নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা একেবারেই হারিয়ে গেছে

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৫৪ পিএম, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। নির্বাহী সভাপতি, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)। বেসরকারি সেবা সংস্থা ব্র্যাকের চেয়ারম্যান পদেও দায়িত্ব পালন করছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারে সাবেক উপদেষ্টা। উন্নয়ন প্রসঙ্গ নিয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হন জাগো নিউজ-এর।

দীর্ঘ আলোচনায় উন্নয়নের সংকট এবং সমাধান প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মতামত ব্যক্ত করেন। গণতন্ত্র, সুশাসনের অভাবই বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় প্রধান প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করেন। শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এ বিশ্লেষক। বলেন, শিক্ষায় আমরা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পেরেছি। কিন্তু শিক্ষার মান নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন। লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার আমাদের। কিন্তু বাংলাদেশের মতো ছোট্ট একটি দেশে কাজ করছে ভারতের কয়েক লাখ মানুষ। তারা এ দেশের শ্রমবাজার দখল করে রেখেছে।

এরপরও উদ্যমী মানুষের ওপর ভরসা রেখে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে তাদের নিয়ে নানা সম্ভাবনার দিকও তুলে ধরেন। তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে দ্বিতীয়টি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

জাগো নিউজ : আগের পর্বে উন্নয়নের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরেছেন। অবকাঠামোগত যে উন্নয়ন এখন দৃশ্যমান, তা থেকে সরকারের আত্মতুষ্টি প্রকাশের যথেষ্ট কারণও আছে। মেট্রোরেল মতো প্রকল্প নিয়ে সরকার সন্তোষ প্রকাশ করতেই পারে…

হোসেন জিল্লুর রহমান : এমন উন্নয়ন নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু বেকার সমস্যা দিনদিন কেন তীব্র হচ্ছে? পরিসংখ্যানগত সমস্যা বাড়ছে কেন? ৮৮ শতাংশ উন্নয়ন কেন অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে? প্রতিষ্ঠানগুলো তাহলে কী করছে? নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে এখনও কেন নানা প্রশ্ন? শিশুরা কেন অপুষ্টিতে? শিক্ষার মান নিয়ে বেহাল দশা কেন?

আপনি পদ্মা সেতুর মধ্য দিয়ে উন্নয়নের এক পিঠ দেখছেন। উত্তরা থেকে মতিঝিল যেতে যে তিন ঘণ্টা লাগছে, তা দেখতে আপনি রাজি নন। ঢাকায় এত উন্নয়ন হচ্ছে, তাহলে বসবাসের অনুপযুক্ত নগরীর মধ্যে শীর্ষে কেন?

আপনি একটি সহজ বিষয় গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করেন। চিকিৎসা খাতের উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে। তাহলে লাখ লাখ রোগী ভারতে গিয়ে সেবা নিচ্ছে কেন এবং এটি দিনদিন বেড়েই চলছে।

সব সরকারের নিয়ন্ত্রণে। রাজনৈতিক কোনো অস্থিরতা নেই। এরপরও কেন ব্যক্তি বিনিয়োগ বাড়ছে না? এ প্রশ্নগুলোর তো উত্তর খোঁজা জরুরি।

জাগো নিউজ : এরপরও তো এগিয়ে যাওয়ার গল্প বলতেই হয়…

হোসেন জিল্লুর রহমান : অবশ্যই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সরকার শুধু উন্নয়নের গল্প বলেই যাবে আর অন্যপক্ষ বলবে, কিছুই হচ্ছে না। আমি এ নীতিতে বিশ্বাস করি না। দোষারোপ করলে আমরা কেউ লাভবান হতে পারব না।

জাগো নিউজ : উদ্যমী মানুষের কথা বলছেন। সরকার তার ক্ষমতার ধারাবাহিকতা উন্নয়নের জন্য আশীর্বাদ মনে করছে। তুলনা করে কী বলবেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান : উন্নয়নের ধারাবাহিকতা গত ১০ বছর থেকে শুরু হয়নি। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা সেই ১৯৭২ সাল থেকে শুরু হয়েছে। বিভিন্ন ধারার সরকার এসেছে। কিন্তু উন্নয়নের ধারাবাহিকতা থেমে যায়নি।

