এম সাখাওয়াত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘যাদের ধারণা নাই, তারা কখনও কি ধারণা করতে পারবে? একটা টুপির মাধ্যমে কী মেসেজ তারা (জঙ্গিরা) দিতে চেয়েছে? হলি আর্টিসানের অনেক আগে থেকে, বিশেষ করে বাংলাভাইসহ জেএমবির শীর্ষ নেতাদের আটক এবং বিচারকার্য শেষ হওয়া পর্যন্ত তারা মিডিয়ার, বিশেষ করে টেলিভিশনের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পেয়েছিল। এটা তাদের উদ্দেশ্যই ছিল যে, কোনো ইস্যুতে প্রচার পাওয়া। যদিও আমরা এটা গভীরভাবে চিন্তা করিনি বা করি না।’

holy

তিনি বলেন, “সন্ত্রাস মোকাবিলায় গৃহীত নীতির মধ্যে মিডিয়ার ব্যবহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার কথা বহুবার তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় না, এ বিষয়কে নীতিনির্ধারকরা গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করেছেন। এর প্রমাণ, ২৭ নভেম্বর আইএস’র ওই টুপির বিষয়টি মিডিয়ার সচিত্র প্রচার। মিডিয়ার প্রচারের মাধ্যমে তারা (জঙ্গিরা) বিশ্বব্যাপী শাস্তির চেয়ে কথিত আইএস সদস্যদের মানসিক শক্তি, শারীরিক ও প্রতীকী শক্তিকেই প্রচার করেছে বলে আমি মনে করি।’

এ নিরাপত্তা বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘গত ২৭ নভেম্বর যেভাবে আসামিদের কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়েছে তা অন্য কোনো দেশে অর্থাৎ নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, এমনকি ইউরোপেও দেখা যায়নি। প্রথমত, এ আটজনের রায়-পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় প্রচুর ত্রুটি চোখে পড়েছে। রাজনৈতিক ব্যক্তি সম্রাটকেও আদালতে নেয়ার পথে হ্যান্ডকাপ, হেলমেট ব্যবহার করা হলো। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রিগ্যানকে কেন হ্যান্ডকাপ-হেলমেট পরানো হলো না? তাকে কেন মৌলভীর মতো টুপি পরার সুযোগ দেয়া হয়েছে? আর হাজার হাজার উৎসুক মানুষকে কেন এত কাছে আসতে দেয়া হয়েছিল? টুপি ইস্যু পরে, এসব আগে বের করা দরকার।’

তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয়ত, এত সংখ্যক পুলিশের উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা আদৌ ছিল কি-না? তৃতীয়ত, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আইএস তথা অন্যান্য সংগঠনের বিষয়ে তৃণমূলে যারা সম্পৃক্ত, তাদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তেমন ধারণা দেয়া হয়নি। দেয়া হলে টুপি পরিধান ও অন্যান্য বিষয়ে সাবধান হতেন। সমস্যা আসলে, আমরা জটিল বিষয়কে যথেষ্ট সরলীকরণ করি। যার কারণে অনেক ক্ষেত্রে গভীরে বিশ্লেষণ করার শক্তি তৈরি হয় না।’

অপর নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইসফাক ইলাহী চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘টুপি কোথা থেকে আসল? টুপি তো আসমান থেকে আসেনি! তাহলে স্বভাবত প্রশ্ন ওঠে, নিরাপত্তায় ফাঁক ছিল? এটা লজ্জার, ব্যর্থতার।’

তিনি বলেন, ‘কোনো একজন টুপিটা দিয়েছে, আদালতকে দেয়া রিগ্যানের এমন বক্তব্যকে গুরুত্ব দেয়ার কিছু নাই। এমন মামলায় আদালত চত্বরে এত মানুষ কেন, এত ঠেলাঠেলি কেন? এর মধ্যে এমন ঘটনা তো স্বাভাবিক। অথচ পৃথিবীর কোথাও আপনি এমন দৃশ্য দেখতে পাবেন না। সংখ্যার চেয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বেশি জরুরি। কোনো আসামি যদি কিছু ব্যবহার করতে চান, তা জেলখানা থেকে ইস্যুকৃত হতে হবে। এ টুপি যদি আজ জেলখানা থেকে ইস্যু করা হতো তাহলে তা ধরা যেত। আর কারা-টেইলার্স থেকে বানানো কি-না, তাও স্পষ্ট হতো। যেকোনো আসামিকে কারাগার থেকে বাইরে আনা বা নেয়ার ক্ষেত্রে আন-অথরাইজড কিছুই ব্যবহার করতে পারেন না, এটা নিশ্চিত করতে হবে।’

জেইউ/এফআর/এমএআর/পিআর