আবরার হত্যার মতো ঘটনা প্রতিদিন ইউরোপ-আমেরিকায় ঘটছে

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:৩২ পিএম, ০৬ জানুয়ারি ২০২০

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। প্রতিমন্ত্রী, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। মুজিবর্ষের প্রসঙ্গ নিয়ে জাগো নিউজ’র বিশেষ সাক্ষাৎকারে মুখোমুখি হন। দীর্ঘ আলোচনায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন এবং এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আলোকপাত করেন।

স্বাধীনতাবিরোধীরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে এখনও শক্তিশালী থাকায় গণতন্ত্র, নির্বাচন সুষ্ঠু ধারায় যেতে পারেনি বলে যুক্তি দেন। বলেন, সমালোচনা মানেই গণতন্ত্র। সমালোচনা না থাকলে গণতন্ত্রের পূর্ণতা আসে না। ‘বাকস্বাধীনতা নেই’- এটি আপনি বলতে পারছেন, আর এখানেই স্বাধীনতা।

নিজ মন্ত্রণালয় তথা নদী ও নদীপথের নানা উন্নয়ন প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে দ্বিতীয়টি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ : আগের পর্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীদের সক্রিয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পন্ন করছে সরকার, যা বড় একটি সফলতা হিসেবে দেখানো হচ্ছে। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিপক্ষে সরকার একাট্টা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ঘাটতি নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। কেন এটি দাঁড় করানো গেল না? এর দায় কার?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : বিশ্বায়নের এ যুগে সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হচ্ছে। এ কারণে সমগ্র বিশ্বের যে মনোভাব সেটাকেও গ্রহণ করতে হচ্ছে। এটিকে বাদ দিয়ে আমরা চলতে পারছি না।

তবে আমরা পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি। এর প্রমাণ হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এক ধরনের নিষিদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থায় রূপ নিয়েছিল। এ সংস্কৃতি থেকে আমরা বের হয়ে আসছি। তরুণরা এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জানতে পারছে, ধারণ করতে পারছে। এ চেতনার বিকাশ ঘটাতে আরও সময় লাগবে।

জাগো নিউজ : বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে অতৃপ্তির জায়গাও গভীরতর...

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপ্লবের কথা বলেছিলেন। এ বিপ্লব ঘটলে বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নয়নের উদাহরণ হতো ৩০ বছর আগেই। বঙ্গবন্ধুকে যখন হত্যা করা হয়, তখন প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ শতাংশ। এরপর আর এ প্রবৃদ্ধি হয়নি। দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি।

বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে বাংলাদেশ যে পিছিয়ে গেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকংয়ের উন্নয়ন নিয়ে উদাহরণ দেয়া হয়। অথচ বাংলাদেশ সেই উদাহরণ হওয়ার কথা ছিল। কারণ আমরা বীরের জাতি। একটি বৈপ্লবিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের যে আত্মপ্রকাশ, তা নিঃসন্দেহে বিশ্বের কাছে উদাহরণ।

অথচ সেই বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল! দারিদ্র্য, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ দিয়ে বাংলাদেশকে একসময় চেনানো হতো। এটি বাংলাদেশের বিকৃত উপস্থাপন। আজ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের হারানো সম্মান ফিরে এসেছে। বাংলাদেশ যে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্য দিয়ে যে ক্ষতি হয়েছিল, তা শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্ব পুষিয়ে আনছে।

জাগো নিউজ : এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এখন কোন চ্যালেঞ্জকে গুরুত্ব দেবেন?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : আমরা নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশে যারা বলেছেন, আমরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছি, শেখ হাসিনার সরকার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে তাদের বিচার শুরু করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যা, যুদ্ধাপরাধের বিচারের রায় কার্যকর হচ্ছে।

আমাদের চ্যালেঞ্জ ছিল গণতন্ত্রকে সুসংহত করা। আমরা শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে এনেছি। জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাস দমন করতে সক্ষম হয়েছি। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার যে পালাবদল, তা আওয়ামী লীগ নিশ্চিত করেছে। যেকোনো সময়ের চেয়ে সংসদ এখন বেশি কার্যকর।