জাগো নিউজ : এর কৃতিত্ব কাকে দেবেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান : রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও উদ্যমী মানুষ দমে যায়নি। মূলত, উন্নয়নের কৃতিত্ব সাধারণ মানুষেরই। বর্তমান সরকারও নানা উদ্যোগ নিয়েছে, নিচ্ছে। কিন্তু সরকারের ধারাবাহিকতা আছে বলেই উন্নয়ন হচ্ছে, এটি রাজনৈতিক সুবিধা নেয়ার একধরনের ব্যাখ্যা। এ ব্যাখ্যা সঠিক নয়। কারণ উন্নয়নের ধারাবাহিকতা গত ৫০ বছরের। আপনি সূচকগুলো দেখলেই বুঝতে পারবেন।

jagonews24

কৃষির উন্নয়ন বিশেষ ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে এসেছে। গার্মেন্ট শিল্পের যাত্রা আশির দশকে। প্রবাসে গিয়ে শ্রমিকরা রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে অনেক আগে থেকে। বাংলাদেশের সূচনালগ্ন থেকেই উন্নয়নের ধারা সৃষ্টি হয়।

জাগো নিউজ : তার মানে এ উন্নয়নে শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণটাই আলোচ্য…

হোসেন জিল্লুর রহমান : প্রতিটি দেশের উন্নয়নে একটি মডেল থাকে। বাংলাদেশের উন্নয়নের মডেল হচ্ছে সস্তা শ্রমের ওপর ভিত্তি। এখন শ্রম নিয়েই আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। যেমন- প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এবং সবচেয়ে কঠিন ও নিম্নমানের কাজগুলো করে। আমরা উৎপাদনশীল শ্রমে যেতে পারিনি। এ সস্তা শ্রমকে উৎপাদনশীল শ্রমে রূপান্তরিতের যে প্রয়াস, সেখানে রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকরা উদাসীন বলে মনে করি।

জাগো নিউজ : এজন্য করণীয় কী?

হোসেন জিল্লুর রহমান : শ্রমের দক্ষতা বাড়ানো। এর সঙ্গে প্রযুক্তি, শিক্ষার মান বাড়ানো জরুরি। মানুষের স্বাস্থ্য, পুষ্টিতে নজর বাড়াতে হবে। উৎপাদনশীল শ্রমের অর্থনীতিতে যাওয়ার যে চ্যালেঞ্জ, তা বুঝতে না পারলে দৃশ্যমান উন্নয়ন নিয়ে শুধু বিতর্কই চলতে থাকবে। এক দল বলবে, আপনি উন্নয়ন স্বীকার করছেন না। আরেক দল বলবে, আপনি বেকার সমস্যা কেন বড় করে দেখছেন না।

এ বিতর্কের বাইরে গিয়ে আমাদের সহমতের ভিত্তিতে আলোচনা দরকার।

জাগো নিউজ : রাজনৈতিক, সামাজিক বাস্তবতায় সে আলোচনা কি সম্ভব?

হোসেন জিল্লুর রহমান : রাজনীতিতে অদ্ভুত সংকট তৈরি হয়েছে। আগের মতো মারামারি, হানাহানি নেই। পরিস্থিতি শান্ত। কিন্তু ভিন্নভাবে মারামারি আছে, দলের মধ্যে সংকটও আছে।

জাগো নিউজ : পরিস্থিতি শান্ত। এটিকে রাজনীতির ইতিবাচক পরিবর্তন বলা যায় কি-না?

হোসেন জিল্লুর রহমান : না। এটিকে ইতিবাচক পরিবর্তন বলা যায় না। শান্ত এ পরিস্থিতির মধ্যে তিন ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। প্রথমত, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা একেবারেই হারিয়ে গেছে, যেখান থেকে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। অর্থাৎ নির্বাচন প্রক্রিয়া গুরুত্বহীন হয়ে গেছে, যা আপনি ভোটারের উপস্থিতি দেখলেই বুঝতে পারবেন।

প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাজনীতি অনুপস্থিত করতে সক্ষম হয়েছে সরকার। শাসক দল আছে। কিন্তু বিরোধী শক্তির কোনো বাধা নেই, প্রতিবাদ নেই, ভূমিকা নেই। এ পরিস্থিতিও ইতিবাচক হতে পারত, যদি শাসক দলের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য মানসম্মত নেতৃত্ব দেখতে পেতাম।

জাগো নিউজ : শাসক দল আওয়ামী লীগ তো বলছে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নেতৃত্ব নির্বাচন করছে। এর কী বাস্তবতা নেই?

