সোমালিয়া-সুদানে কর্মী পাঠানো নিয়ে প্রশ্ন

জেসমিন পাপড়ি
জেসমিন পাপড়ি জেসমিন পাপড়ি , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:৪৪ পিএম, ১৭ জানুয়ারি ২০২০

সোমালিয়া ও সুদানের মতো আফ্রিকার দেশগুলোতে কর্মী পাঠাচ্ছে বাংলাদেশ। কর্মী পাঠানো হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়াতেও। নতুন শ্রমবাজারের তালিকায় দেশগুলোর নাম বেশ জোরেশোরে বলা হলেও সেখানকার অর্থনীতিসহ সার্বিক পরিস্থিতি কর্মী পাঠানোর মতো উপযোগী নয় বলে অভিমত অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, এসব দেশে কর্মী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সেখানকার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেয়া উচিত ছিল।

কয়েকজন অভিবাসন বিশেষজ্ঞের ভাষ্য, নানা সমস্যার মধ্যে থাকা আফ্রিকার দেশগুলো এখনও অভিবাসীদের জন্য নিরাপদ নয়। সেখানে কর্মীদের পাচারের শিকার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইউরোপে শ্রমিক পাচারের জন্য দুর্বৃত্ত চক্র আফ্রিকার কয়েকটি দেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়া নিজেই বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠিয়ে থাকে।

বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) রেকর্ড অনুসারে, সংঘাত-রক্তপাতে জর্জরিত এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াইরত সোমালিয়ায় গত তিন বছরে মাসে গড়ে ১৫ কর্মীকে পাঠানো হয়েছে বিএমইটির ছাড়পত্রসহ। আর ১৯৯৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সাড়ে ১১ হাজারের বেশি বাংলাদেশিকর্মী পাঠানো হয়েছে সুদানে।

sudan-02

সোমালিয়া ও দক্ষিণ সুদানে চলছে চরম খাদ্য সংকট

এর মধ্যে সোমালিয়ায় ক্ষমতা দখলের দ্বন্দ্ব লেগেই আছে। সেখানে প্রায়ই আল-শাবাবসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী হামলা চালিয়ে থাকে এবং এতে প্রায়ই হতাহতের ঘটনা ঘটে। এ সংঘাতের কারণে সোমালিয়া আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আতঙ্কের জনপদ। এ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও তলানিতে। আর সুদানও জর্জরিত ক্ষমতা দখলের সংঘাতে। এ সংঘাতের পরিণতি হিসেবে সুদান থেকে ২০০১ সালে একটি অঞ্চল স্বাধীন হয়ে গঠিত হয় দক্ষিণ সুদান। সুদানের সংঘাত নিয়ন্ত্রণের জন্য সেখানে জাতিসংঘকে শান্তিরক্ষী বাহিনী পর্যন্ত মোতায়েন করতে হয়েছে। এ দেশের অর্থনৈতিন দুর্দশাও সবার জানা।

অন্যদিকে গত বছরের নভেম্বরে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশিকর্মী পাঠানো হয় কম্বোডিয়ায়। তাদের বিএমইটি থেকে অভিবাসন ছাড়পত্র দিয়ে পাঠানো হয় সেখানে। ওই কর্মীদের মধ্যে অন্তত ১০ শ্রমিককে নির্মাণ খাতে এবং তিন শ্রমিককে পোশাক খাতে নিয়োগ দেয়া হয়।

প্রবাসীকল্যাণ ভবনে ওই কর্মীদের মধ্যে বিএমইটির অভিবাসন ছাড়পত্র হস্তান্তরকালে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ বলেন, কম্বোডিয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য একটি নতুন গন্তব্য হয়ে উঠেছে। ভিয়েতনাম ও লাওসসহ অন্যান্য দেশগুলোও বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেবে।

sudan-03

ক্ষমতা দখলের সংঘাতে দক্ষিণ সুদানের একটি জঙ্গিগোষ্ঠী

ওই তিন দেশে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) চেয়ারপারসন তাসনিম সিদ্দিকী জাগো নিউজকে বলেন, সোমালিয়া, সুদান ও কম্বোডিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর আগে সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে খবর নেয়া উচিত। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলো বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ গন্তব্য নয়।

রামরুর সিনিয়র গবেষক ড. জালাল উদ্দিন সিকদার অবশ্য বলেন, এসব দেশে এখন অল্প সংখ্যক শ্রমিক দরকার। তবে তা দক্ষ শ্রমিক। আর বাংলাদেশ থেকে যেসব শ্রমিক যায়, তাদের বেশিরভাগই অদক্ষ।

sudan-04

সোমালিয়া ও দক্ষিণ সুদানে চলছে চরম খাদ্য সংকট

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, শুধু সংখ্যা বাড়িয়ে বলার জন্য এসব দেশকে গন্তব্য দেশ হিসেবে যুক্ত করা ঠিক হবে না। সবার আগে দেখতে হবে এসব দেশে আমাদের শ্রমিকদের কাজের সুযোগ আছে কি-না। তাছাড়া সেখানে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যতটুকু জানি, আফ্রিকায় কাজের সুযোগ এখনও নেই। কারণ তারা নিজেরাই নানা রকম অসুবিধার মধ্যে আছে। দাঙ্গা-যুদ্ধবিধ্বস্ত এসব দেশ নিজেরাই অসংখ্য সমস্যার মুখোমুখি। সেখানে তারা অভিবাসীকর্মী নিতে কতটা প্রস্তুত, সেটা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।’

sudan-05

এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সকল শ্রমবাজারের সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই করেই কর্মী পাঠানো হচ্ছে।’

তিনি বলেন, সারাবিশ্বে এখন দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে। বেশি সংখ্যক অদক্ষ কর্মী পাঠানোর চেয়ে অল্প সংখ্যক দক্ষ কর্মী পাঠানো এখন লাভজনক। এজন্য আমরা দক্ষ শ্রমিক তৈরিতে মনোনিবেশ করছি।

জেপি/এইচএ/এমএআর/পিআর