বিচারব্যবস্থা আরও স্বাধীন হয়েছে। সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিচ্ছে। আদালতের নির্দেশনায় আমরা নদী রক্ষা কমিশন গঠন করতে পেরেছি। আইন এবং আদালত সুস্থ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। আইন না মানার সংস্কৃতি থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে পেরেছি।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের যে সম্ভাবনাগুলোকে হত্যা করা হয়েছিল, আমরা সেই সম্ভাবনার ফের জাগরণ সৃষ্টি করতে পেরেছি।

জাগো নিউজ : বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বললেন। গণতন্ত্র এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে বিশ্বমহল প্রশ্ন তুলছে। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিশ্বের পাঁচটি স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশকে তালিকাভুক্ত করেছে। এ সমালোচনা অস্বীকার করা যায় কি?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : আপনি কোন আন্তর্জাতিক মহলের কথা বলছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল যাদের কথায় চলে সেসব দেশে কি গণতন্ত্র আছে? সেসব দেশে কি মানুষ কথা বলতে পারছে?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে আপনি কথা বলবেন, আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কথা বলবেন না, তা তো হতে পারে না। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসকে লালন করবেন, পাকিস্তান প্রেতাত্মায় ভর করে যখন অরাজকতা করবেন, তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নেবে না? অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।

বাংলাদেশে মানবাধিকার যেভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে, তা অনেক উন্নত দেশেই হয় না। পশ্চিমা দেশগুলো তো আমাদের মানবাধিকার বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে, বাংলাদেশে কিন্তু গ্যাসচেম্বারে ঢুকিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়নি। প্রকাশ্যে কাউকে জীবিত মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়নি। বাংলাদেশে এমন অবস্থা বিরাজ করছে না, যেখানে মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। জোর করে অনেক সমালোচনা করতেই পারেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র হচ্ছে, মানুষ স্বাধীনতার সুখ অনুভব করছে।

জাগো নিউজ : সরকারের সমালোচনার কারণে বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও প্রত্যক্ষ করল জাতি। মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত তো হচ্ছেই…

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আবরার হত্যাকাণ্ড, আলাউদ্দিন হত্যাকাণ্ড, তিন্নি হত্যাকাণ্ড- এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আবরার হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা প্রতিদিন ইউরোপ-আমেরিকায় ঘটছে। মিডিয়া স্বাধীনভাবে কথা বলায় ফ্রান্সে মিডিয়া হাউসে হামলা হয়। বাংলাদেশের মিডিয়া হাউসে কোনো হামলা হয়েছে?

বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলায় কেউ আক্রান্ত হয়নি। বাংলাদেশের বিপক্ষে কথা বললে, আমিও আক্রান্ত হতে পারি।

প্রতিনিয়ত মিডিয়াগুলো সরকারের সমালোচনা করছে। টেলিভিশনগুলো খুললেই দেখতে পাই। ব্যক্তিগতভাবেও আক্রমণ করা হচ্ছে। এই যে আপনি আমাকে প্রশ্ন করছেন, ‘বাংলাদেশে কথা বলার স্বাধীনতা নেই’। স্বাধীনতা না থাকলে আপনি এ প্রশ্ন করতে পারতেন?

জাগো নিউজ : কিন্তু সে স্বাধীনতা ‘প্রশ্ন’ আর ‘উত্তর’র মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে কি-না?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : না। প্রশ্ন-উত্তরে সীমাবদ্ধ থাকছে না। সমাজ মানুষ, সমাজ প্রশ্ন করছে। রাষ্ট্র উত্তর দিচ্ছে। উত্তর মানেই রাষ্ট্র, সরকার প্রশ্নের সমাধান দিচ্ছে।

জাগো নিউজ : তার মানে বলতে চাইছেন, সরকার যে পথে হাঁটছে, সে পথেই মুক্তি?

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : হ্যাঁ, আমরা তা-ই মনে করছি। স্বাধীনতার স্বাদ পেতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিকল্প নেই। বিকৃত ধারা অবলম্বন করে কোনো দিন মুক্তি আসতে পারে না। যে জাতি ইতিহাস ছুড়ে ফেলে দেয়, সে জাতি কখনই এগিয়ে যেতে পারে না।

এএসএস/এমএআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]