হোসেন জিল্লুর রহমান : তারা নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ব্যাখ্যা তারা দিতেই পারে। কিন্তু মানুষ বিশ্বাস করে কি-না, তা দেখার আছে।

jagonews24

বিরোধী শক্তির দুর্বলতাও ইতিবাচক হতে পারত, যদি ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার লালন খুব জোরালোভাবে হতো। ছাত্রলীগ, যুবলীগের কর্মকাণ্ড দেখলেই মানুষের বিশ্বাস নিয়ে আপনি মূল্যায়ন করতে পারবেন।

এরপর সংকট সুশাসনের। রাজনৈতিক সংকট থাকার পরও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে অনেক দেশ কিন্তু এগিয়ে গেছে।

জাগো নিউজ : সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা তো সিঙ্গাপুর, হংকংয়ের সঙ্গে তুলনা দিচ্ছেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান : তুলনা দিচ্ছে রাজনৈতিক সংকটকে সামনে এনে। দেখবেন, সুশাসন নিয়ে কোনো তুলনা দেয় না। প্রশ্ন এখানেই।

সুশাসনের জন্য দক্ষতা, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতার প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো তা দেখাতে পারছে কি-না, আমার সন্দেহ আছে। আপনি জ্বালানি খাত দেখেন, ব্যাংক খাত দেখেন… সব পরিষ্কার বুঝতে পারবেন। প্রশাসনে যারা দক্ষ, তাদের মূল্যায়ন নেই। যারা তোষামোদ করতে পারছেন, তারাই উপরে উঠতে পারছেন।

রাজনৈতিক অংশগ্রহণ একটি দিক, রাষ্ট্র পরিচালনাও আরেকটি দিক। দক্ষতার মাধ্যমে আপনি রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেই পারেন। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় সে দক্ষতা কাজে নাও আসতে পারে। গোষ্ঠীর স্বার্থে নীতি তৈরি হচ্ছে এবং বাস্তবায়ন হচ্ছে।

জাগো নিউজ : তিন সংকটের কথা উল্লেখ করছিলেন। শেষেরটা?

হোসেন জিল্লুর রহমান : দুর্নীতি। মূলত দক্ষতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি থেকেই দুর্নীতি। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে একতরফাভাবে। কেন বাড়ছে, তার ব্যাখ্যা সরকার দিতে চাইছে কিন্তু মানুষ বিশ্বাস করতে চাইছে না।

jagonews24

সবচেয়ে কম মূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংগ্রহের কথা। কিন্তু রেন্টাল-কুইক রেন্টাল উৎপাদনমূল্য কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এখানে অব্যবস্থাপনা হচ্ছে, অথচ কোনো জবাবদিহিতা নেই।

জাগো নিউজ : কিন্তু বিদ্যুৎ নিয়ে জনমনে সন্তুষ্টিও আছে…

হোসেন জিল্লুর রহমান : বিদ্যুতের উৎপাদন বেড়েছে, এজন্য অবশ্যই সরকার প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু বাজারে যে মূল্যস্ফীতি, তার জন্য তো বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিকেও দায়ী করা হয়। যার প্রভাব পড়ছে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারে। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নগরী ঢাকা। তাহলে এ উৎপাদন বাড়িয়ে লাভ কী?

আগে দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের ভিত্তি ছিল সস্তা শ্রম। এখন মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ। একটি ধাপ থেকে আরেক ধাপে যাওয়ার যে সংকট, তা প্রকট হয়েছে।

দক্ষতা ও সাশ্রয়ী ব্যয়ের জায়গায় সংকট উত্তরণের তেমন কোনো প্রয়াস নেই। রাজনৈতিক জায়গা সংকুচিত থাকলেও এ দুই জায়গায় যদি সংকট কাটিয়ে ওঠা যেত, তাহলে দেশ আরও এগিয়ে যেত।

এএসএস/এমএআর/এমএস

বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নগরী ঢাকা। তাহলে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়িয়ে লাভ কী?

প্রশাসনে যারা দক্ষ, তাদের মূল্যায়ন নেই। যারা তোষামোদ করতে পারছেন, তারাই উপরে উঠতে পারছেন

সরকারের ধারাবাহিকতা আছে বলেই উন্নয়ন হচ্ছে, এটি রাজনৈতিক সুবিধা নেয়ার একধরনের ব্যাখ্যা

চিকিৎসা খাতের উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে। তাহলে লাখ লাখ রোগী ভারতে গিয়ে সেবা নিচ্ছে কেন

আপনি পদ্মা সেতুর মধ্য দিয়ে উন্নয়নের এক পিঠ দেখছেন। উত্তরা থেকে মতিঝিল যেতে যে তিন ঘণ্টা লাগছে, তা দেখতে আপনি রাজি নন

৮৮ শতাংশ উন্নয়ন অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে। প্রতিষ্ঠানগুলো তাহলে কী করছে